দক্ষিণ কোরিয়ার ১১০ কোটি ডলারের ঋণে ঢাকার মেট্রোরেল সম্প্রসারণে নতুন আশার আলো
দক্ষিণ কোরিয়ার ১১০ কোটি ডলারের ঋণ পুনর্বিবেচনায় ঢাকার মেট্রোরেল সম্প্রসারণে নতুন আশা, গাবতলী থেকে দাশেরকান্দি পর্যন্ত যাতায়াতে আসতে পারে বড় পরিবর্তন।
: রাজধানীর গণপরিবহন ব্যবস্থায় নতুন সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। ঢাকার মেট্রোরেল নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণের গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্প এমআরটি লাইন-৫-এর দক্ষিণ অংশ নির্মাণে দক্ষিণ কোরিয়ার ১১০ কোটি মার্কিন ডলারের সম্ভাব্য ঋণ নিয়ে ইতিবাচক অগ্রগতি হয়েছে। বাংলাদেশের অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর দক্ষিণ কোরিয়া সফরে দেশটির রপ্তানি-আমদানি ব্যাংকের সঙ্গে বৈঠকের পর অর্থায়ন নিয়ে নতুন আশার সৃষ্টি হয়েছে।
৫ নভেম্বর ২০২৬ প্রকাশিত দ্য ফিন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেসের প্রতিবেদন অনুযায়ী, দক্ষিণ কোরিয়ার রপ্তানি-আমদানি ব্যাংক বাংলাদেশের এমআরটি লাইন-৫ প্রকল্পে আগের অর্থায়ন প্রতিশ্রুতি পুনরায় যাচাই করতে সম্মত হয়েছে। অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী দেশটির ব্যাংকের চেয়ারম্যান ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা হোয়াং কিয়নের সঙ্গে বৈঠক করেন। সেখানে প্রস্তাবিত ১১০ কোটি মার্কিন ডলারের ঋণ এবং প্রকল্পে দক্ষিণ কোরিয়ার অংশগ্রহণ নিয়ে আলোচনা হয়।
তবে এই অগ্রগতিকে চূড়ান্ত ঋণ অনুমোদন হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। দক্ষিণ কোরিয়ার অর্থায়ন সংক্রান্ত অগ্রাধিকার বর্তমানে পর্যালোচনাধীন রয়েছে। দেশটির সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা করে প্রকল্পের প্রস্তাব বিবেচনা করা হবে। ফলে আনুষ্ঠানিক ঋণচুক্তি স্বাক্ষর এবং অর্থ ছাড়ের আগে পুরো অর্থায়ন নিশ্চিত হয়েছে বলে দাবি করা ঠিক হবে না।
বাংলাদেশের জন্য এই অর্থায়ন গুরুত্বপূর্ণ। কারণ রাজধানীর পশ্চিমাঞ্চলের গাবতলী থেকে পূর্বাঞ্চলের দাশেরকান্দি পর্যন্ত নতুন মেট্রোরেল নির্মাণে বিপুল অর্থের প্রয়োজন। প্রকল্পটির মোট অনুমোদিত ব্যয় প্রায় ৪৫ হাজার ৫০৪ কোটি টাকা। এর মধ্যে সরকারের নিজস্ব অর্থায়নের পাশাপাশি বৈদেশিক ঋণের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে।
গত ১৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬ জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির সভায় প্রকল্পটি অনুমোদন দেওয়া হয়। অনুমোদিত ব্যয়ের মধ্যে সরকারি অর্থায়নের পরিমাণ প্রায় ১৫ হাজার ১৯৮ কোটি টাকা। বাকি প্রায় ৩০ হাজার ৩০৬ কোটি টাকা এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক এবং দক্ষিণ কোরিয়ার অর্থনৈতিক উন্নয়ন সহযোগিতা তহবিলের মাধ্যমে সংগ্রহের পরিকল্পনা রয়েছে।
দ্য ফিন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেসের ৫ নভেম্বরের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক প্রকল্পটিতে প্রায় ২৫০ কোটি মার্কিন ডলার সহায়তার আশ্বাস দিয়েছে। অন্যদিকে দক্ষিণ কোরিয়ার প্রস্তাবিত ১১০ কোটি ডলারের ঋণ প্রকল্পের অর্থায়ন কাঠামোর গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তবে বিভিন্ন পর্যায়ের অর্থায়ন প্রতিশ্রুতি ও আনুষ্ঠানিক ঋণচুক্তির মধ্যে পার্থক্য রয়েছে। তাই সব অর্থের চূড়ান্ত অনুমোদন ও ছাড় নিশ্চিত হওয়ার বিষয়টি এখনো গুরুত্বপূর্ণ।
প্রকল্পটির বাস্তবায়নের দায়িত্বে রয়েছে ঢাকা ম্যাস ট্রানজিট কোম্পানি লিমিটেড। পরিকল্পনা অনুযায়ী, ১৭ দশমিক ২০ কিলোমিটার দীর্ঘ এই রেলপথ গাবতলী থেকে শুরু হয়ে দাশেরকান্দিতে শেষ হবে। এর মধ্যে ১৩ দশমিক ১০ কিলোমিটার থাকবে মাটির নিচে এবং ৪ দশমিক ১০ কিলোমিটার থাকবে উড়ালপথে।
পুরো পথে মোট ১৫টি স্টেশন নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে। এর মধ্যে ১১টি হবে ভূগর্ভস্থ এবং চারটি হবে উড়ালপথে। গাবতলী, টেকনিক্যাল, কল্যাণপুর, শ্যামলী, কলেজগেট, আসাদগেট, শুক্রাবাদ, কারওয়ান বাজার, হাতিরঝিল, তেজগাঁও এবং আফতাবনগর এলাকার বিভিন্ন অংশের সঙ্গে এই রেলপথের সংযোগ তৈরি হবে। পরবর্তী অংশে আফতাবনগর কেন্দ্র, আফতাবনগর পূর্ব, নাছিরাবাদ হয়ে দাশেরকান্দিতে পৌঁছাবে মেট্রোরেল।
প্রকল্পের নির্ধারিত বাস্তবায়নকাল ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বর থেকে ২০৩৩ সালের আগস্ট পর্যন্ত। তবে এই সময়সীমা বজায় রাখা অনেকটাই নির্ভর করবে অর্থায়ন নিশ্চিত করা, ঋণচুক্তি সম্পন্ন করা, দরপত্র প্রক্রিয়া এবং নির্মাণকাজের অগ্রগতির ওপর।
নতুন এই রেলপথ চালু হলে রাজধানীর পশ্চিম ও পূর্বাঞ্চলের মানুষের যাতায়াত সহজ হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। বর্তমানে গাবতলী, শ্যামলী, আসাদগেট, কারওয়ান বাজার, তেজগাঁও ও আফতাবনগর এলাকায় যানজটের কারণে প্রতিদিন অসংখ্য মানুষকে দীর্ঘ সময় রাস্তায় কাটাতে হয়। মেট্রোরেল চালু হলে এসব এলাকার যাত্রীদের জন্য দ্রুত ও তুলনামূলক নির্ভরযোগ্য যাতায়াতের সুযোগ তৈরি হতে পারে।
প্রকল্প পরিকল্পনায় গাবতলী থেকে দাশেরকান্দি পর্যন্ত যাত্রার সময় প্রায় ২৮ মিনিট ধরা হয়েছে। এতে রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক, আবাসিক ও কর্মসংস্থান এলাকাগুলোর মধ্যে যোগাযোগ বাড়বে। একই সঙ্গে সড়কের ওপর ব্যক্তিগত গাড়ি ও অন্যান্য যানবাহনের চাপ কমানোর সুযোগ তৈরি হবে।
এদিকে শুধু মেট্রোরেল নির্মাণ নয়, দক্ষিণ কোরিয়ার সঙ্গে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সহযোগিতার পরিধি বাড়ানোর বিষয়েও আলোচনা হয়েছে। ২০২৩ থেকে ২০২৭ মেয়াদের তিন বিলিয়ন ডলারের অর্থনৈতিক উন্নয়ন সহযোগিতা কাঠামো পর্যালোচনার পাশাপাশি মতলব উত্তর-গজারিয়া সেতু এবং বাংলাদেশ রেলওয়ের জন্য ২৬০টি ব্রডগেজ যাত্রীবাহী কোচ কেনার বিষয়ও আলোচনায় এসেছে।
বাংলাদেশের পক্ষ থেকে দক্ষিণ কোরিয়ার কাছে অবশিষ্ট অর্থায়ন ব্যবহারের জন্য সুস্পষ্ট পরিকল্পনা তুলে ধরা হয়েছে। পাশাপাশি অবকাঠামো, প্রযুক্তি, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এবং ডিজিটাল ব্যবস্থাপনায় সহযোগিতা বাড়ানোর প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।
তবে প্রকল্পটির সামনে এখনো কয়েকটি বড় চ্যালেঞ্জ রয়েছে। বৈদেশিক ঋণের চূড়ান্ত অনুমোদন, সুদের হার, ঋণ পরিশোধের সময়সীমা, নির্মাণ ব্যয় এবং সময়মতো অর্থ ছাড় নিশ্চিত করা জরুরি। এসব বিষয়ে বিলম্ব হলে প্রকল্পের বাস্তবায়নেও প্রভাব পড়তে পারে।
দক্ষিণ কোরিয়ার ১১০ কোটি ডলারের অর্থায়ন প্রস্তাব পুনর্বিবেচনার অগ্রগতি ঢাকার মেট্রোরেল সম্প্রসারণের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। তবে এখনই ঋণ নিশ্চিত হয়েছে বা নির্মাণকাজ পুরোপুরি শুরু হচ্ছে এমন দাবি করার সুযোগ নেই। আনুষ্ঠানিক ঋণচুক্তি ও অর্থায়ন নিশ্চিত হলেই প্রকল্পটির পরবর্তী ধাপ আরও স্পষ্ট হবে। রাজধানীবাসীর প্রত্যাশা, প্রয়োজনীয় অর্থায়ন ও প্রশাসনিক প্রস্তুতি দ্রুত সম্পন্ন করে গাবতলী থেকে দাশেরকান্দি পর্যন্ত মেট্রোরেল নির্মাণের কাজ এগিয়ে নেওয়া হবে।






মন্তব্য ০
লগইন করুন অথবা বিনা মূল্যে অ্যাকাউন্ট খুলুন আলোচনায় যোগ দিতে। নাম গোপন রেখেও মন্তব্য করতে পারবেন।
এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি করুন।