রুশ ডিজেল কিনতে ভয় মার্কিন ব্যবসায়ীদের, ট্রাম্প-পুতিনের চুক্তি ভেস্তে যাওয়ার শঙ্কা
যুক্তরাষ্ট্রে রুশ ডিজেল আমদানির উদ্যোগ বাধার মুখে; জাহাজের গন্তব্য বদল, ক্রেতাদের অনীহা এবং আইনি বিতর্কে ট্রাম্প-পুতিনের সমঝোতা ঘিরে বাড়ছে অনিশ্চয়তা।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের মধ্যে রুশ ডিজেল সরবরাহ নিয়ে করা সমঝোতা বড় ধরনের অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে জ্বালানির দাম কমানোর উদ্দেশ্যে নেওয়া এই উদ্যোগ বাস্তবায়নে এখন বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে মার্কিন ব্যবসায়ীদের অনীহা, আইনি জটিলতা এবং রাজনৈতিক বিরোধিতা। রুশ ডিজেলবাহী একাধিক জাহাজের গন্তব্য পরিবর্তন এবং সম্ভাব্য ক্রেতা না পাওয়ার ঘটনাও পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।
আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত অক্টোবরের শুরুতে ট্রাম্প ও পুতিনের মধ্যে রুশ ডিজেল সরবরাহ নিয়ে সমঝোতার কথা সামনে আসে। ট্রাম্পের দাবি ছিল, রাশিয়া থেকে অতিরিক্ত ডিজেল সরবরাহ করা হলে যুক্তরাষ্ট্রসহ আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির সংকট কমবে। বিশেষ করে পরিবহন, কৃষি এবং নির্মাণ খাতে ব্যবহৃত ডিজেলের বাড়তি দামের চাপ থেকে মার্কিন জনগণকে স্বস্তি দেওয়াই ছিল এই উদ্যোগের অন্যতম লক্ষ্য।
গত ৯ অক্টোবর ট্রাম্প রাশিয়ার সঙ্গে ডিজেল সরবরাহের পরিকল্পনার ঘোষণা দেন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, রাশিয়া প্রথম পর্যায়ে তিন লাখ টন ডিজেল সরবরাহ করবে। পরবর্তী সময়ে নভেম্বর মাসে আরও পাঁচ লাখ টন এবং এরপর অতিরিক্ত জ্বালানি বাজারে ছাড়ার পরিকল্পনার কথাও জানানো হয়। তবে ঘোষিত পরিমাণের জ্বালানি বাস্তবে যুক্তরাষ্ট্রে পৌঁছানো এবং তা বিক্রি করার বিষয়টি এখনো নিশ্চিত নয়।
এই সমঝোতার আওতায় রাশিয়ার ডিজেল রপ্তানির ওপর যুক্তরাষ্ট্রের কিছু নিষেধাজ্ঞা সাময়িকভাবে শিথিল করার উদ্যোগ নেওয়া হয়। কিন্তু বিষয়টি প্রকাশ্যে আসার পর থেকেই মার্কিন রাজনীতিতে বিতর্ক শুরু হয়। সমালোচকদের অভিযোগ, ইউক্রেনের বিরুদ্ধে রাশিয়ার যুদ্ধ চলমান থাকা অবস্থায় মস্কো থেকে জ্বালানি কেনার মাধ্যমে পুতিনের সরকারকে নতুন করে অর্থনৈতিক সুবিধা দেওয়া হচ্ছে।
সবচেয়ে বড় সমস্যা তৈরি হয়েছে সম্ভাব্য ক্রেতাদের নিয়ে। মার্কিন জ্বালানি ব্যবসায়ী, আমদানিকারক, ব্যাংক এবং বন্দর পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠানগুলো রুশ ডিজেল কেনা বা খালাসের সঙ্গে যুক্ত হতে সতর্ক অবস্থান নিয়েছে। কারণ, বর্তমান প্রশাসনের দেওয়া ছাড় থাকলেও কংগ্রেসের প্রণীত আইনের সঙ্গে এর সামঞ্জস্য নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। ভবিষ্যতে রাজনৈতিক পরিস্থিতি পরিবর্তিত হলে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলো আইনি জটিলতায় পড়তে পারে—এমন আশঙ্কাও রয়েছে।
রয়টার্সের ২৯ অক্টোবরের প্রতিবেদন অনুযায়ী, রাশিয়ার প্রিমোরস্ক বন্দর থেকে ডিজেল নিয়ে যাত্রা করা লেরুয়ো নামের একটি জাহাজ প্রথমে ব্রাজিলের মানাউসের দিকে যাওয়ার সংকেত দিয়েছিল। পরে জাহাজটির গন্তব্য পরিবর্তন করে আটলান্টিক মহাসাগরীয় উপকূলের দিকে নির্দেশ করা হয়। তবে এর চূড়ান্ত গন্তব্য নিশ্চিত করা যায়নি।
অন্যদিকে, ৫ নভেম্বর প্রকাশিত ফিন্যান্সিয়াল টাইমসের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রথম পর্যায়ের তিনটি জাহাজের মধ্যে দুটি যুক্তরাষ্ট্রে ডিজেল পৌঁছে দেওয়ার নির্ধারিত পরিকল্পনা থেকে সরে গেছে। ট্যালিসম্যান নামের একটি জাহাজ ভূমধ্যসাগরের দিকে গেছে এবং লেরুয়োর গন্তব্য ব্রাজিলের দিকে পরিবর্তিত হয়েছে। তৃতীয় জাহাজ আগিওই ফানেন্দেস নিউইয়র্কের দিকে যাত্রা অব্যাহত রাখলেও কোথায় জ্বালানি খালাস করবে, তা নিশ্চিত হয়নি।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, আগিওই ফানেন্দেস জাহাজটি রাশিয়ার প্রিমোরস্ক বন্দর থেকে প্রায় ৪০ হাজার টন ডিজেল নিয়ে যাত্রা করেছিল। এর আগে জাহাজটির সম্ভাব্য গন্তব্য হিসেবে নিউইয়র্কের নাম দেখা গেলেও পরে নির্দিষ্ট খালাসস্থল নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়। ফলে যুক্তরাষ্ট্রে জ্বালানি পৌঁছানোর পরিকল্পনা কতটা সফল হবে, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
এদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের নিউ জার্সি অঙ্গরাজ্যের গভর্নর মিকি শেরিল রুশ ডিজেলবাহী জাহাজের পণ্য খালাস ঠেকানোর সম্ভাব্য পদক্ষেপ পর্যালোচনার কথা জানিয়েছেন। তাঁর অবস্থান, রাশিয়ার জ্বালানি কেনার মাধ্যমে দেশটির যুদ্ধ পরিচালনার অর্থনৈতিক সক্ষমতা বাড়ানো উচিত নয়। একই সঙ্গে মার্কিন আইনপ্রণেতারাও বিভিন্ন ব্যাংক, বন্দর কর্তৃপক্ষ এবং জ্বালানি প্রতিষ্ঠানের কাছে সতর্কবার্তা পাঠিয়েছেন।
সিনেটর রিচার্ড ব্লুমেনথালসহ কয়েকজন আইনপ্রণেতা সংশ্লিষ্ট জাহাজ পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠানের কাছে জানতে চেয়েছেন, কারা এই জ্বালানি কিনছে, কারা বিক্রি করছে এবং কোন প্রতিষ্ঠান পরিবহন ও খালাসের দায়িত্বে রয়েছে। তাঁদের আশঙ্কা, নিষেধাজ্ঞা শিথিলের প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের সঙ্গে বিদ্যমান আইনের সংঘাত তৈরি হতে পারে।
আইনি বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে ২০২২ সালে প্রণীত রুশ জ্বালানি আমদানি নিষিদ্ধ করার আইন। যুক্তরাষ্ট্রের অর্থ মন্ত্রণালয়ের অধীন বৈদেশিক সম্পদ নিয়ন্ত্রণ দপ্তর নির্দিষ্ট কিছু লেনদেনের জন্য সাময়িক ছাড় দিলেও কংগ্রেসের আইনের সীমাবদ্ধতা পুরোপুরি দূর হয়েছে কি না, তা নিয়ে বিতর্ক রয়েছে। আইন বিশেষজ্ঞদের একাংশের মতে, নির্বাহী আদেশের মাধ্যমে প্রশাসনিক নিষেধাজ্ঞা শিথিল করা সম্ভব হলেও কংগ্রেসের প্রণীত আইন অগ্রাহ্য করার ক্ষমতা প্রেসিডেন্টের নেই।
এই পরিস্থিতিতে ব্যবসায়ীরা শুধু বর্তমান সরকারের অনুমোদনের ওপর নির্ভর করতে চাইছেন না। তাঁরা ভবিষ্যতে মামলা, আর্থিক জরিমানা, নিষেধাজ্ঞা এবং ব্যবসায়িক সুনাম ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকিও বিবেচনায় নিচ্ছেন। ফলে রাশিয়া থেকে কম দামে ডিজেল পাওয়ার সুযোগ থাকলেও অনেক প্রতিষ্ঠান সরাসরি কেনাকাটায় আগ্রহ দেখাচ্ছে না।
অন্যদিকে, রাশিয়ার জন্যও এই পরিস্থিতি পুরোপুরি স্বস্তিদায়ক নয়। দেশটির ডিজেল রপ্তানির একটি বড় অংশ দীর্ঘদিন ধরে তুরস্ক ও ব্রাজিলের মতো বাজারের ওপর নির্ভরশীল। যুক্তরাষ্ট্রে নতুন বাজার তৈরি হলে রাশিয়ার রপ্তানি আয় বাড়ার সম্ভাবনা ছিল। কিন্তু মার্কিন ক্রেতাদের অনীহা সেই পরিকল্পনাকে বাধাগ্রস্ত করছে।
বিশ্লেষকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্রে ডিজেলের দাম কমানোর জন্য রাশিয়ার এই সরবরাহ কতটা কার্যকর হবে, তা নিয়েও সন্দেহ রয়েছে। আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির সরবরাহ, পরিশোধন সক্ষমতা, পরিবহন ব্যয় এবং মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতসহ বিভিন্ন বিষয় ডিজেলের দামকে প্রভাবিত করছে। ফলে কয়েকটি জাহাজের জ্বালানি দিয়ে পুরো মার্কিন বাজারে বড় ধরনের পরিবর্তন আনা কঠিন।
এখানে ৩ নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচন নিয়েও রাজনৈতিক প্রভাব রয়েছে। নির্বাচনের আগে জ্বালানির মূল্য কমানোর উদ্যোগ হিসেবে ট্রাম্পের এই সমঝোতা আলোচনায় এসেছিল। তবে মধ্যবর্তী নির্বাচনে প্রেসিডেন্ট পদে নির্বাচন হয় না। তাই নির্বাচনের ফলাফলের পর ট্রাম্প নিজে নির্বাচনে পরাজিত হয়েছেন—এমন দাবি বিভ্রান্তিকর। বরং নির্বাচনের পর কংগ্রেসের রাজনৈতিক সমীকরণ এবং ভবিষ্যৎ তদন্তের আশঙ্কা ব্যবসায়ীদের সিদ্ধান্তে প্রভাব ফেলতে পারে।
রুশ ডিজেল আমদানির পরিকল্পনা এখন রাজনৈতিক বিরোধিতা, আইনি অনিশ্চয়তা এবং বাণিজ্যিক ঝুঁকির মধ্যে আটকে রয়েছে। জাহাজগুলোর চূড়ান্ত গন্তব্য, সম্ভাব্য ক্রেতা এবং যুক্তরাষ্ট্রের বন্দরে জ্বালানি খালাসের অনুমতি এসব বিষয়ই নির্ধারণ করবে ট্রাম্প-পুতিনের সমঝোতা শেষ পর্যন্ত বাস্তবায়িত হবে, নাকি এটি ব্যর্থ কূটনৈতিক ও বাণিজ্যিক উদ্যোগে পরিণত হবে।






মন্তব্য ০
লগইন করুন অথবা বিনা মূল্যে অ্যাকাউন্ট খুলুন আলোচনায় যোগ দিতে। নাম গোপন রেখেও মন্তব্য করতে পারবেন।
এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি করুন।