মৃত্যুদণ্ডের ব্যর্থ প্রচেষ্টার পর তীব্র যন্ত্রণায় দিন কাটছে ক্রিস্টা পাইকের
মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের ব্যর্থ প্রচেষ্টায় প্রাণে বেঁচে যাওয়া ক্রিস্টা পাইক জানিয়েছেন, শারীরিক যন্ত্রণা, মানসিক কষ্ট ও নিঃসঙ্গতার মধ্যেই কাটছে তাঁর বর্তমান জীবন।
যুক্তরাষ্ট্রের টেনেসি অঙ্গরাজ্যে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের ব্যর্থ প্রচেষ্টার এক মাস পর নিজের শারীরিক ও মানসিক যন্ত্রণার কথা প্রকাশ করেছেন মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত নারী ক্রিস্টা পাইক। গত ৩০ সেপ্টেম্বর প্রাণঘাতী ওষুধ প্রয়োগের মাধ্যমে তাঁর মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের চেষ্টা করা হয়। কিন্তু দুই দফা ওষুধ প্রয়োগের পরও তাঁর মৃত্যু হয়নি। গুরুতর অসুস্থ অবস্থায় তাঁকে হাসপাতালে নেওয়া হয়। এক মাস পর গত ৩০ অক্টোবর প্রকাশিত প্রথম বিবৃতিতে পাইক জানান, সেই রাতের পর থেকে তাঁর শরীর ও মনে অবিরাম যন্ত্রণা চলছে। তাঁর আইনজীবীদের মাধ্যমে প্রকাশিত এই বক্তব্য যুক্তরাষ্ট্রে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের পদ্ধতি, কারা কর্তৃপক্ষের দায়িত্ব এবং মানবিক আচরণ নিয়ে নতুন করে বিতর্ক সৃষ্টি করেছে।
পঞ্চাশ বছর বয়সী পাইক বর্তমানে টেনেসির ডেবরা কে জনসন পুনর্বাসন কেন্দ্রে রয়েছেন। মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের ব্যর্থ প্রচেষ্টার পর তাঁকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছিল। পরে ১০ অক্টোবর হাসপাতাল থেকে ছেড়ে দিয়ে আবার কারাগারে ফিরিয়ে নেওয়া হয়। সেখানে তিনি চিকিৎসা পাচ্ছেন। রয়টার্সের প্রতিবেদন অনুযায়ী, কারাগারের চিকিৎসা ওয়ার্ডে থাকা অবস্থায় তিনি আইনজীবীদের কাছে নিজের অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন।
পাইকের বক্তব্য অনুযায়ী, শরীরের বিভিন্ন অংশে ব্যথা রয়েছে। বিশেষ করে দুই হাত, হাতের তালু ও গলায় যন্ত্রণা অনুভব করছেন তিনি। কথা বলতেও এখনো কষ্ট হচ্ছে। শারীরিক কষ্টের পাশাপাশি মানসিকভাবেও বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছেন বলে জানিয়েছেন এই বন্দি।
তিনি জানান, মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের দিন তিনি শান্তভাবে মৃত্যুকে মেনে নেওয়ার প্রস্তুতি নিয়েছিলেন। কিন্তু কয়েক দিন পর হাসপাতালে একা ও বিভ্রান্ত অবস্থায় জেগে ওঠেন। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, সেই রাতের পর থেকে এমন কোনো মুহূর্ত যায়নি, যখন তিনি ব্যথামুক্ত ছিলেন। শরীরের যন্ত্রণা ছাড়াও মন ও আত্মায় গভীর কষ্ট অনুভব করছেন তিনি।
পাইক আরও বলেন, মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের পর জীবিত থাকার কোনো পরিকল্পনা তাঁর ছিল না। মৃত্যুর জন্য প্রস্তুত হয়ে তিনি বিদায় জানিয়েছিলেন। কিন্তু হঠাৎ হাসপাতালে জেগে ওঠার পর নিজের ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তায় পড়েছেন। কেন তিনি বেঁচে গেলেন এবং সামনে কী ঘটবে, তা এখনো বুঝতে পারছেন না।
নিজের পরিস্থিতির কথা বলতে গিয়ে অপরাধের শিকার পরিবারের যন্ত্রণার কথাও উল্লেখ করেছেন পাইক। তিনি বলেন, তাঁর কারণে যে পরিবারটি প্রিয়জনকে হারিয়েছে, তাদের কষ্ট ও ক্ষতির কথা তিনি এখনো ভাবেন। মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের ব্যর্থতার পেছনে অদক্ষতার অভিযোগ তুলে তিনি গভীর হতাশা প্রকাশ করেছেন। একই সঙ্গে তাঁকে চিকিৎসা দেওয়া কর্মীদের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়েছেন।
১৯৯৫ সালে সংঘটিত একটি হত্যাকাণ্ডের জন্য পাইকের মৃত্যুদণ্ড হয়েছিল। সে সময় তাঁর বয়স ছিল ১৮ বছর। মামলার তথ্য অনুযায়ী, পাইক ও তাঁর তৎকালীন প্রেমিক মিলে সহপাঠী কলিন স্লেমারকে নির্যাতন ও ছুরিকাঘাত করে হত্যা করেন। স্লেমারের বয়স ছিল ১৯ বছর। এই অপরাধে দোষী সাব্যস্ত হওয়ার পর পাইককে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। তিনি যুক্তরাষ্ট্রের মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত নারীদের মধ্যে অন্যতম কমবয়সী হিসেবে পরিচিত হন।
গত ৩০ সেপ্টেম্বর ন্যাশভিলের রিভারবেন্ড কারাগারে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের প্রক্রিয়া শুরু হয়। কারা কর্তৃপক্ষ পেন্টোবারবিটাল নামের প্রাণঘাতী ওষুধ শিরার মাধ্যমে প্রয়োগ করে। কিন্তু দুই দফা ওষুধ দেওয়ার পরও পাইকের মৃত্যু হয়নি। তাঁকে গুরুতর অসুস্থ অবস্থায় হাসপাতালে নেওয়া হয়। কয়েক দিন তিনি অচেতন অবস্থায় ছিলেন এবং শ্বাস-প্রশ্বাসের সহায়ক যন্ত্রের মাধ্যমে চিকিৎসা দেওয়া হয়।
পাইকের আইনজীবীদের দাবি, ওষুধ সঠিকভাবে রক্তপ্রবাহে প্রবেশ করেনি। তাঁদের ধারণা, শিরার সংযোগে সমস্যা হওয়ায় ওষুধ হাতের টিস্যুতে জমা হয়ে ক্ষত সৃষ্টি করে। এতে তাঁর দুই হাতে গুরুতর আঘাত, ফোসকা ও পোড়ার মতো ক্ষতি হয়। তবে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের ব্যর্থতার সুনির্দিষ্ট কারণ এখনো তদন্তাধীন। তাই আইনজীবীদের এই বক্তব্যকে চূড়ান্ত চিকিৎসাগত সিদ্ধান্ত হিসেবে বিবেচনা করা যাচ্ছে না।
ঘটনার পর টেনেসির গভর্নর বিল লি মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের বিষয়টি তদন্তের নির্দেশ দেন। অঙ্গরাজ্যে ২০২৬ সালের বাকি সময়ের জন্য নির্ধারিত অন্য মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের উদ্যোগও স্থগিত করা হয়েছে। কারা বিভাগের প্রধান কর্মকর্তা পদত্যাগ করেছেন। তদন্তে কীভাবে এই ব্যর্থতা ঘটল, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
পাইকের আইনজীবীরা তাঁর মৃত্যুদণ্ড কমিয়ে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডে রূপান্তরের আবেদন জানিয়েছেন। তাঁদের দাবি, ব্যর্থ মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের পর পাইককে কারাগারের চিকিৎসা ওয়ার্ডে বিচ্ছিন্ন অবস্থায় রাখা হচ্ছে। এতে তাঁর মানসিক যন্ত্রণা আরও বাড়ছে। আইনজীবীরা আদালতের কাছে অন্য বন্দিদের সঙ্গে তাঁর যোগাযোগের সুযোগ ফিরিয়ে দেওয়ার আবেদনও করেছেন। তবে সাজা পরিবর্তনের বিষয়ে এখনো কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের খবর পাওয়া যায়নি।
এই ঘটনা যুক্তরাষ্ট্রে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের পদ্ধতি নিয়ে নতুন করে বিতর্ক সৃষ্টি করেছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, শিরায় ওষুধ প্রবেশ করানোর জটিলতা, প্রশিক্ষণের ঘাটতি এবং চিকিৎসা-সংক্রান্ত তদারকির অভাব এ ধরনের ঘটনার ঝুঁকি বাড়াতে পারে। তবে পাইকের ক্ষেত্রে ঠিক কী কারণে ওষুধ কার্যকর হয়নি, তা তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত নিশ্চিতভাবে বলা যাচ্ছে না।
পাইক তাঁর বিবৃতিতে চিকিৎসাকর্মীদের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়েছেন, যাঁরা তাঁকে বাঁচানোর চেষ্টা করেছেন। একই সঙ্গে যারা তাঁর প্রতি সহানুভূতি দেখিয়েছেন, তাঁদের প্রতিও কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছেন। তিনি বলেন, কেন তিনি বেঁচে গেলেন এবং সামনে কী অপেক্ষা করছে, তা তিনি জানেন না। আপাতত প্রতিদিন একটু একটু করে সুস্থ হওয়ার চেষ্টা করছেন।
তাঁর মৃত্যুদণ্ডের ভবিষ্যৎ এখনো অনিশ্চিত। গভর্নর বিল লি সাজা পরিবর্তনের বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দেননি। আদালত ও তদন্তের পরবর্তী পদক্ষেপের ওপর নির্ভর করছে এই মামলার ভবিষ্যৎ। মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের ব্যর্থ প্রচেষ্টার পর পাইকের প্রথম প্রকাশ্য বক্তব্য তাই শুধু একজন বন্দির যন্ত্রণার বিবরণ নয়; এটি যুক্তরাষ্ট্রের মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের পদ্ধতি ও তার জবাবদিহি নিয়ে চলমান বিতর্কেরও গুরুত্বপূর্ণ অংশ।






মন্তব্য ০
লগইন করুন অথবা বিনা মূল্যে অ্যাকাউন্ট খুলুন আলোচনায় যোগ দিতে। নাম গোপন রেখেও মন্তব্য করতে পারবেন।
এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি করুন।