ডেটোনার সভায় তিন দফা বাধা, বিক্ষোভকারীদের ‘অপদার্থ’ বলে তোপ দাগলেন ট্রাম্প
যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডায় নির্বাচনী সভায় তিন দফা বাধার মুখে ক্ষুব্ধ হন ট্রাম্প; বিক্ষোভকারীকে অপমানসূচক কথা বলে নিরাপত্তাকর্মীদের দিয়ে বের করান।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প আবারও নির্বাচনী জনসভায় বিক্ষোভকারীদের বাধার মুখে পড়ে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন। ফ্লোরিডার ডেটোনা বিচে আয়োজিত এক নির্বাচনী সমাবেশে বক্তব্য দেওয়ার সময় একাধিক ব্যক্তি তাঁর বক্তব্যে বাধা দেন। এতে বিরক্ত হয়ে এক বিক্ষোভকারীর উদ্দেশে তিনি বারবার চুপ থাকতে বলেন এবং তাঁকে অপমান করে ‘অপদার্থ’ ও ‘হতভাগা’ বলে মন্তব্য করেন। পরে নিরাপত্তাকর্মীদের নির্দেশ দেন ওই ব্যক্তিকে সভাস্থল থেকে বের করে দিতে। ঘটনাটির ভিডিও প্রকাশের পর যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।
৩০ অক্টোবর শুক্রবার ফ্লোরিডার ডেটোনা বিচের ওশান সেন্টারে এই সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। আগামী ৩ নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে রিপাবলিকান প্রার্থীদের পক্ষে জনসমর্থন বাড়াতে সেখানে উপস্থিত হয়েছিলেন ট্রাম্প। তাঁর নির্বাচনী প্রচারণার এই আয়োজনে কয়েক হাজার সমর্থক অংশ নেন। তবে সমাবেশের একপর্যায়ে বিক্ষোভকারীদের প্রতিবাদে বক্তব্য বারবার বিঘ্নিত হয়।
যুক্তরাষ্ট্রের সংবাদমাধ্যম ডেইলি বিস্টের প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, বক্তব্যের শুরুর দিকে দর্শকসারির ওপরের অংশ থেকে একজন ব্যক্তি চিৎকার করে প্রতিবাদ জানান। তবে ওই ব্যক্তি ঠিক কী বলছিলেন, তা মঞ্চের শব্দ ধারণকারী যন্ত্রে স্পষ্টভাবে ধরা পড়েনি। ট্রাম্প প্রতিবাদের শব্দ শুনে থেমে যান এবং বিরক্তি প্রকাশ করেন। পরে নিরাপত্তাকর্মীদের তাঁকে সরিয়ে নেওয়ার নির্দেশ দেন।
এরপর ট্রাম্পের উদ্দেশে আরেকজন প্রতিবাদ জানালে পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। তখন তিনি আঙুল তুলে ওই ব্যক্তির দিকে ইঙ্গিত করে বলেন, চুপ করো, চুপ করো, অপদার্থ! চুপ করো, হতভাগা! তাঁকে এখান থেকে বের করে দাও। তাঁর এমন উত্তেজিত প্রতিক্রিয়ার সময় সভাস্থলে উপস্থিত সমর্থকদের একাংশ উল্লাস প্রকাশ করেন। পরে নিরাপত্তাকর্মীরা ওই ব্যক্তিকে সভাস্থল থেকে সরিয়ে নিয়ে যান।
তবে ঘটনাটি শুধু একজন বিক্ষোভকারীর মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না। সংবাদমাধ্যমগুলোর প্রতিবেদন অনুযায়ী, ওই সমাবেশে মোট তিন দফায় প্রতিবাদকারীদের কারণে ট্রাম্পের বক্তব্য বাধাগ্রস্ত হয়। প্রথম প্রতিবাদকারীকে সরিয়ে নেওয়ার পরও নতুন করে প্রতিবাদ শুরু হয়। একপর্যায়ে ট্রাম্প আরেকজনকে অর্থের বিনিময়ে প্রতিবাদ করতে আসা ব্যক্তি বলে অভিযোগ করেন।
তিনি দাবি করেন, এসব প্রতিবাদকারীর পরিচয় ও সংশ্লিষ্ট তথ্য কর্তৃপক্ষের কাছে রয়েছে। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, প্রতিবাদ করার জন্য তাঁদের ২৫০ ডলার করে দেওয়া হয় এবং পরে তাঁদের গ্রেপ্তার করা হয়। তবে এই অর্থ প্রদানের অভিযোগের পক্ষে তিনি জনসমক্ষে কোনো যাচাইযোগ্য প্রমাণ উপস্থাপন করেননি। ফলে তাঁর এই বক্তব্যকে প্রতিষ্ঠিত সত্য হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।
সমাবেশে তৃতীয়বারের মতো বাধা সৃষ্টি হওয়ার পর ট্রাম্প আবারও বিষয়টি নিয়ে মন্তব্য করেন। তিনি বলেন, প্রতিবাদকারীরা তাঁর বক্তব্যের গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তে বাধা দিচ্ছেন। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, তিনি কয়েকটি ভালো রসিকতা করার সময়ই বারবার বাধার মুখে পড়েছেন।
এই ঘটনা এমন এক সময়ে ঘটল, যখন যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতিতে মধ্যবর্তী নির্বাচন ঘিরে উত্তেজনা ক্রমেই বাড়ছে। আগামী ৩ নভেম্বর দেশটির মধ্যবর্তী নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা। এই নির্বাচনের মাধ্যমে প্রতিনিধি পরিষদ, সিনেটসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ নির্বাচিত পদে রাজনৈতিক শক্তির অবস্থান নির্ধারিত হবে। রিপাবলিকান ও ডেমোক্র্যাট—উভয় দলই শেষ মুহূর্তে ভোটারদের সমর্থন আদায়ের চেষ্টা করছে।
ফ্লোরিডার সমাবেশে ট্রাম্প বিশেষভাবে কয়েকজন রিপাবলিকান প্রার্থীর পক্ষে প্রচারণা চালান। তাঁদের মধ্যে রয়েছেন গভর্নর পদপ্রার্থী বাইরন ডোনাল্ডস, সিনেটর অ্যাশলি মুডি এবং প্রতিনিধি পরিষদের সদস্য র্যান্ডি ফাইন। তাঁদের নির্বাচনী লড়াইয়ে সমর্থন জোগাড় করাই ছিল এই সমাবেশের অন্যতম উদ্দেশ্য।
এদিকে চলতি মাসে ট্রাম্পের বিভিন্ন নির্বাচনী সমাবেশে প্রতিবাদ ও বিক্ষোভের ঘটনা একাধিকবার ঘটেছে। ডেইলি বিস্টের প্রতিবেদনে কানসাস, ওহাইও ও মিসিসিপিতে তাঁর বক্তব্যে বাধা দেওয়ার ঘটনাগুলোর কথাও উল্লেখ করা হয়েছে। এর আগে ২১ অক্টোবর দক্ষিণ ক্যারোলাইনায় এক সমাবেশেও কয়েকজন প্রতিবাদকারীকে সরিয়ে নেওয়া হয়।
বিশেষ করে ওহাইওর সমাবেশে একজন প্রতিবাদকারী কুখ্যাত যৌন অপরাধী জেফরি এপস্টেইনের সঙ্গে ট্রাম্পের অতীত সম্পর্কের প্রসঙ্গ তুলে চিৎকার করেছিলেন। ওই ঘটনায় ট্রাম্পও প্রতিবাদকারীর জবাব দেন এবং এপস্টেইনকে নিজের মার-আ-লাগো ক্লাব থেকে বের করে দেওয়ার দাবি পুনরায় তুলে ধরেন। ফলে সাম্প্রতিক সমাবেশগুলোতে প্রতিবাদকারীদের বক্তব্য এবং ট্রাম্পের প্রতিক্রিয়া রাজনৈতিক বিতর্কের বিষয় হয়ে উঠেছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের কাছে নির্বাচনী সমাবেশে এমন পরিস্থিতি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। কারণ জনসভায় প্রার্থীদের বক্তব্যের পাশাপাশি ভোটারদের প্রতিক্রিয়াও নির্বাচনী পরিবেশ সম্পর্কে ধারণা দেয়। সমর্থকদের উচ্ছ্বাস যেমন রাজনৈতিক শক্তির পরিচয় বহন করে, তেমনি বিরোধীদের প্রতিবাদও জনমতের ভিন্ন অবস্থান তুলে ধরে।
তবে একটি সমাবেশে কয়েকজনের প্রতিবাদকে পুরো দেশের জনমতের প্রতিফলন হিসেবে বিবেচনা করা ঠিক হবে না। একইভাবে প্রতিবাদকারীদের অর্থ দেওয়া হয়েছে বলে ট্রাম্পের অভিযোগও স্বাধীনভাবে প্রমাণিত নয়। এসব বিষয়ে নিশ্চিত সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে নির্ভরযোগ্য প্রমাণ ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বক্তব্য প্রয়োজন।
ডেটোনা বিচের এই ঘটনা মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে ট্রাম্পের নির্বাচনী প্রচারণায় নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে। সমর্থকদের সামনে তাঁর ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া, প্রতিবাদকারীদের সরিয়ে দেওয়া এবং অর্থের বিনিময়ে প্রতিবাদের অভিযোগ সবকিছুই এখন যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক আলোচনায় উঠে এসেছে। নির্বাচনের ফলাফল শেষ পর্যন্ত এসব ঘটনার ওপর কতটা প্রভাব ফেলবে, তা জানতে অপেক্ষা করতে হবে ভোটের ফল প্রকাশ পর্যন্ত।






মন্তব্য ০
লগইন করুন অথবা বিনা মূল্যে অ্যাকাউন্ট খুলুন আলোচনায় যোগ দিতে। নাম গোপন রেখেও মন্তব্য করতে পারবেন।
এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি করুন।