সৌদির আগুনে প্রাণ হারানো ১৬ বাংলাদেশির শেষ সাতজনের মরদেহ ফিরল দেশে
তিন মাসের অপেক্ষা শেষে রিয়াদের কারখানায় আগুনে নিহত সাত বাংলাদেশির মরদেহ শনিবার সকালে ঢাকায় পৌঁছেছে, স্বজনদের মধ্যে নেমেছে গভীর শোক।
সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদে সোফা তৈরির কারখানায় ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে নিহত আরও সাত বাংলাদেশি শ্রমিকের মরদেহ দেশে পৌঁছেছে। শনিবার (৩১ অক্টোবর) সকালে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের একটি বিশেষ ফ্লাইটে তাঁদের মরদেহ ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে আনা হয়। এর মধ্য দিয়ে গত ৯ আগস্টের ওই ভয়াবহ দুর্ঘটনায় নিহত ১৬ বাংলাদেশির সবার মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনার প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়েছে।
বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থা ও একাধিক সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের বিজি-৩৩৬ ফ্লাইটে মরদেহগুলো ঢাকায় পৌঁছায়। আগে নির্ধারিত সময় ছিল সকাল ৮টা ৫ মিনিট। তবে সংবাদমাধ্যমের পরবর্তী প্রতিবেদনে বিমানবন্দরে পৌঁছানোর সময় সকাল ৮টা ২১ মিনিট থেকে সাড়ে ৮টার মধ্যে উল্লেখ করা হয়েছে।
গত ৯ আগস্ট সৌদি আরবের রিয়াদে একটি সোফা তৈরির কারখানায় ভয়াবহ আগুন লাগে। ওই ঘটনায় ১৬ বাংলাদেশি শ্রমিক প্রাণ হারান। দুর্ঘটনার পর নিহতদের মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ নেয় বাংলাদেশ সরকার এবং রিয়াদে অবস্থিত বাংলাদেশ দূতাবাস। প্রথম পর্যায়ে গত ২৭ আগস্ট নয়জনের মরদেহ বাংলাদেশে পাঠানো হয়। কিন্তু বাকি সাতজনের মরদেহ আগুনে মারাত্মকভাবে পুড়ে যাওয়ায় তাঁদের পরিচয় তাৎক্ষণিকভাবে শনাক্ত করা সম্ভব হয়নি।
পরবর্তী সময়ে প্রয়োজনীয় নমুনা সংগ্রহ করে ডিএনএ পরীক্ষার মাধ্যমে বাকি সাতজনের পরিচয় নিশ্চিত করা হয়। পরিচয় শনাক্ত হওয়ার পর তাঁদের মরদেহ দেশে পাঠানোর জন্য প্রয়োজনীয় আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করা হয়। দীর্ঘ অপেক্ষার পর শনিবার তাঁদের মরদেহ দেশে পৌঁছায়।
নিহত সাতজনের মধ্যে পাঁচজন নওগাঁ জেলার এবং দুজন নাটোর জেলার বাসিন্দা। তাঁদের পরিচয় নিশ্চিত করেছে রিয়াদে অবস্থিত বাংলাদেশ দূতাবাসের শ্রম কাউন্সেলরের পাঠানো তথ্য। নিহতরা হলেন নওগাঁ সদর উপজেলার মো. শাহিন, আত্রাই উপজেলার মো. হাসিবুল হাসান শুভ, মিনহাজ প্রামাণিক, মো. মাসিদুল সরদার সজিব ও মো. সাগর আলী। অন্য দুজন হলেন নাটোরের নলডাঙ্গা উপজেলার মোহাম্মদ শামিম ও মো. সাব্বির হোসেন।
মরদেহ দেশে পাঠানোর ক্ষেত্রে পরিবহনসংক্রান্ত জটিলতাও তৈরি হয়েছিল। বাংলাদেশ দূতাবাসের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, গত ১০ অক্টোবর থেকে রিয়াদ থেকে সব ধরনের উড়োজাহাজ চলাচল সাময়িকভাবে বন্ধ থাকায় সেখান থেকে সরাসরি মরদেহ ঢাকায় পাঠানো সম্ভব হয়নি। ফলে বিকল্প ব্যবস্থা হিসেবে মরদেহগুলো সড়কপথে রিয়াদ থেকে জেদ্দায় নেওয়া হয়। পরে জেদ্দার কিং আবদুল আজিজ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের বিজি-৩৩৬ ফ্লাইটে ঢাকায় পাঠানো হয়।
৩০ অক্টোবর বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থা ও প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের বরাতে প্রকাশিত খবরে জানানো হয়েছিল, শনিবার সকালে মরদেহগুলো দেশে পৌঁছানোর কথা রয়েছে। পরদিন নির্ধারিত সূচি অনুযায়ী সেগুলো ঢাকায় পৌঁছায়। মরদেহ বিমানবন্দরে পৌঁছানোর পর প্রয়োজনীয় আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করে স্বজনদের কাছে হস্তান্তরের ব্যবস্থা করা হয়।
দীর্ঘদিন ধরে স্বজনের মরদেহের অপেক্ষায় থাকা পরিবারগুলোর জন্য এটি ছিল অত্যন্ত বেদনাদায়ক মুহূর্ত। জীবিকার তাগিদে সৌদি আরবে যাওয়া এসব শ্রমিক পরিবারের আর্থিক সচ্ছলতা ফেরানো, সন্তানদের ভবিষ্যৎ গড়া এবং স্বজনদের ভালো রাখার স্বপ্ন নিয়ে বিদেশে কাজ করছিলেন। কিন্তু কর্মস্থলের ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড তাঁদের জীবন কেড়ে নেয়। তাঁদের মৃত্যুর ফলে পরিবারগুলো শুধু প্রিয়জনকেই হারায়নি, অনেক ক্ষেত্রে পরিবারের প্রধান উপার্জনক্ষম ব্যক্তিকেও হারিয়েছে।
বিশেষ করে নওগাঁ ও নাটোরের প্রত্যন্ত এলাকার পরিবারগুলোর কাছে এই দুর্ঘটনা ছিল এক অপূরণীয় ক্ষতি। প্রথম দফায় নয়জনের মরদেহ দেশে ফেরার পরও বাকি সাতজনের পরিচয় শনাক্ত না হওয়ায় তাঁদের পরিবারের অপেক্ষা দীর্ঘ হয়েছিল। ডিএনএ পরীক্ষার মাধ্যমে পরিচয় নিশ্চিত হওয়ার পর অবশেষে মরদেহ দেশে আসায় স্বজনেরা শেষবারের মতো প্রিয়জনকে দেখার সুযোগ পেলেন।
এই দুর্ঘটনা বিদেশে কর্মরত বাংলাদেশি শ্রমিকদের নিরাপত্তার বিষয়টিও নতুন করে সামনে এনেছে। বিভিন্ন শিল্পকারখানা ও উৎপাদন প্রতিষ্ঠানে কাজ করতে গিয়ে প্রবাসী শ্রমিকদের অগ্নিকাণ্ডসহ নানা ধরনের ঝুঁকির মুখোমুখি হতে হয়। কর্মস্থলে পর্যাপ্ত অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা, জরুরি বহির্গমনপথ, নিরাপত্তা প্রশিক্ষণ এবং নিয়মিত তদারকি নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বিদেশে শ্রমিক পাঠানোর পাশাপাশি তাঁদের কর্মপরিবেশ ও নিরাপত্তার বিষয়েও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে গুরুত্ব দিতে হবে। নিয়োগদাতা প্রতিষ্ঠানের নিরাপত্তাব্যবস্থা সম্পর্কে আগাম তথ্য সংগ্রহ, শ্রমিকদের অধিকার নিশ্চিত করা এবং দুর্ঘটনার পর ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারকে যথাযথ সহায়তা দেওয়া প্রয়োজন। একই সঙ্গে এ ধরনের দুর্ঘটনার কারণ অনুসন্ধান করে দায়ীদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়াও গুরুত্বপূর্ণ।
রিয়াদের ওই অগ্নিকাণ্ডে নিহত ১৬ বাংলাদেশির মধ্যে প্রথম পর্যায়ে নয়জনের মরদেহ দেশে এসেছিল ২৭ আগস্ট। সর্বশেষ শনিবার বাকি সাতজনের মরদেহ ফেরার মধ্য দিয়ে সবার মরদেহ দেশে আনার কাজ শেষ হয়েছে। তবে মরদেহ ফিরে এলেও পরিবারগুলোর শোক ও ক্ষতি পূরণ হওয়ার নয়। প্রবাসী শ্রমিকদের জীবন ও কর্মস্থলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং নিহতদের পরিবারগুলোর পাশে দাঁড়ানো এখন সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব।






মন্তব্য ০
লগইন করুন অথবা বিনা মূল্যে অ্যাকাউন্ট খুলুন আলোচনায় যোগ দিতে। নাম গোপন রেখেও মন্তব্য করতে পারবেন।
এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি করুন।