যুক্তরাষ্ট্রের ৫০০ প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্র বিক্রির অনুমোদন, ইউক্রেনকে অপেক্ষা করতে হতে পারে কয়েক বছর
রাশিয়ার ক্ষেপণাস্ত্র হামলা মোকাবিলায় ইউক্রেনকে ৫০০টি অত্যাধুনিক আকাশ প্রতিরক্ষা ক্ষেপণাস্ত্র বিক্রির অনুমোদন দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র, তবে সরবরাহ নিয়ে অনিশ্চয়তা বাড়ছে।
রাশিয়ার ক্রমবর্ধমান ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা মোকাবিলায় ইউক্রেনের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা শক্তিশালী করতে ৫০০টি প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্র বিক্রির অনুমোদন দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। তবে এই সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানালেও দ্রুত অস্ত্র পাওয়ার বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি। তাঁর আশঙ্কা, গুরুত্বপূর্ণ এই ক্ষেপণাস্ত্রগুলো ইউক্রেনে পৌঁছাতে কয়েক বছর পর্যন্ত সময় লাগতে পারে। ফলে চলমান যুদ্ধের মধ্যে দেশটির তাৎক্ষণিক প্রতিরক্ষা চাহিদা পূরণ নিয়ে নতুন অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।
আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রের অনুমোদিত এই সম্ভাব্য অস্ত্র বিক্রির পরিমাণ প্রায় ২১০ কোটি ডলার। এতে থাকছে ৫০০টি পিএসি-৩ শ্রেণির প্যাট্রিয়ট প্রতিরোধী ক্ষেপণাস্ত্র। এগুলো মূলত শত্রুপক্ষের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রসহ বিভিন্ন ধরনের আকাশপথের হুমকি প্রতিহত করার জন্য তৈরি।
তবে অনুমোদন পাওয়ার অর্থ এই নয় যে ক্ষেপণাস্ত্রগুলো এখনই ইউক্রেনের হাতে পৌঁছে যাবে। সংশ্লিষ্ট সূত্রের বরাত দিয়ে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ক্ষেপণাস্ত্রগুলো এখনো উৎপাদিত হয়নি। উৎপাদন ও সরবরাহ প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে দীর্ঘ সময় প্রয়োজন হতে পারে। এমনকি এগুলো ইউক্রেনে পৌঁছাতে ২০৩০-এর দশকের শুরুর দিক পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হতে পারে।
এই দীর্ঘ সময়সীমা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন জেলেনস্কি। তাঁর মতে, ইউক্রেনের প্রয়োজন এখনই। কারণ রাশিয়ার হামলায় দেশটির বিভিন্ন শহর, বিদ্যুৎকেন্দ্র, জ্বালানি অবকাঠামো এবং গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা প্রতিনিয়ত ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। কয়েক বছর পর ক্ষেপণাস্ত্র পাওয়ার প্রতিশ্রুতি বর্তমান পরিস্থিতির তাৎক্ষণিক সমাধান দিতে পারবে না।
জেলেনস্কি যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় মিত্রদের কাছে বর্তমানে মজুত থাকা ক্ষেপণাস্ত্র থেকে ইউক্রেনকে জরুরি ভিত্তিতে সরবরাহের আহ্বান জানিয়েছেন। তাঁর প্রস্তাব অনুযায়ী, মিত্রদেশগুলো নিজেদের মজুত থেকে কিছু ক্ষেপণাস্ত্র ইউক্রেনকে দিতে পারে। পরবর্তী সময়ে নতুন উৎপাদিত ক্ষেপণাস্ত্র দিয়ে তাদের মজুত পূরণ করা সম্ভব। এতে ইউক্রেনের বর্তমান প্রতিরক্ষা চাহিদা কিছুটা পূরণ হতে পারে।
এই অস্ত্র বিক্রির অর্থায়নের বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ। প্রায় ২১০ কোটি ডলারের সম্ভাব্য চুক্তির অর্থায়নে কানাডা, জার্মানি ও নরওয়ের পাশাপাশি ইউরোপীয় সহায়তার বিষয়টি রয়েছে। অর্থাৎ, যুক্তরাষ্ট্রের অনুমোদনে অস্ত্র সরবরাহের ব্যবস্থা হলেও এর অর্থনৈতিক দায়ভার বহন করবে ইউক্রেনের মিত্রদেশগুলো।
যুক্তরাষ্ট্রের অস্ত্র নির্মাতা প্রতিষ্ঠান লকহিড মার্টিন প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্র উৎপাদনের সঙ্গে যুক্ত। প্রতিষ্ঠানটির উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে। তবে বিশ্বজুড়ে এসব ক্ষেপণাস্ত্রের চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় উৎপাদন ও সরবরাহের ওপর চাপ তৈরি হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের নিজস্ব সামরিক মজুত এবং অন্যান্য মিত্রদেশের চাহিদাও এই সময়সীমাকে প্রভাবিত করছে।
প্যাট্রিয়ট যুক্তরাষ্ট্রের তৈরি অত্যাধুনিক ভূমি থেকে আকাশে নিক্ষেপযোগ্য প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা। এটি শত্রুপক্ষের বিমান, ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র এবং ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র শনাক্ত করে ধ্বংস করতে পারে। বিশেষ করে দ্রুতগতির ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করার ক্ষেত্রে এর গুরুত্ব অনেক বেশি। রাশিয়ার কাছে বিভিন্ন ধরনের দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র থাকায় ইউক্রেনের জন্য এই ব্যবস্থা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
তবে শুধু ক্ষেপণাস্ত্র পেলেই একটি দেশের আকাশ প্রতিরক্ষা সম্পূর্ণ কার্যকর হয়ে যায় না। এর সঙ্গে উন্নত রাডার, লক্ষ্য শনাক্তকরণ প্রযুক্তি, নিয়ন্ত্রণকেন্দ্র এবং প্রশিক্ষিত সামরিক সদস্য প্রয়োজন। এসব উপাদানের সমন্বয়েই প্যাট্রিয়ট ব্যবস্থা কার্যকরভাবে পরিচালিত হয়।
এদিকে রাশিয়ার হামলায় ইউক্রেনের বেসামরিক অবকাঠামো ও গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঘটনা অব্যাহত রয়েছে। বিদ্যুৎ ও জ্বালানি অবকাঠামোর ওপর হামলা দেশটির সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায়ও প্রভাব ফেলছে। শীত মৌসুম সামনে রেখে এসব স্থাপনা রক্ষার প্রয়োজনীয়তা আরও বেড়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, ৫০০টি প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্র বিক্রির অনুমোদন ইউক্রেনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ সামরিক ও কূটনৈতিক অগ্রগতি। তবে এই সিদ্ধান্তের প্রকৃত সুফল নির্ভর করবে ক্ষেপণাস্ত্রগুলো কখন দেশটির হাতে পৌঁছায় তার ওপর। কারণ যুদ্ধের ময়দানে প্রতিরক্ষার প্রয়োজন তাৎক্ষণিক, অথচ নতুন অস্ত্র উৎপাদন ও সরবরাহে কয়েক বছর সময় লাগতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রের এই অনুমোদন ইউক্রেনের আকাশ প্রতিরক্ষা শক্তিশালী করার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হলেও তাৎক্ষণিক নিরাপত্তার নিশ্চয়তা দিচ্ছে না। জেলেনস্কির সামনে এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো মিত্রদেশগুলোর বর্তমান মজুত থেকে দ্রুত ক্ষেপণাস্ত্র সংগ্রহ করা এবং ভবিষ্যতের সরবরাহের অপেক্ষার সময় কমিয়ে আনা। কারণ কয়েক বছর পরের প্রতিরক্ষা পরিকল্পনার পাশাপাশি আজকের আকাশসীমা রক্ষা করাও ইউক্রেনের জন্য সমান জরুরি।






মন্তব্য ০
লগইন করুন অথবা বিনা মূল্যে অ্যাকাউন্ট খুলুন আলোচনায় যোগ দিতে। নাম গোপন রেখেও মন্তব্য করতে পারবেন।
এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি করুন।