যুক্তরাষ্ট্রে পাসপোর্টের নামে প্রতারণা, সরকারি পরিচয়ে বিজ্ঞাপন দিয়ে গ্রাহকের তথ্য হাতানোর অভিযোগ
গুগলে পাসপোর্ট নবায়নের খোঁজ করলেই সামনে আসতে পারে ভুয়া সরকারি ওয়েবসাইট! এমন প্রতারণার অভিযোগে কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে মামলা করেছে ফেডারেল বাণিজ্য কমিশন।
যুক্তরাষ্ট্রে পাসপোর্টের আবেদন ও নবায়ন করতে গিয়ে সাধারণ মানুষকে প্রতারণার ফাঁদে ফেলার অভিযোগে কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে মামলা করেছে দেশটির ফেডারেল বাণিজ্য কমিশন। সরকারি দপ্তরের সঙ্গে সম্পর্ক রয়েছে এমন ধারণা তৈরি করে অনলাইন বিজ্ঞাপন ও ওয়েবসাইটের মাধ্যমে গ্রাহকদের কাছ থেকে অর্থ ও ব্যক্তিগত তথ্য নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে প্রতিষ্ঠানগুলোর বিরুদ্ধে।
ফেডারেল বাণিজ্য কমিশনের ২০২৬ সালের ২৯ অক্টোবর প্রকাশিত বিবৃতি অনুযায়ী, গভঅ্যাসিস্ট এলএলসি, এন্ট্রি এলএলসি এবং প্রতিষ্ঠান দুটির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট স্কট জাকারম্যানের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। অভিযোগে বলা হয়েছে, প্রতিষ্ঠানগুলো গুগলের অর্থের বিনিময়ে প্রদর্শিত বিজ্ঞাপন ব্যবহার করে এমনভাবে নিজেদের ওয়েবসাইট প্রচার করত, যাতে পাসপোর্টের জন্য আবেদন বা নবায়ন করতে চাওয়া মানুষ সেগুলোকে সরকারি ওয়েবসাইট অথবা সরকারের অনুমোদিত সেবা বলে মনে করতে পারেন।
কমিশনের অভিযোগ অনুযায়ী, ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে গভঅ্যাসিস্ট ডটকম, এন্ট্রি ডটকম এবং আইভিএস ডট ইউএসসহ বিভিন্ন ওয়েবসাইটের মাধ্যমে এ ধরনের সেবা প্রচার করা হয়েছে। কেউ যখন ‘নতুন পাসপোর্টের আবেদন’, ‘পাসপোর্ট নবায়ন’ কিংবা ‘অনলাইনে পাসপোর্ট আবেদন’ লিখে গুগলে খোঁজ করতেন, তখন এসব প্রতিষ্ঠানের বিজ্ঞাপন কখনো কখনো ফলাফলের ওপরের দিকে দেখা যেত। ফলে ব্যবহারকারীরা প্রকৃত সরকারি সেবার বদলে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের ওয়েবসাইটে প্রবেশ করতে পারতেন।
মামলার অভিযোগে আরও বলা হয়েছে, প্রতিষ্ঠানগুলো নিজেদের এমনভাবে উপস্থাপন করত, যেন তারা যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তরের সঙ্গে যুক্ত অথবা সরকারি অনুমোদনপ্রাপ্ত সেবা প্রদানকারী। কিন্তু ফেডারেল বাণিজ্য কমিশনের দাবি, প্রতিষ্ঠানগুলোর এমন কোনো সরকারি অনুমোদন ছিল না। সরকারি সেবার সঙ্গে সম্পর্ক থাকার ভুল ধারণা তৈরি করে গ্রাহকদের কাছ থেকে অর্থ ও ব্যক্তিগত তথ্য নেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ করা হয়েছে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অভিযোগগুলোর একটি হলো, পাসপোর্ট সরাসরি ইস্যু করার সক্ষমতা রয়েছে—এমন প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল। অথচ যুক্তরাষ্ট্রের পাসপোর্ট ইস্যু করার দায়িত্ব পররাষ্ট্র দপ্তরের। বেসরকারি কোনো প্রতিষ্ঠান নিজে মার্কিন পাসপোর্ট ইস্যু করতে পারে না। কমিশনের দাবি, অনেক গ্রাহক অর্থ দেওয়ার পর এমন একটি আবেদনপত্র পেয়েছেন, যা তাঁরা সরকারি ওয়েবসাইট থেকেই বিনা মূল্যে সংগ্রহ করতে পারতেন।
মূল্য নির্ধারণ নিয়েও প্রতারণার অভিযোগ তুলেছে কমিশন। প্রতিষ্ঠানগুলোর বিজ্ঞাপনে সেবার মূল্য ৮৯ ডলার থেকে শুরু বলে উল্লেখ করা হলেও কমিশনের অভিযোগ, সর্বনিম্ন মূল্য ছিল ১১৯ ডলার। এর সঙ্গে ২৯ ডলার পরিবহন খরচ যোগ করে মোট ১৪৮ ডলার দিতে হতো। পাশাপাশি সরকারি পাসপোর্ট ফি আলাদাভাবে পরিশোধ করতে হতো। ফলে বিজ্ঞাপনে দেখানো মূল্যের বাইরে গ্রাহকদের অতিরিক্ত অর্থ ব্যয় করার পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।
দ্রুত পাসপোর্ট পাওয়ার প্রতিশ্রুতিও মামলার একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। কমিশনের অভিযোগ, প্রতিষ্ঠানগুলো অতিরিক্ত অর্থের বিনিময়ে ৬ থেকে ১০ কর্মদিবস কিংবা ৩ থেকে ৪ কর্মদিবসের মধ্যে দ্রুত সেবা দেওয়ার দাবি করত। কিন্তু কমিশনের বক্তব্য, এসব সময়সীমা যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তরের দ্রুত পাসপোর্ট সেবার বাস্তব সক্ষমতার চেয়েও দ্রুত বলে প্রচার করা হয়েছিল এবং প্রতিশ্রুতিগুলো বিভ্রান্তিকর ছিল।
গ্রাহকদের আস্থা অর্জনের জন্য ভুয়া ইতিবাচক পর্যালোচনা ব্যবহারের অভিযোগও রয়েছে। কমিশনের দাবি, ওয়েবসাইটগুলোতে বিভিন্ন গ্রাহক পর্যালোচনা ও উচ্চ মূল্যায়নের কথা তুলে ধরে প্রতিষ্ঠানগুলোর সেবাকে নির্ভরযোগ্য হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছিল। কিন্তু এসব ইতিবাচক পর্যালোচনার একটি বড় অংশ ভুয়া ছিল বলে অভিযোগে বলা হয়েছে।
ফেডারেল বাণিজ্য কমিশন জানিয়েছে, প্রতিষ্ঠানগুলোর বিরুদ্ধে সরকারি পরিচয় নকল, বিভ্রান্তিকর বিজ্ঞাপন এবং গ্রাহকের আর্থিক ও ব্যক্তিগত তথ্যের অপব্যবহারের অভিযোগ আনা হয়েছে। মামলাটি পুয়ের্তো রিকোর ফেডারেল জেলা আদালতে দায়ের করা হয়েছে। তবে মনে রাখতে হবে, এটি এখনো অভিযোগের ভিত্তিতে দায়ের করা মামলা; আদালতের চূড়ান্ত রায়ে অভিযুক্তদের দায় প্রমাণিত হয়েছে—এমন নয়।
যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসরত বাংলাদেশি অভিবাসী, নতুন নাগরিক, শিক্ষার্থী এবং নিয়মিত আন্তর্জাতিক ভ্রমণকারীদের জন্য ঘটনাটি গুরুত্বপূর্ণ। ইংরেজিতে দুর্বলতা, সরকারি প্রক্রিয়া সম্পর্কে সীমিত ধারণা কিংবা দ্রুত পাসপোর্ট পাওয়ার প্রয়োজনএসব কারণে কেউ কেউ বেসরকারি ওয়েবসাইটের বিজ্ঞাপনকে সরকারি সেবা ভেবে ভুল করতে পারেন। বিশেষ করে পাসপোর্ট নবায়ন বা জরুরি ভ্রমণের সময় এ ধরনের প্রতারণার ঝুঁকি বাড়তে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রের সরকারি পাসপোর্ট সেবার জন্য পররাষ্ট্র দপ্তরের নির্ধারিত ওয়েবসাইট ব্যবহার করা উচিত। পাসপোর্টের অ্যাপয়েন্টমেন্ট নিতে সরকারি কর্তৃপক্ষ কোনো তৃতীয় পক্ষকে অর্থ দিয়ে অ্যাপয়েন্টমেন্ট বুক করার অনুমোদন দেয় না। কেউ অ্যাপয়েন্টমেন্ট নিশ্চিত করার নামে টাকা চাইলে সেটিকে সম্ভাব্য প্রতারণা হিসেবে বিবেচনা করা উচিত। সরকারি ওয়েবসাইটের ঠিকানা ও সেবার নিয়ম যাচাই না করে পাসপোর্ট নম্বর, জন্মতারিখ, পরিচয়পত্র, ব্যাংক বা কার্ডের তথ্য দেওয়া ঝুঁকিপূর্ণ।
কেউ যদি ইতিমধ্যে এমন কোনো ওয়েবসাইটে অর্থ দিয়ে থাকেন, তাহলে দ্রুত নিজের ব্যাংক বা কার্ড প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যোগাযোগ করা, লেনদেনের তথ্য সংরক্ষণ করা এবং ফেডারেল বাণিজ্য কমিশনের কাছে অভিযোগ জানানোর পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। প্রয়োজন হলে স্থানীয় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থার সঙ্গেও যোগাযোগ করা যেতে পারে।






মন্তব্য ০
লগইন করুন অথবা বিনা মূল্যে অ্যাকাউন্ট খুলুন আলোচনায় যোগ দিতে। নাম গোপন রেখেও মন্তব্য করতে পারবেন।
এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি করুন।