রাশিয়ার কারাগার থেকে মুক্ত মার্কিনির সঙ্গে ট্রাম্পের বৈঠক, আরও ৮ জনকে ফেরানোর প্রতিশ্রুতি
৮,৬৪৭ বার পড়া হয়েছে ৬ মিনিটে পড়ুন
রাশিয়ার কারাগার থেকে মুক্তি পাওয়া মার্কিন নাগরিক স্টিফেন হাবার্ডের সঙ্গে হোয়াইট হাউসে বৈঠক করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। শুক্রবার, ৩০ অক্টোবর ২০২৬, অনুষ্ঠিত এই বৈঠকে রাশিয়ায় এখনো আটক থাকা অন্য মার্কিন নাগরিকদের দেশে ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ নেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন তিনি। ট্রাম্প জানিয়েছেন, রাশিয়ার হেফাজতে এখনো আটজন পর্যন্ত মার্কিন নাগরিক থাকতে পারেন। তাঁদের মুক্তির জন্যও তাঁর প্রশাসন কাজ করবে। হাবার্ডের মুক্তিকে কেন্দ্র করে যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়ার সম্পর্কের মধ্যে নতুন করে কূটনৈতিক আলোচনার বিষয়টি সামনে এসেছে। বিশেষ করে দীর্ঘদিন ধরে রাশিয়ার কারাগারে আটক থাকা মার্কিন নাগরিকদের মুক্তি, তাঁদের পরিবারের উদ্বেগ এবং দুই দেশের মধ্যকার রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক সম্পর্ক নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। হোয়াইট হাউসে সাংবাদিকদের সামনে ট্রাম্প বলেন, রাশিয়ায় আটক অন্য মার্কিনিদের মুক্তির বিষয়েও তাঁরা কাজ করবেন। এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘আমরা তাঁদের জন্য কাজ করব।’ তাঁর বক্তব্যে স্পষ্ট হয়েছে, হাবার্ডের মুক্তির পরও রাশিয়ার কারাগারে থাকা অন্য মার্কিন নাগরিকদের দেশে ফিরিয়ে আনার বিষয়টি তাঁর প্রশাসনের আলোচনায় রয়েছে। মুক্তি পাওয়ার পর হাবার্ডের সঙ্গে সরাসরি সাক্ষাৎ করে ট্রাম্প তাঁর অভিজ্ঞতার কথাও শোনেন। রাশিয়ার কারাগারে দীর্ঘ সময় কাটানোর পর যুক্তরাষ্ট্রে ফিরে আসা হাবার্ড জানান, এর আগে একাধিকবার তাঁকে মুক্তি দেওয়ার কথা বলা হয়েছিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সত্যিই কারাগার থেকে বের হতে পারবেন কি না, তা নিয়ে তাঁর মনে সন্দেহ ছিল। হাবার্ডের ভাষ্য অনুযায়ী, কারাগার থেকে বের হওয়ার আগে তাঁকে নতুন পোশাক দেওয়া হয় এবং একটি গাড়ির দিকে নিয়ে যাওয়া হয়। তখনই তিনি প্রথমবারের মতো বিশ্বাস করতে শুরু করেন যে সত্যিই তাঁকে মুক্তি দেওয়া হচ্ছে। এর আগে শুধু মুক্তির আশ্বাস শুনে তিনি নিশ্চিত হতে পারেননি। বৈঠকে ট্রাম্পের কাছে নিজের কারাবাসের অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন হাবার্ড। দীর্ঘদিনের বন্দিজীবন শেষে দেশে ফিরতে পারাকে তাঁর জন্য গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত হিসেবে দেখা হচ্ছে। তাঁর মুক্তির ঘটনায় পরিবারের সদস্যদের মধ্যেও স্বস্তি ফিরে এসেছে। মার্কিন সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, হাবার্ডের বয়স ৭৪ বছর। তিনি যুক্তরাষ্ট্রের মিশিগান অঙ্গরাজ্যের বাসিন্দা এবং পেশায় একজন অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক। ২০২২ সালে ইউক্রেনে রাশিয়ার পূর্ণমাত্রার সামরিক অভিযান শুরুর পর তিনি রাশিয়ার বাহিনীর নিয়ন্ত্রণে চলে যাওয়া এলাকায় আটক হন। পরে তাঁর বিরুদ্ধে ইউক্রেনের পক্ষে ভাড়াটে যোদ্ধা হিসেবে লড়াই করার অভিযোগ আনে রাশিয়া। রুশ কর্তৃপক্ষের অভিযোগ ছিল, হাবার্ড ইউক্রেনের সামরিক বাহিনীর সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ হয়ে রুশ বাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধে অংশ নিয়েছিলেন। তবে তাঁর পরিবার ও আইনজীবীরা এই অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তাঁদের বক্তব্য ছিল, হাবার্ডকে নিয়ে রাশিয়ার অভিযোগের যথার্থতা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন রয়েছে। ২০২৪ সালে রাশিয়ার একটি আদালত তাঁকে প্রায় সাত বছরের কারাদণ্ড দেন। বিচারপ্রক্রিয়াটি রুদ্ধদ্বার হওয়ায় তাঁর মামলার বিস্তারিত তথ্যও সাধারণ মানুষের কাছে পুরোপুরি প্রকাশিত হয়নি। যুক্তরাষ্ট্রের তৎকালীন প্রশাসন তাঁকে অন্যায়ভাবে আটক মার্কিন নাগরিক হিসেবে আনুষ্ঠানিকভাবে চিহ্নিত করেছিল। চার বছরের বেশি সময় ধরে রাশিয়ার কারাগারে থাকার পর অবশেষে ২১ অক্টোবর ২০২৬ তাঁর মুক্তির খবর প্রকাশ্যে আসে। রাশিয়ার সেন্ট পিটার্সবার্গে যুক্তরাষ্ট্রের বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফের সঙ্গে রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের বৈঠকের সময় হাবার্ডের মুক্তির বিষয়টি সামনে আসে। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প দাবি করেন, তিনি সরাসরি পুতিনের কাছে হাবার্ডের মুক্তির অনুরোধ জানিয়েছিলেন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, দুই নেতার মধ্যে টেলিফোনে কথা হওয়ার পর পুতিন হাবার্ডকে মুক্তি দিতে সম্মত হন। ট্রাম্প আরও দাবি করেন, এই মুক্তির জন্য যুক্তরাষ্ট্রকে কোনো বন্দিবিনিময় করতে হয়নি। তবে রাশিয়ার পক্ষ থেকে জানানো হয়, মানবিক বিবেচনায় পুতিন হাবার্ডকে ক্ষমা করেছেন। ফলে তাঁর মুক্তির পেছনে দুই দেশের কূটনৈতিক যোগাযোগের ভূমিকা থাকলেও ঘটনাটির ব্যাখ্যায় ওয়াশিংটন ও মস্কোর বক্তব্যের মধ্যে কিছু পার্থক্য রয়েছে। হাবার্ডের মুক্তির পর যুক্তরাষ্ট্রের মাটিতে ফিরে আসার বিষয়টিও নিশ্চিত করা হয়। ২২ অক্টোবর প্রকাশিত সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়, তিনি যুক্তরাষ্ট্রে পৌঁছেছেন এবং তাঁর শারীরিক অবস্থা পরীক্ষা করার ব্যবস্থা করা হয়েছে। দীর্ঘদিন কারাগারে থাকার কারণে তাঁর স্বাস্থ্য নিয়ে উদ্বেগ ছিল। হাবার্ডের মুক্তির ঘটনাটি আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে কারণ রাশিয়ায় এখনো একাধিক মার্কিন নাগরিক আটক রয়েছেন। ট্রাম্পের বক্তব্য অনুযায়ী, তাঁদের সংখ্যা আটজন পর্যন্ত হতে পারে। তিনি তাঁদের মুক্তির বিষয়েও কাজ করার আশ্বাস দিয়েছেন। তবে আটকের সংখ্যার বিষয়ে বিভিন্ন প্রতিবেদনে কিছু পার্থক্য রয়েছে। এবিসি নিউজের ২০ অক্টোবরের প্রতিবেদনে অন্তত আটজন মার্কিন নাগরিকের পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়া—দুই দেশের নাগরিকত্ব থাকা আরও দুজনের আটক থাকার কথা বলা হয়েছিল। অন্যদিকে সিবিএস নিউজের ২২ অক্টোবরের প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, দ্বৈত নাগরিকত্বধারীদেরসহ আরও কয়েকজন মার্কিন নাগরিক রাশিয়ার হেফাজতে রয়েছেন। তাই আটজনের সংখ্যাটিকে চূড়ান্ত সরকারি তালিকা হিসেবে বিবেচনা করা ঠিক হবে না। আটক ব্যক্তিদের মধ্যে গর্ডন ব্ল্যাক, মাইকেল লিক, রবার্ট উডল্যান্ড, ডেভিড বার্নস, ড্যানিয়েল স্নাইডার, আন্দ্রে খাচাতোরিয়ান ও চাক জিমারম্যানের নাম বিভিন্ন প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। এ ছাড়া দ্বৈত নাগরিকত্বধারী আলেকজান্ডার আন্তোনভ ও ইউজিন স্পেক্টরের নামও আলোচনায় এসেছে। তাঁদের প্রত্যেকের বিরুদ্ধে অভিযোগ, মামলার অবস্থা এবং আটকের পরিস্থিতি এক নয়। এর আগে ২০২৪ সালের ১ আগস্ট যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়ার মধ্যে বড় ধরনের বন্দিবিনিময় হয়েছিল। ওই বিনিময়ের মাধ্যমে রাশিয়ার কারাগার থেকে বেশ কয়েকজন মার্কিন নাগরিক ও পশ্চিমা দেশের বন্দি মুক্তি পেয়েছিলেন। তাঁদের মধ্যে ছিলেন মার্কিন সাংবাদিক ইভান গার্শকোভিচ এবং সাবেক মার্কিন মেরিন পল হুইলান। বিনিময়ের অংশ হিসেবে রাশিয়ার হাতে থাকা ব্যক্তিদের পরিবর্তে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্র দেশগুলো রাশিয়ার বন্দিদের মুক্তি দিয়েছিল। তবে ওই বন্দিবিনিময়ের পরও রাশিয়ায় আটক কিছু মার্কিন নাগরিকের পরিবার অভিযোগ করে আসছে, তাঁদের স্বজনদের মুক্তির জন্য যথেষ্ট উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে না। বিশেষ করে মাইকেল লিকের পরিবারের পক্ষ থেকে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিওর কাছে তাঁকে অন্যায়ভাবে আটক হিসেবে চিহ্নিত করার দাবি জানানো হয়েছিল বলে এবিসি নিউজের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। হাবার্ডের মুক্তির আগে যুক্তরাষ্ট্রের বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ রাশিয়ার সেন্ট পিটার্সবার্গে পুতিনের সঙ্গে বৈঠক করেন। ওই বৈঠকেই হাবার্ডের মুক্তির বিষয়টি সামনে আসে। উইটকফ তাঁর মুক্তিতে সহযোগিতার জন্য পুতিনকে ধন্যবাদ জানান। তবে রুশ প্রেসিডেন্টের প্রশংসা করতে গিয়ে তাঁকে মানবিক ব্যক্তি হিসেবে অভিহিত করায় যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক অঙ্গনে সমালোচনাও তৈরি হয়। হাবার্ডের মুক্তি নিয়ে ট্রাম্প প্রশাসনের বক্তব্যের পাশাপাশি কূটনৈতিক সমঝোতার প্রকৃত শর্ত নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। ট্রাম্পের দাবি, কোনো বন্দিবিনিময় ছাড়াই তাঁকে মুক্ত করা হয়েছে। কিন্তু রাশিয়া ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার বৃহত্তর রাজনৈতিক সম্পর্ক, নিষেধাজ্ঞা এবং ইউক্রেন যুদ্ধ নিয়ে চলমান আলোচনার প্রেক্ষাপটে বিষয়টি আরও বিস্তৃত কূটনৈতিক পরিস্থিতির সঙ্গে সম্পর্কিত কি না, তা নিয়ে বিশ্লেষকদের আগ্রহ রয়েছে। বিশেষ করে ইউক্রেন যুদ্ধ চলমান থাকা অবস্থায় রাশিয়ার কারাগার থেকে একজন মার্কিন নাগরিকের মুক্তি দুই দেশের যোগাযোগের ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। তবে একজন বন্দির মুক্তি দিয়ে দুই দেশের সম্পর্কের সব জটিলতা দূর হয়ে গেছে, এমনটা মনে করার সুযোগ নেই। হোয়াইট হাউসে হাবার্ডের সঙ্গে ট্রাম্পের এই বৈঠক তাই শুধু একজন মুক্তিপ্রাপ্ত নাগরিককে স্বাগত জানানোর ঘটনা নয়; বরং রাশিয়ায় আটক অন্য মার্কিনিদের মুক্তির বিষয়ে নতুন করে রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতিরও ইঙ্গিত দিচ্ছে। এখন মূল নজর থাকবে ট্রাম্প প্রশাসন কীভাবে বাকি আটক ব্যক্তিদের মুক্তির জন্য রাশিয়ার সঙ্গে আলোচনা এগিয়ে নেয় এবং তাঁদের পরিবারের দীর্ঘদিনের অপেক্ষার অবসান ঘটাতে পারে কি না। ট্রাম্প প্রতিশ্রুতি দিলেও কবে নাগাদ অন্য বন্দিরা মুক্তি পাবেন, সে বিষয়ে এখনো নির্দিষ্ট কোনো সময়সীমা ঘোষণা করা হয়নি।
মন্তব্য ০
লগইন করুন অথবা বিনা মূল্যে অ্যাকাউন্ট খুলুন আলোচনায় যোগ দিতে। নাম গোপন রেখেও মন্তব্য করতে পারবেন।
এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি করুন।