ফ্লোরিডায় মানবপাচারবিরোধী অভিযানে ২৮১ গ্রেপ্তার, তালিকায় সরকারি কর্মীও
ফ্লোরিডায় সাত দিনের বিশেষ অভিযানে ২৮১ জন গ্রেপ্তার। তাঁদের মধ্যে ডিজনি ও ইউনিভার্সালের ১৭ কর্মী, একজন শেরিফ ডেপুটি ও নৌবাহিনীর সদস্য রয়েছেন।
যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডা অঙ্গরাজ্যে মানবপাচার, যৌন বাণিজ্য এবং শিশুদের যৌন শোষণ প্রতিরোধে পরিচালিত বিশেষ অভিযানে ২৮১ জনকে গ্রেপ্তার করেছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। সাত দিন ধরে চলা এই অভিযানে জনপ্রিয় বিনোদনকেন্দ্র ওয়াল্ট ডিজনি ওয়ার্ল্ড এবং ইউনিভার্সাল স্টুডিওর ১৭ কর্মীর গ্রেপ্তারের খবর বিশেষভাবে আলোচনায় এসেছে।
‘পোল্ক অ্যারাউন্ড অ্যান্ড ফাইন্ড আউট–২’ নামের এই যৌথ অভিযান পরিচালিত হয় ফ্লোরিডার পোল্ক কাউন্টিতে। ২০২৬ সালের ৩০ অক্টোবর শুক্রবার পোল্ক কাউন্টি শেরিফের কার্যালয় অভিযানের ফলাফল প্রকাশ করে।
কর্তৃপক্ষের প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, গ্রেপ্তার হওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে ডিজনি ওয়ার্ল্ডের ১৩ জন এবং ইউনিভার্সাল স্টুডিওর চারজন কর্মী রয়েছেন। তাঁদের মধ্যে সাতজনের বিরুদ্ধে শিশুদের যৌন শোষণসংক্রান্ত অভিযোগ আনা হয়েছে। তবে সব কর্মীর বিরুদ্ধে একই ধরনের অভিযোগ রয়েছে, এমন নয়।
অভিযানে অরেঞ্জ কাউন্টির একজন শেরিফ ডেপুটি এবং যুক্তরাষ্ট্রের নৌবাহিনীর একজন সক্রিয় সদস্যও গ্রেপ্তার হয়েছেন। তাঁদের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগের বিষয়েও তদন্ত চলছে।
শেরিফের কার্যালয়ের প্রকাশিত হিসাব অনুযায়ী, অভিযানে ২৩৯টি গ্রেপ্তার যৌন বাণিজ্যসংক্রান্ত অপরাধের সঙ্গে যুক্ত। এ ছাড়া ৩১ জনকে শিশুদের যৌন শোষণের উদ্দেশ্যে যোগাযোগ ও সাক্ষাতের চেষ্টার অভিযোগে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। বাকি ১১ জনের বিরুদ্ধে অন্যান্য অভিযোগ রয়েছে।
অভিযানে মোট ৪৮৮টি নতুন ফৌজদারি অভিযোগ আনা হয়েছে। এর মধ্যে ১৯৮টি গুরুতর অপরাধ এবং ২৯০টি অপেক্ষাকৃত কম গুরুতর অপরাধের অভিযোগ।
কর্তৃপক্ষের ভাষ্য অনুযায়ী, তদন্তকারীরা অনলাইনে গোপন পরিচয়ে যোগাযোগ করে শিশুদের যৌন শোষণের উদ্দেশ্যে আগ্রহী ব্যক্তিদের শনাক্ত করেন। অভিযুক্তদের কেউ কেউ নির্ধারিত স্থানে সাক্ষাৎ করতে এসে গ্রেপ্তার হন।
অভিযানের আলোচিত ঘটনাগুলোর মধ্যে রয়েছে ডিজনি ওয়ার্ল্ডে আগে মিকি মাউস চরিত্রে অভিনয় করা ২৪ বছর বয়সী কলিন ক্লাকোর গ্রেপ্তার।
তদন্তকারীদের অভিযোগ, তিনি অনলাইনে ১৩ বছর বয়সী এক ছেলের অভিভাবক পরিচয়ে থাকা গোপন তদন্তকারীর সঙ্গে যোগাযোগ করেন। পরে সাক্ষাতের উদ্দেশ্যে নির্ধারিত স্থানে গেলে তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়।
পুলিশের অভিযোগ অনুযায়ী, তাঁর সঙ্গে দুটি ব্যাগে শিশুর ডায়াপার পাওয়া যায়। তাঁর বিরুদ্ধে অপ্রাপ্তবয়স্কের সঙ্গে সাক্ষাতের উদ্দেশ্যে ভ্রমণ, কম্পিউটার ব্যবহার করে অভিভাবকের সঙ্গে যৌন উদ্দেশ্যে যোগাযোগ এবং অপ্রাপ্তবয়স্কের বিরুদ্ধে যৌন অপরাধের চেষ্টাসহ একাধিক অভিযোগ আনা হয়েছে।
তবে তিনি গ্রেপ্তারের সময় ডিজনিতে কর্মরত ছিলেন না বলে তদন্তকারীদের জানিয়েছেন। আগে সেখানে মিকি মাউস চরিত্রে কাজ করেছিলেন বলে তাঁর বিরুদ্ধে প্রকাশিত তথ্য থেকে জানা যায়।
অভিযানে স্থানীয় যুব ফুটবল দলের একজন কোচও গ্রেপ্তার হয়েছেন। তদন্তকারীদের অভিযোগ, তিনি অনলাইনে ১৪ বছর বয়সী কিশোরী পরিচয়ে থাকা একজন গোপন তদন্তকারীর সঙ্গে যৌন ইঙ্গিতপূর্ণ বার্তা আদান-প্রদান করেন এবং সাক্ষাতের উদ্দেশ্যে সেখানে উপস্থিত হন।
এ ছাড়া নৌবাহিনীর একজন সক্রিয় সদস্যের বিরুদ্ধেও অপ্রাপ্তবয়স্কের সঙ্গে যৌন উদ্দেশ্যে সাক্ষাতের চেষ্টার অভিযোগ রয়েছে।
এসব ঘটনা শিশুদের অনলাইন নিরাপত্তা, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অপরিচিত ব্যক্তির সঙ্গে যোগাযোগ এবং অভিভাবকদের সচেতনতার বিষয়টি নতুন করে সামনে এনেছে।
অভিযানে শুধু গ্রেপ্তার নয়, মানবপাচারের শিকার ব্যক্তিদের শনাক্ত করার বিষয়টিও গুরুত্ব পেয়েছে।
কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, যৌন বাণিজ্যসংক্রান্ত অভিযোগে আটক ১২২ জনকে মানবপাচার বা জোরপূর্বক যৌন কাজে বাধ্য করার শিকার কি না, তা যাচাই করতে মূল্যায়ন করা হয়।
এই প্রক্রিয়ায় ১১ জনকে মানবপাচারের শিকার হিসেবে শনাক্ত করা হয়েছে। তাঁদের প্রয়োজনীয় সামাজিক ও মানবিক সহায়তা দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
এ ছাড়া মানবপাচারবিরোধী একটি অলাভজনক সংস্থার সহায়তায় আরও অনেকের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়, যাতে তাঁরা প্রয়োজনীয় সহায়তা নিতে পারেন।
পোল্ক কাউন্টি শেরিফের কার্যালয়ের নেতৃত্বে পরিচালিত এই অভিযানে বিভিন্ন স্থানীয় ও কেন্দ্রীয় আইন প্রয়োগকারী সংস্থা অংশ নেয়। ফ্লোরিডার অ্যাটর্নি জেনারেলের কার্যালয়ও অভিযানে সহযোগিতা করে।
শেরিফ গ্র্যাডি জাডের ভাষ্য অনুযায়ী, এটি তাঁর কার্যালয়ের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় গোপন অভিযান। অভিযানের মাধ্যমে শিশুদের যৌন শোষণ এবং মানবপাচারের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্ত করাই ছিল প্রধান লক্ষ্য।
ফ্লোরিডার অ্যাটর্নি জেনারেল জেমস উথমায়ার জানিয়েছেন, অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে মামলাগুলো গুরুত্বের সঙ্গে পরিচালনা করা হবে এবং প্রয়োজন অনুযায়ী কঠোর শাস্তির আবেদন করা হবে।
যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসরত বাংলাদেশি পরিবারগুলোর জন্য ঘটনাটি কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় সামনে এনেছে। বিশেষ করে শিশুদের অনলাইন নিরাপত্তা, অপরিচিত ব্যক্তির সঙ্গে যোগাযোগ এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারের ক্ষেত্রে অভিভাবকদের সচেতন থাকা প্রয়োজন।
শিশুদের সঙ্গে অনলাইনে কে যোগাযোগ করছে, তারা কোথায় যাচ্ছে এবং কোনো অপরিচিত ব্যক্তি ব্যক্তিগত তথ্য বা ছবি চাইছে কি না—এসব বিষয়ে অভিভাবকদের সতর্ক থাকা জরুরি।






মন্তব্য ০
লগইন করুন অথবা বিনা মূল্যে অ্যাকাউন্ট খুলুন আলোচনায় যোগ দিতে। নাম গোপন রেখেও মন্তব্য করতে পারবেন।
এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি করুন।