মূল্যস্ফীতির চাপে সুদের হার নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তের পথে যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় ব্যাংক
যুক্তরাষ্ট্রে নিত্যপণ্যের দাম বাড়ায় সুদের হার নিয়ে বৈঠকে বসেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। সিদ্ধান্তের প্রভাব পড়তে পারে ঋণ, বাড়ি কেনা ও সাধারণ মানুষের খরচে।
যুক্তরাষ্ট্রে মূল্যস্ফীতির চাপ বাড়তে থাকায় সুদের হার নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিতে বৈঠকে বসেছে দেশটির কেন্দ্রীয় ব্যাংক ফেডারেল রিজার্ভ। বুধবার, ২৮ অক্টোবরের এই বৈঠকের সিদ্ধান্তের দিকে তাকিয়ে রয়েছেন বিনিয়োগকারী, ব্যবসায়ী, বাড়ি কিনতে আগ্রহী মানুষ এবং ঋণগ্রহীতারা। বাজার বিশ্লেষকদের ধারণা, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে রাখার চাপ থাকলেও আপাতত সুদের হার অপরিবর্তিত রাখতে পারে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। তবে আনুষ্ঠানিক ঘোষণা না আসা পর্যন্ত সিদ্ধান্তটি নিশ্চিত নয়।
গত সেপ্টেম্বরে ফেড তিন বছরের মধ্যে প্রথমবার সুদের হার বাড়িয়েছিল। তখন প্রতি ১০০ ভিত্তি পয়েন্টের এক-চতুর্থাংশের সমান বৃদ্ধি করে নীতিগত সুদের হার ৩ দশমিক ৭৫ থেকে ৪ শতাংশের মধ্যে নির্ধারণ করা হয়। মূল্যস্ফীতি দীর্ঘদিন ধরে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রার ওপরে থাকায় এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছিল। এবারও মূল্যবৃদ্ধি নিয়ন্ত্রণে রাখার প্রয়োজনীয়তা এবং অর্থনীতির গতি বজায় রাখার মধ্যে ভারসাম্য খুঁজতে হচ্ছে নীতিনির্ধারকদের।
যুক্তরাষ্ট্রের শ্রম পরিসংখ্যান ব্যুরোর প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বরে দেশটির ভোক্তা মূল্যসূচক আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ৩ দশমিক ৭ শতাংশ বেড়েছে। আগস্টে এই হার ছিল ৩ দশমিক ৪ শতাংশ। অর্থাৎ মূল্যস্ফীতির চাপ কমার বদলে আরও বেড়েছে। ফেডের দীর্ঘমেয়াদি মূল্যস্ফীতির লক্ষ্যমাত্রা ২ শতাংশ। বর্তমান হার সেই লক্ষ্যমাত্রার উল্লেখযোগ্য ওপরে থাকায় সুদের হার কমানোর সুযোগ সীমিত হয়ে পড়েছে।
জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি বর্তমান পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে। মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত এবং হরমুজ প্রণালি ঘিরে অনিশ্চয়তার কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বেড়েছে। জ্বালানি ব্যয় বাড়লে পরিবহন, কৃষি, পণ্য উৎপাদন ও সরবরাহের খরচও বেড়ে যায়। ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলো এসব অতিরিক্ত ব্যয়ের একটি অংশ পণ্যের দামের সঙ্গে যুক্ত করলে সাধারণ ক্রেতাদের ওপর চাপ আরও বাড়তে পারে। এ ছাড়া আমদানি শুল্কের প্রভাব এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা খাতে বিপুল বিনিয়োগের কারণে সৃষ্ট চাহিদাও মূল্যস্ফীতির ওপর চাপ তৈরি করছে বলে অর্থনৈতিক বিশ্লেষকেরা মনে করছেন।
সুদের হার অপরিবর্তিত রাখলে ঋণগ্রহীতারা তাৎক্ষণিকভাবে নতুন কোনো সুদবৃদ্ধির মুখে পড়বেন না। তবে এর অর্থ এই নয় যে ঋণ নেওয়ার খরচ কমে যাবে। বাড়ি কেনার বন্ধকী ঋণ, গাড়ির ঋণ এবং ক্রেডিট কার্ডের সুদ বিভিন্ন বাজার পরিস্থিতি ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের শর্তের ওপর নির্ভর করে। ফলে ফেড সুদের হার স্থির রাখলেও সাধারণ মানুষের ঋণের খরচ উচ্চ পর্যায়ে থেকে যেতে পারে।
অন্যদিকে সুদের হার বাড়ানো হলে ঋণ নেওয়া আরও ব্যয়বহুল হতে পারে। এতে মানুষ বড় কেনাকাটা ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান নতুন বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত পিছিয়ে দিতে পারে। অর্থনীতিতে চাহিদা কমলে সময়ের সঙ্গে মূল্যবৃদ্ধির গতি কমতে পারে। তবে অতিরিক্ত কড়াকড়ি কর্মসংস্থান ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। তাই কেন্দ্রীয় ব্যাংককে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি শ্রমবাজারের অবস্থাও বিবেচনায় রাখতে হচ্ছে।
যুক্তরাষ্ট্রের শ্রমবাজারেও কিছু দুর্বলতার লক্ষণ দেখা যাচ্ছে। সেপ্টেম্বরে দেশটিতে নতুন কর্মসংস্থান বৃদ্ধির হার প্রত্যাশার তুলনায় কম ছিল এবং বেকারত্বের হার বেড়ে ৪ দশমিক ২ শতাংশে পৌঁছায়। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি মোটামুটি স্থিতিশীল থাকলেও নিয়োগের গতি দুর্বল হলে সুদের হার আরও বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়ে সতর্ক থাকতে হয়। কারণ বেশি সুদের কারণে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের ব্যয় বেড়ে গেলে নতুন কর্মী নিয়োগ কমে যাওয়ার ঝুঁকি থাকে।
এই বৈঠকের রাজনৈতিক গুরুত্বও রয়েছে। আগামী ৩ নভেম্বর যুক্তরাষ্ট্রে মধ্যবর্তী নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। জীবনযাত্রার ব্যয়, জ্বালানির দাম এবং অর্থনৈতিক পরিস্থিতি নির্বাচনে ভোটারদের সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করতে পারে। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এর আগে সুদের হার কমানোর পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন এবং ফেডের সুদের নীতির সমালোচনা করেছেন। তবে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে মূল্যস্থিতি ও কর্মসংস্থানের মতো অর্থনৈতিক লক্ষ্য বিবেচনা করার কথা। রাজনৈতিক চাপের বাইরে থেকে সিদ্ধান্ত নেওয়া ফেডের স্বাধীনতার জন্যও গুরুত্বপূর্ণ।
বাজার বিশ্লেষকদের বড় অংশের ধারণা, অক্টোবরের বৈঠকে সুদের হার অপরিবর্তিত রাখা হতে পারে। তবে ডিসেম্বরের বৈঠকে আবার সুদের হার বাড়ানোর সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা চলছে। মূল্যস্ফীতি উচ্চ পর্যায়ে থাকলে কেন্দ্রীয় ব্যাংক আরও কঠোর পদক্ষেপ নিতে পারে। আবার জ্বালানির দাম কমে গেলে এবং মূল্যবৃদ্ধির গতি ধীর হলে নীতিনির্ধারকেরা অপেক্ষা করার সুযোগ পেতে পারেন। আগামী দিনের অর্থনৈতিক তথ্য এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ হবে।
ফেডের এবারের বৈঠক শুধু সুদের হার নির্ধারণের বিষয় নয়; এটি যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতি, ঋণের খরচ এবং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয়ের সঙ্গেও সরাসরি সম্পর্কিত। বুধবার স্থানীয় সময় দুপুর ২টায় সিদ্ধান্ত ঘোষণার কথা রয়েছে। এরপর ফেডের চেয়ারম্যান কেভিন ওয়ার্শ সংবাদ সম্মেলনে বক্তব্য দেবেন। সুদের হার অপরিবর্তিত রাখা হলেও ভবিষ্যতে কী পদক্ষেপ নেওয়া হতে পারে, সে বিষয়ে তাঁর বক্তব্যের দিকে নজর থাকবে বাজারের। চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত প্রকাশের পরই বোঝা যাবে, মূল্যস্ফীতি মোকাবিলায় কেন্দ্রীয় ব্যাংক আপাতত অপেক্ষার পথ বেছে নিচ্ছে, নাকি আরও কঠোর নীতির দিকে এগোচ্ছে।






মন্তব্য ০
লগইন করুন অথবা বিনা মূল্যে অ্যাকাউন্ট খুলুন আলোচনায় যোগ দিতে। নাম গোপন রেখেও মন্তব্য করতে পারবেন।
এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি করুন।