বাংলাদেশে বিনিয়োগ বাড়াতে ইউনিক্লোকে আহ্বান তারেক রহমানের, পোশাকশিল্পে নতুন সম্ভাবনা
জাপানের ফাস্ট রিটেইলিংয়ের চেয়ারম্যান তাদাশি ইয়ানাইয়ের নেতৃত্বে প্রতিনিধিদলের সঙ্গে বৈঠকে তৈরি পোশাকশিল্পে বিনিয়োগ, প্রযুক্তি হস্তান্তর ও পরিবেশবান্ধব উৎপাদন বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
বাংলাদেশের তৈরি পোশাকশিল্পে বিনিয়োগ সম্প্রসারণ, আধুনিক উৎপাদনপ্রযুক্তির ব্যবহার এবং টেকসই শিল্পায়নের সম্ভাবনা নিয়ে জাপানের বিশ্বখ্যাত পোশাক ব্র্যান্ড ইউনিক্লোর মূল প্রতিষ্ঠান ফাস্ট রিটেইলিং কোম্পানি লিমিটেডের শীর্ষ নির্বাহীদের সঙ্গে বৈঠক করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। বৈঠকে বাংলাদেশে প্রতিষ্ঠানটির দীর্ঘদিনের ব্যবসায়িক সম্পৃক্ততার প্রশংসা করার পাশাপাশি নতুন বিনিয়োগের ক্ষেত্র সম্প্রসারণে উদ্যোগ নেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
বুধবার (২৮ অক্টোবর) জাপানের স্থানীয় সময় সকাল সাড়ে ১০টায় এ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। এতে ফাস্ট রিটেইলিংয়ের চেয়ারম্যান, প্রেসিডেন্ট ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) তাদাশি ইয়ানাইয়ের নেতৃত্বে একটি প্রতিনিধিদল অংশ নেয়। আলোচনায় বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাতের সক্ষমতা বৃদ্ধি, নতুন প্রযুক্তির ব্যবহার, উৎপাদনব্যবস্থার আধুনিকায়ন এবং দুই দেশের অর্থনৈতিক সম্পর্ক আরও জোরদার করার বিষয়গুলো গুরুত্ব পায়।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বাংলাদেশের প্রতি ইউনিক্লোর আস্থা এবং ফাস্ট রিটেইলিংয়ের সঙ্গে বাংলাদেশের দীর্ঘদিনের ব্যবসায়িক সম্পর্কের প্রশংসা করেন। তিনি বলেন, বাংলাদেশের তৈরি পোশাকশিল্পে আরও বিনিয়োগের সুযোগ রয়েছে। বিশেষ করে প্রচলিত তুলাভিত্তিক পোশাক উৎপাদনের পাশাপাশি ম্যান-মেড ফাইবার বা কৃত্রিম তন্তু, টেকনিক্যাল টেক্সটাইল এবং পরিবেশবান্ধব পোশাক উৎপাদনে বিনিয়োগ বাড়ানো প্রয়োজন।
বিশ্বের পোশাকবাজারে ক্রেতাদের চাহিদা পরিবর্তন, উৎপাদনপ্রযুক্তির অগ্রগতি এবং পরিবেশগত মানদণ্ডের গুরুত্ব বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বাংলাদেশের পোশাকশিল্পেও পণ্যের বৈচিত্র্য আনার প্রয়োজনীয়তা বাড়ছে। এ পরিস্থিতিতে কৃত্রিম তন্তুভিত্তিক পোশাক, বিশেষায়িত কাপড় এবং উচ্চমূল্যের পণ্য উৎপাদনে সক্ষমতা বৃদ্ধি বাংলাদেশের রপ্তানি খাতের জন্য নতুন সুযোগ তৈরি করতে পারে। এসব ক্ষেত্রে জাপানি প্রতিষ্ঠানের অভিজ্ঞতা ও প্রযুক্তিগত সহযোগিতা কাজে লাগানোর সম্ভাবনা বৈঠকের আলোচনায় গুরুত্ব পেয়েছে।
ম্যান-মেড ফাইবার বলতে পলিয়েস্টার, নাইলনসহ বিভিন্ন ধরনের কৃত্রিম বা মানবসৃষ্ট তন্তুকে বোঝায়। আন্তর্জাতিক বাজারে এসব তন্তুর ব্যবহার বাড়ায় এ খাতে উৎপাদন সক্ষমতা গড়ে তোলা বাংলাদেশের পোশাকশিল্পের পণ্য বৈচিত্র্যকরণে সহায়ক হতে পারে। অন্যদিকে, টেকনিক্যাল টেক্সটাইল চিকিৎসা, শিল্প, পরিবহন ও সুরক্ষাসামগ্রীসহ বিভিন্ন বিশেষায়িত কাজে ব্যবহৃত হয়। এ ধরনের পণ্যে বিনিয়োগের মাধ্যমে প্রচলিত পোশাক উৎপাদনের বাইরে নতুন শিল্পক্ষেত্রেও বাংলাদেশের অংশগ্রহণ বাড়ানোর সুযোগ রয়েছে।
বৈঠকে প্রযুক্তি হস্তান্তর, কর্মীদের দক্ষতা উন্নয়ন, পণ্যের নকশা ও উদ্ভাবন, উন্নত উৎপাদনব্যবস্থা এবং পরিবেশবান্ধব উৎপাদনপ্রক্রিয়ায় সহযোগিতা বাড়ানোর বিষয়েও আলোচনা হয়। এসব উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি, আন্তর্জাতিক মান বজায় রাখা এবং বৈশ্বিক সরবরাহব্যবস্থায় বাংলাদেশের অবস্থান আরও শক্তিশালী করার সুযোগ তৈরি হতে পারে।
বাংলাদেশের পোশাকশিল্প দীর্ঘদিন ধরে দেশের রপ্তানি আয়ের অন্যতম প্রধান উৎস। তবে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা ধরে রাখতে শুধু কম উৎপাদন ব্যয়ের ওপর নির্ভর না করে পণ্যের মান, প্রযুক্তি, শ্রমিকদের দক্ষতা এবং পরিবেশগত মানদণ্ডের উন্নয়নও গুরুত্বপূর্ণ। জাপানের মতো প্রযুক্তিনির্ভর বাজারের অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে এসব ক্ষেত্রে অগ্রগতি অর্জন করা গেলে বাংলাদেশের পোশাকশিল্প আরও বৈচিত্র্যময় ও প্রতিযোগিতামূলক হতে পারে।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বাংলাদেশে ইউনিক্লোর কার্যক্রম সম্প্রসারণে সরকারের পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় সহযোগিতা দেওয়ার আগ্রহ প্রকাশ করেন। তিনি জমির ব্যবস্থা, বিনিয়োগের অনুমোদন এবং অন্যান্য প্রশাসনিক প্রক্রিয়া সহজ করার বিষয়ে সহযোগিতার কথা তুলে ধরেন। বিদেশি বিনিয়োগকারীদের জন্য ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ তৈরি, অনুমোদনপ্রক্রিয়ায় জটিলতা কমানো এবং প্রয়োজনীয় অবকাঠামোগত সুবিধা নিশ্চিত করা নতুন বিনিয়োগ আকর্ষণের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ বলে বিবেচিত হয়।
তবে বিনিয়োগ সম্প্রসারণের আহ্বান এবং সহযোগিতার আশ্বাসের অর্থ এই নয় যে বৈঠকেই নতুন কোনো বিনিয়োগ প্রকল্প চূড়ান্ত হয়েছে। এ বিষয়ে নির্দিষ্ট অর্থের পরিমাণ, নতুন কারখানা স্থাপনের সিদ্ধান্ত কিংবা বাস্তবায়নের সময়সীমা উল্লেখ করা হয়নি। ফলে আলোচনার সম্ভাব্য অর্থনৈতিক সুফল নির্ভর করবে পরবর্তী সময়ে প্রতিষ্ঠানটির সিদ্ধান্ত, বিনিয়োগ পরিকল্পনা এবং সংশ্লিষ্ট উদ্যোগ বাস্তবায়নের ওপর।
বৈঠকে বাংলাদেশ-জাপান অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব চুক্তি (ইপিএ) বাস্তবায়নের গুরুত্বও পুনর্ব্যক্ত করা হয়। এ ধরনের চুক্তির লক্ষ্য দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্য ও বিনিয়োগের সুযোগ বাড়ানো এবং অর্থনৈতিক সহযোগিতার কাঠামো আরও শক্তিশালী করা। চুক্তির কার্যকর বাস্তবায়ন দুই দেশের ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য বাজারে প্রবেশ, বাণিজ্য সম্প্রসারণ এবং দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ পরিকল্পনায় সহায়ক হতে পারে বলে বৈঠকে প্রত্যাশা ব্যক্ত করা হয়।
বাংলাদেশের পক্ষে বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী, প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনাবিষয়ক উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর, পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী-১ হুমায়ুন কবির, ইনভেস্ট বাংলাদেশের চেয়ারম্যান আশিক চৌধুরী, বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর মো. মোস্তাকুর রহমান, প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ সহকারী শাকিরুল ইসলাম খান এবং প্রধানমন্ত্রীর অতিরিক্ত প্রেস সচিবসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।






মন্তব্য ০
লগইন করুন অথবা বিনা মূল্যে অ্যাকাউন্ট খুলুন আলোচনায় যোগ দিতে। নাম গোপন রেখেও মন্তব্য করতে পারবেন।
এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি করুন।