ট্রাম্পের সাবেক সহযোগীকে অভিযুক্ত করতে পারল না যুক্তরাষ্ট্রের বিচার বিভাগ
কংগ্রেসে দেওয়া সাক্ষ্য নিয়ে তদন্তের পরও ক্যাসিডি হাচিনসনের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠনে সম্মতি দেয়নি ওয়াশিংটনের গ্র্যান্ড জুরি।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সাবেক হোয়াইট হাউস সহযোগী ক্যাসিডি হাচিনসনকে ফৌজদারি মামলায় অভিযুক্ত করার উদ্যোগে বাধার মুখে পড়েছে দেশটির বিচার বিভাগ। ওয়াশিংটনের একটি ফেডারেল গ্র্যান্ড জুরি তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠনের প্রস্তাবে সম্মতি দেয়নি। যুক্তরাষ্ট্রের একাধিক সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, কংগ্রেসের তদন্ত কমিটির সামনে দেওয়া তাঁর সাক্ষ্য নিয়ে তদন্তের অংশ হিসেবে এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল।
হাচিনসন ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদে হোয়াইট হাউসের তৎকালীন চিফ অব স্টাফ মার্ক মিডোজের সহযোগী হিসেবে কাজ করেছিলেন। ২০২২ সালে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেসের একটি তদন্ত কমিটির সামনে সাক্ষ্য দিয়ে আলোচনায় আসেন। ওই কমিটি ২০২১ সালের ৬ জানুয়ারি মার্কিন ক্যাপিটলে হামলার ঘটনা এবং হামলার আগে ও পরে ট্রাম্পের ভূমিকা নিয়ে তদন্ত করছিল।
সেই হামলার দিন কংগ্রেসের সদস্যরা ২০২০ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের ফল আনুষ্ঠানিকভাবে অনুমোদন করার প্রক্রিয়ায় ছিলেন। ওই সময় ট্রাম্পের সমর্থকদের একটি দল ক্যাপিটলে ঢুকে পড়ে এবং সহিংসতা ছড়িয়ে পড়ে। নির্বাচনে জো বাইডেনের জয় ঠেকানোর চেষ্টা হিসেবে এই হামলা যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা হয়ে আছে।
তদন্ত কমিটির সামনে হাচিনসন বলেছিলেন, হামলার দিন ট্রাম্প ক্যাপিটলে যেতে চেয়েছিলেন এবং তাঁর সমর্থকদের কাছে অস্ত্র থাকার বিষয়টি নিয়ে উদ্বেগের কথা জানানো হয়েছিল। তিনি আরও বলেছিলেন, নিরাপত্তারক্ষীরা ট্রাম্পকে ক্যাপিটলে যেতে বাধা দেওয়ার পর তিনি প্রেসিডেন্টের গাড়ির স্টিয়ারিং ধরার চেষ্টা করেছিলেন। তবে এই শেষ ঘটনাটি তিনি নিজে দেখেননি; হোয়াইট হাউসের এক নিরাপত্তা কর্মকর্তার কাছ থেকে শুনেছিলেন বলে সাক্ষ্যে উল্লেখ করেন।
হাচিনসনের ওই বক্তব্য নিয়ে তখন থেকেই বিতর্ক রয়েছে। প্রেসিডেন্টের গাড়ি চালানো এক সিক্রেট সার্ভিস কর্মকর্তা পরে জানান, তিনি ট্রাম্পকে স্টিয়ারিং ধরতে দেখেননি। ফলে সাক্ষ্যের কিছু অংশ নিয়ে ভিন্ন বক্তব্য সামনে আসে। ট্রাম্পও হাচিনসনের অভিযোগ অস্বীকার করেছিলেন এবং তাঁর বক্তব্যের সমালোচনা করেছিলেন।
যুক্তরাষ্ট্রের বিচার বিভাগ পরে হাচিনসনের কংগ্রেসে দেওয়া সাক্ষ্য নিয়ে তদন্ত করে। রিপাবলিকান কয়েকজন আইনপ্রণেতা অভিযোগ করেছিলেন, তিনি শপথ নিয়ে মিথ্যা তথ্য দিয়েছেন। তবে বিচার বিভাগ তাঁর বিরুদ্ধে ঠিক কোন কোন অভিযোগ আনতে চেয়েছিল, তা প্রকাশ্যে পুরোপুরি জানানো হয়নি।
সাম্প্রতিক শুনানিতে একজন সরকারি কৌঁসুলি আদালতকে জানান, গ্র্যান্ড জুরি প্রস্তাবিত অভিযোগে সম্মতি দেয়নি। গ্র্যান্ড জুরি হলো সাধারণ নাগরিকদের নিয়ে গঠিত একটি প্যানেল, যারা প্রসিকিউটরদের উপস্থাপিত তথ্য-প্রমাণ পর্যালোচনা করে কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক ফৌজদারি অভিযোগ আনার যথেষ্ট ভিত্তি আছে কি না, তা বিবেচনা করে।
গ্র্যান্ড জুরির সম্মতি না পাওয়ার অর্থ হলো, এই পর্যায়ে হাচিনসনের বিরুদ্ধে প্রস্তাবিত অভিযোগ গঠন করা যায়নি। তবে এর অর্থ আদালত তাঁকে নির্দোষ ঘোষণা করেছে—এমন নয়। একইভাবে, এই সিদ্ধান্ত ভবিষ্যতে নতুন তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে আবার অভিযোগ আনার সম্ভাবনাও স্বয়ংক্রিয়ভাবে বন্ধ করে দেয় না।
ঘটনাটি ট্রাম্প প্রশাসনের বিচার বিভাগের কার্যক্রম নিয়ে নতুন বিতর্ক তৈরি করেছে। সাম্প্রতিক সময়ে ট্রাম্পের সমালোচক হিসেবে পরিচিত কয়েকজন ব্যক্তি ও রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বকে ঘিরে তদন্ত ও মামলা পরিচালনার উদ্যোগ নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। সমালোচকদের একাংশ এসব পদক্ষেপকে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার প্রচেষ্টা হিসেবে দেখছেন। তবে প্রশাসনের প্রতিটি তদন্তের উদ্দেশ্য সম্পর্কে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর আগে সংশ্লিষ্ট প্রমাণ ও আইনি প্রক্রিয়া বিবেচনা করা জরুরি।
২০২১ সালের ক্যাপিটল হামলার পর ট্রাম্পের বিরুদ্ধে অভিশংসন প্রক্রিয়া শুরু হয়েছিল। প্রতিনিধি পরিষদ তাঁকে অভিশংসিত করলেও সিনেটে তিনি দোষী সাব্যস্ত হননি। পরে ২০২০ সালের নির্বাচনের ফল পাল্টানোর চেষ্টার অভিযোগে তাঁর বিরুদ্ধে ফেডারেল মামলা হয়েছিল। তবে ২০২৪ সালের নির্বাচনে ট্রাম্প আবার প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হওয়ার পর বিচার বিভাগের দীর্ঘদিনের নীতির ভিত্তিতে তাঁর বিরুদ্ধে ওই ফেডারেল মামলাটি আর এগিয়ে নেওয়া হয়নি।
হাচিনসনের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠনে গ্র্যান্ড জুরির অসম্মতি তাই শুধু একজন সাবেক কর্মকর্তাকে ঘিরে ঘটনা নয়; এটি যুক্তরাষ্ট্রে রাজনৈতিকভাবে সংবেদনশীল মামলায় প্রমাণের গুরুত্ব এবং বিচার বিভাগের সিদ্ধান্ত নিয়ে চলমান বিতর্কেরও অংশ। পরবর্তী সময়ে নতুন কোনো আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হয় কি না, তা এখন দেখার বিষয়।






মন্তব্য ০
লগইন করুন অথবা বিনা মূল্যে অ্যাকাউন্ট খুলুন আলোচনায় যোগ দিতে। নাম গোপন রেখেও মন্তব্য করতে পারবেন।
এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি করুন।