আদালতের রায়েও কাটছে না ভিসার জট, বিদেশে অপেক্ষায় হাজারো অভিবাসী
যুক্তরাষ্ট্রের ৭৫ দেশের নাগরিকদের অভিবাসী ভিসা স্থগিত রাখার নীতি আদালত বাতিল করলেও হাজারো আবেদনকারী এখনো অপেক্ষায় রয়েছেন। দীর্ঘসূত্রতায় পরিবার পুনর্মিলন ও ভবিষ্যৎ নিয়ে বাড়ছে অনিশ্চয়তা।
যুক্তরাষ্ট্রে অভিবাসী ভিসা দেওয়ার ওপর নিষেধাজ্ঞা আদালত বাতিল করার পরও হাজারো আবেদনকারী বিদেশে আটকে রয়েছেন। তাঁদের অনেকে দীর্ঘদিন ধরে ভিসার জন্য অপেক্ষা করছেন। কেউ পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রে বসবাস করতে চান, আবার কেউ চাকরি বা গবেষণার সুযোগ নিয়ে দেশটিতে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। কিন্তু আদালতের রায়ের পরও ভিসা প্রক্রিয়া সম্পন্ন না হওয়ায় তাঁদের অনিশ্চয়তা কাটছে না।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে ৭৫টি দেশের নাগরিকদের অভিবাসী ভিসা দেওয়া স্থগিত রাখার নীতি চালু করে। প্রশাসনের যুক্তি ছিল, এসব দেশের কিছু আবেদনকারী যুক্তরাষ্ট্রে গিয়ে সরকারি আর্থিক সহায়তার ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়তে পারেন। এই নীতির আওতায় এমন অনেক আবেদনকারীও পড়েন, যাঁরা নিষেধাজ্ঞা ঘোষণার আগেই ভিসার জন্য আবেদন করেছিলেন। কারও আবেদন অনুমোদিত হলেও পাসপোর্টে ভিসা লাগানো বা চূড়ান্ত প্রক্রিয়া শেষ হয়নি।
গত আগস্টে নিউইয়র্কের একটি ফেডারেল আদালত নীতিটিকে অবৈধ ঘোষণা করে। বিচারক জেনেট ভার্গাসের সিদ্ধান্তে বলা হয়, জাতীয়তার ভিত্তিতে অভিবাসী ভিসা আটকে দেওয়ার এই নীতি বিদ্যমান অভিবাসন আইনের সঙ্গে সাংঘর্ষিক এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের আইনগত ক্ষমতার সীমা অতিক্রম করেছে। আদালতের সিদ্ধান্তের ফলে শুধু ওই নীতির ভিত্তিতে প্রত্যাখ্যাত কিছু আবেদন পুনর্বিবেচনার সুযোগ তৈরি হয়। তবে এর অর্থ এই নয় যে, প্রত্যেক আবেদনকারী স্বয়ংক্রিয়ভাবে ভিসা পেয়ে যাবেন।
আদালতের সিদ্ধান্তের পরও আবেদনকারীদের অপেক্ষা অব্যাহত রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় গণমাধ্যম এনপিআরের ২৬ অক্টোবরের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, অনেক আবেদনকারী এখনো সাক্ষাৎকার, অতিরিক্ত কাগজপত্র যাচাই এবং চূড়ান্ত অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছেন। অভিবাসন আইনজীবীদের অভিযোগ, প্রশাসন ভিসা প্রক্রিয়া ধীরগতিতে চালাচ্ছে। তবে সরকারের পক্ষ থেকে ইচ্ছাকৃতভাবে প্রক্রিয়া বিলম্বিত করার অভিযোগ স্বীকার করা হয়নি।
প্রতিবেদনে আর্জেন্টিনায় আটকে থাকা এক পরিবারের পরিস্থিতিও তুলে ধরা হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক সেনাসদস্য ডাস্টিন হফম্যান তাঁর স্ত্রী গ্লোরিয়া ও সন্তানদের নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে একসঙ্গে বসবাস করতে চান। কিন্তু তাঁর স্ত্রীর অভিবাসী ভিসা এখনো সম্পন্ন হয়নি। কর্তৃপক্ষ তাঁদের যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসের আর্থিক সক্ষমতা সম্পর্কে অতিরিক্ত তথ্য চেয়েছে। ফলে আদালতের রায়ের পরও পরিবারটির পুনর্মিলন সম্ভব হয়নি।
ভিসা প্রক্রিয়ায় বিলম্বের আরেকটি কারণ হিসেবে আবেদনকারীদের আর্থিক সক্ষমতা যাচাইয়ের বিষয়টি সামনে এসেছে। মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর দূতাবাস ও কনস্যুলেটগুলোর কর্মকর্তাদের এ বিষয়ে অতিরিক্ত প্রশিক্ষণ দেওয়ার কথা জানিয়েছে। এর ফলে আগে অনুমোদনের পর্যায়ে থাকা কিছু আবেদনেও নতুন করে যাচাইয়ের প্রয়োজন হতে পারে। আবেদনকারীদের ক্ষেত্রে এর অর্থ হলো, নিষেধাজ্ঞা উঠে গেলেও তাঁদের ভিসা পাওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় সব শর্ত পূরণ করতে হবে।
এই বিলম্ব শুধু পরিবারের সদস্যদের একসঙ্গে থাকার সুযোগকে প্রভাবিত করছে না; চাকরি, উচ্চশিক্ষা ও গবেষণার পরিকল্পনাও অনিশ্চিত হয়ে পড়ছে। এনপিআরের প্রতিবেদনে কলম্বিয়ার চিকিৎসা গবেষক ফার্নান্দো লিজকানোর কথাও এসেছে। তাঁর বিশেষ দক্ষতাভিত্তিক অভিবাসী ভিসার আবেদন যোগ্য হিসেবে বিবেচিত হলেও চূড়ান্ত ভিসা পাওয়ার অপেক্ষা শেষ হয়নি। যুক্তরাষ্ট্রে গবেষণার সুযোগ থাকা সত্ত্বেও তিনি এখনো নিজ দেশেই রয়েছেন।
এই নীতির আওতায় ২ লাখ ৮০ হাজারের বেশি অভিবাসী ভিসা আবেদনকারী প্রভাবিত হয়ে থাকতে পারেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে এই সংখ্যা মানে সবাই এখনো বিদেশে আটকে আছেন বা সবার আবেদন একই অবস্থায় রয়েছে—এমন নয়। কারও আবেদন পুনর্বিবেচনাধীন, কারও অতিরিক্ত নথি প্রয়োজন, আবার কারও ক্ষেত্রে অন্য আইনি কারণে ভিসা প্রত্যাখ্যাত হতে পারে।
মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর চলমান মামলা নিয়ে বিস্তারিত মন্তব্য করতে চায়নি। অন্যদিকে অভিবাসীদের পক্ষে কাজ করা আইনজীবীরা বলছেন, আদালতের নির্দেশ বাস্তবে কার্যকর না হলে আবেদনকারীদের জন্য এর সুফল পাওয়া কঠিন হবে। প্রশাসনের আপিল প্রক্রিয়াও আইনি পরিস্থিতিকে জটিল করে রেখেছে।
আদালতের রায় অভিবাসী ভিসা স্থগিত রাখার নীতির বিরুদ্ধে গুরুত্বপূর্ণ আইনি পরিবর্তন আনলেও দীর্ঘদিনের অপেক্ষা এখনো শেষ হয়নি। আবেদনকারীদের ভিসা পাওয়ার সময় নির্ভর করছে তাঁদের ব্যক্তিগত নথি, সাক্ষাৎকার, আর্থিক সক্ষমতা যাচাই এবং চলমান আইনি প্রক্রিয়ার ওপর। তাই আদালতের রায়কে ভিসা নিশ্চিত হওয়ার ঘোষণা হিসেবে দেখা ঠিক হবে না।






মন্তব্য ০
লগইন করুন অথবা বিনা মূল্যে অ্যাকাউন্ট খুলুন আলোচনায় যোগ দিতে। নাম গোপন রেখেও মন্তব্য করতে পারবেন।
এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি করুন।