নতুন নির্বাচন ঠেকাতে ইসরায়েলের রাজনৈতিক নেতাদের সমঝোতার আহ্বান জানালেন প্রেসিডেন্ট হারজগ
ইসরায়েলের নির্বাচনের পর সরকার গঠন নিয়ে অনিশ্চয়তা বেড়েছে। নতুন নির্বাচন এড়াতে রাজনৈতিক দলগুলোকে আলোচনায় নমনীয় হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন প্রেসিডেন্ট আইজ্যাক হারজগ।
ইসরায়েলে জাতীয় নির্বাচনের পর সরকার গঠন নিয়ে রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে। কোনো পক্ষই এখন পর্যন্ত সংসদে এককভাবে সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিশ্চিত করতে পারেনি। এমন পরিস্থিতিতে দেশটির প্রেসিডেন্ট আইজ্যাক হারজগ রাজনৈতিক দলগুলোর নেতাদের প্রতি নতুন নির্বাচন এড়াতে সর্বোচ্চ চেষ্টা করার আহ্বান জানিয়েছেন। বুধবার, ২৮ অক্টোবর তিনি বলেন, রাজনৈতিক আলোচনায় অংশ নেওয়া প্রত্যেক পক্ষকে খোলা মন নিয়ে এগিয়ে আসতে হবে। মতপার্থক্য দূর করে একটি কার্যকর সরকার গঠন করাই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ।
২৭ অক্টোবর অনুষ্ঠিত নির্বাচনের পর প্রকাশিত প্রাথমিক ফলাফল এবং ভোট গণনার অগ্রগতি অনুযায়ী, প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর নেতৃত্বাধীন জোট এগিয়ে থাকলেও সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করতে পারেনি। অন্যদিকে, সাবেক সামরিক কর্মকর্তা গাদি আইজেনকোটের নেতৃত্বাধীন বিরোধী পক্ষও এককভাবে সরকার গঠনের মতো পর্যাপ্ত আসন পায়নি। ফলে দুই পক্ষকেই অন্য রাজনৈতিক দলগুলোর সমর্থন আদায়ের জন্য আলোচনা করতে হবে।
ইসরায়েলের সংসদের নাম নেসেট। এই সংসদে মোট আসন ১২০টি। সরকার গঠনের জন্য সাধারণত অন্তত ৬১ জন সংসদ সদস্যের সমর্থন প্রয়োজন হয়। দেশটির নির্বাচনী ব্যবস্থায় ভোটাররা রাজনৈতিক দলকে ভোট দেন এবং নির্বাচনের পর দলগুলো নিজেদের মধ্যে সমঝোতা করে সরকার গঠনের জন্য জোট তৈরি করে। কোনো দল এককভাবে সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করতে না পারলে ছোট দলগুলোর সমর্থনও সরকার গঠনের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের ২৮ অক্টোবরের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ভোট গণনার বিভিন্ন পর্যায়ে নেতানিয়াহুর নেতৃত্বাধীন জোট প্রায় ৫৩ থেকে ৫৬টি আসন পাওয়ার অবস্থানে ছিল। আইজেনকোটের নেতৃত্বাধীন বিরোধী জোটের আসনসংখ্যা প্রায় ৪৮ থেকে ৫০টির মধ্যে ছিল। আরব দলগুলো সম্মিলিতভাবে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক আসন পেতে পারে বলে প্রাথমিক হিসাব ইঙ্গিত দিয়েছে। তবে ভোট গণনার অগ্রগতির সঙ্গে সঙ্গে আসনসংখ্যার হিসাব পরিবর্তিত হয়েছে। তাই চূড়ান্ত ফলাফল প্রকাশের আগে এসব সংখ্যাকে নিশ্চিত ফলাফল হিসেবে বিবেচনা করা যাবে না।
প্রেসিডেন্ট হারজগ জানিয়েছেন, আনুষ্ঠানিক নির্বাচনী ফলাফল পাওয়ার পর তিনি সংসদের বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধিদের সঙ্গে আলোচনা করবেন। এসব আলোচনায় দলগুলোর মতামত, সম্ভাব্য সমর্থন এবং সরকার গঠনের সক্ষমতা বিবেচনা করা হবে। এরপর তিনি এমন একজন নেতাকে সরকার গঠনের দায়িত্ব দেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু করবেন, যাঁর পক্ষে সংসদে প্রয়োজনীয় সমর্থন সংগ্রহ করার সম্ভাবনা সবচেয়ে বেশি।
ইসরায়েলের প্রেসিডেন্টের ভূমিকা সাধারণ সময়ে অনেকটাই আনুষ্ঠানিক হলেও সরকার গঠনের সময় তাঁর সাংবিধানিক দায়িত্ব গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। নির্বাচনে সবচেয়ে বেশি আসন পাওয়া দল স্বয়ংক্রিয়ভাবে সরকার গঠনের নিশ্চয়তা পায় না। বরং কোন নেতা সংসদে সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্যের সমর্থন জোগাড় করতে পারবেন, সেটিই প্রধান বিবেচ্য বিষয়। সরকার গঠনের জন্য মনোনীত নেতাকে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে জোট গঠনের চেষ্টা করতে হয়। আলোচনা ব্যর্থ হলে অন্য নেতাকেও সুযোগ দেওয়া হতে পারে।
এবারের নির্বাচনে আরব জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধিত্বকারী দলগুলোর অবস্থান বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে। প্রাথমিক ফলাফলে এসব দল উল্লেখযোগ্যসংখ্যক আসন পাওয়ার ইঙ্গিত দিয়েছে। ফলে তাদের সমর্থন কোনো পক্ষের সরকার গঠনের হিসাব বদলে দিতে পারে। তবে ইসরায়েলের প্রধান রাজনৈতিক শিবিরগুলোর সঙ্গে আরব দলগুলোর সম্ভাব্য সহযোগিতা নিয়ে দীর্ঘদিনের মতপার্থক্য রয়েছে। নির্বাচনী প্রচারণার সময়ও বিভিন্ন পক্ষ এ ধরনের রাজনৈতিক সমঝোতা নিয়ে ভিন্ন অবস্থান প্রকাশ করেছে।
নেতানিয়াহুর রাজনৈতিক শিবির ডানপন্থী ও ধর্মীয় দলগুলোর সমর্থন ধরে রেখে সরকার গঠনের চেষ্টা করছে। অন্যদিকে আইজেনকোটের নেতৃত্বাধীন বিরোধী পক্ষ বর্তমান নেতৃত্বের বিকল্প সরকার গঠনের সম্ভাবনা খুঁজছে। উভয় পক্ষই সরকার গঠনের চেষ্টা চালানোর কথা জানিয়েছে। কিন্তু প্রয়োজনীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিশ্চিত করতে না পারলে তাদের সামনে রাজনৈতিক সমঝোতার কঠিন পথ খোলা থাকবে।
ইসরায়েলের বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতির পেছনে নিরাপত্তা, যুদ্ধ পরিচালনা এবং নেতৃত্বের জবাবদিহির প্রশ্নও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের নেতৃত্বাধীন হামলার পর দেশটি গাজায় দীর্ঘ সামরিক অভিযান চালায়। পরবর্তী সময়ে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন সংঘাতও ইসরায়েলের রাজনীতি ও নিরাপত্তা পরিস্থিতিকে প্রভাবিত করেছে। নির্বাচনে ভোটারদের সামনে বর্তমান সরকারের কার্যক্রম, ভবিষ্যৎ নিরাপত্তা এবং দেশের রাজনৈতিক নেতৃত্ব নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন ছিল।
এবারের নির্বাচনে ভোটারদের অংশগ্রহণও দুই দশকের বেশি সময়ের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছানোর ইঙ্গিত দিয়েছে। তবে ভোটারদের অংশগ্রহণ বেশি হলেও সরকার গঠনের জটিলতা দূর হয়নি। রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে সমঝোতা না হলে সংসদে সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন কঠিন হয়ে পড়তে পারে।
নতুন নির্বাচন এড়াতে প্রেসিডেন্ট হারজগের আহ্বান তাই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে বিবেচিত হচ্ছে। ইসরায়েল অতীতেও একাধিকবার রাজনৈতিক অচলাবস্থার মুখোমুখি হয়েছে এবং সরকার গঠনের সংকট কাটাতে পুনরায় নির্বাচনের আয়োজন করতে হয়েছে। এবারও রাজনৈতিক নেতারা সমঝোতায় পৌঁছাতে ব্যর্থ হলে দেশটিতে দীর্ঘস্থায়ী অনিশ্চয়তা তৈরি হতে পারে।
তবে এখনই নতুন নির্বাচন অবশ্যম্ভাবী বলে ধরে নেওয়ার সুযোগ নেই। রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে সমঝোতা হলে সংসদে প্রয়োজনীয় সমর্থন নিয়ে নতুন সরকার গঠন সম্ভব। অন্যদিকে, আলোচনা ব্যর্থ হলে পরবর্তী সাংবিধানিক প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হবে এবং পরিস্থিতি অনুযায়ী আবার নির্বাচনের প্রয়োজন দেখা দিতে পারে।
ইসরায়েলের রাজনীতিতে এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো নির্বাচনের ফলাফলকে কার্যকর সরকারে রূপ দেওয়া। প্রেসিডেন্ট আইজ্যাক হারজগ রাজনৈতিক নেতাদের খোলা মন নিয়ে আলোচনায় বসার আহ্বান জানিয়েছেন। আগামী দিনের রাজনৈতিক আলোচনা নির্ধারণ করবে, দেশটি নতুন জোট সরকার পাবে, নাকি রাজনৈতিক অচলাবস্থা আরও দীর্ঘ হবে।






মন্তব্য ০
লগইন করুন অথবা বিনা মূল্যে অ্যাকাউন্ট খুলুন আলোচনায় যোগ দিতে। নাম গোপন রেখেও মন্তব্য করতে পারবেন।
এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি করুন।