ফ্রান্সে বিক্ষোভের আগুনে ধ্বংসের মুখে ১৪৩ বছরের ঐতিহাসিক টাউন হল
জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির প্রতিবাদে ফ্রান্সজুড়ে বিক্ষোভের মধ্যে লিমোজেসের ঐতিহাসিক টাউন হলে ভয়াবহ আগুন লাগে। ছাদ ধসে পড়েছে, ভেঙে গেছে ঘড়ির টাওয়ার।
ফ্রান্সে জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি ও সরকারি সেবার মান নিয়ে অসন্তোষের মধ্যে দেশজুড়ে ব্যাপক বিক্ষোভ সহিংস রূপ নিয়েছে। এরই মধ্যে দেশটির লিমোজেস শহরের ১৪৩ বছরের পুরোনো ঐতিহাসিক টাউন হল ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। শনিবার, ১৭ অক্টোবর, বিক্ষোভের একপর্যায়ে একদল মুখোশধারী ব্যক্তি ভবনটিতে প্রবেশ করে আগুন ধরিয়ে দেয়। আগুন দ্রুত ছড়িয়ে পড়লে ভবনের ছাদ ধসে পড়ে এবং ঐতিহাসিক ঘড়ির টাওয়ারের চূড়াটি ভেঙে যায়। স্থানীয় কর্মকর্তারা ভবনটির ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতিকে শহরের ঐতিহ্যের জন্য বড় বিপর্যয় হিসেবে বর্ণনা করেছেন।
লিমোজেস ফ্রান্সের মধ্যাঞ্চলের হাউত-ভিয়েন বিভাগের একটি গুরুত্বপূর্ণ শহর। শহরটির ঐতিহাসিক টাউন হল, যা ফরাসিতে ‘হোটেল দে ভিল’ নামে পরিচিত, ১৮৮৩ সালে উদ্বোধন করা হয়। দীর্ঘদিন ধরে ভবনটি স্থানীয় প্রশাসনের কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহৃত হওয়ার পাশাপাশি শহরের ঐতিহাসিক স্থাপত্য ও নাগরিক পরিচয়ের প্রতীক হিসেবে পরিচিত ছিল। অগ্নিকাণ্ডে ভবনটির ছাদ ও বাইরের বড় অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় এর ঐতিহাসিক স্থাপত্য রক্ষা করা নিয়ে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে।
স্থানীয় কর্তৃপক্ষের প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী, বিক্ষোভের পর শহরের কেন্দ্রে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। একদল মুখোশধারী ব্যক্তি প্রথমে পৌর পুলিশের একটি গাড়িতে আগুন ধরিয়ে দেয়। পরে তারা টাউন হলের জানালা ভেঙে ভেতরে প্রবেশ করে এবং ভবনের নিচের অংশে আগুন লাগায়। আগুন দ্রুত ওপরের তলাগুলোতে ছড়িয়ে ছাদ পর্যন্ত পৌঁছে যায়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেলে ভবনের ছাদের বড় অংশ নিচের তলাগুলোর ওপর ধসে পড়ে। একই সঙ্গে ভবনটির পরিচিত ঘড়ির টাওয়ারের চূড়াও ভেঙে পড়ে।
হাউত-ভিয়েন বিভাগের প্রিফেক্ট মরিস বারাতের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ভবনটির ছাদ নিচের তলাগুলোর ওপর ধসে পড়েছিল, যদিও পশ্চিম দিকের অংশ তুলনামূলকভাবে অক্ষত ছিল। ভবনের বাইরের সম্মুখভাগের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশও ধ্বংস হয়ে যায় বলে স্থানীয় কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে। প্রিফেক্ট ঘটনাটিকে ঐতিহাসিক ঐতিহ্যের জন্য বিপর্যয় হিসেবে বর্ণনা করেন। আগুনে ভবনটির কতটা অংশ পুনরুদ্ধার করা সম্ভব হবে, তা নির্ধারণের জন্য ক্ষয়ক্ষতির মূল্যায়ন প্রয়োজন।
লিমোজেসের মেয়র গিয়োম গেরাঁ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় গভীর দুঃখ প্রকাশ করেছেন এবং সরকারি সম্পত্তি ধ্বংসের তীব্র নিন্দা জানিয়েছেন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, একটি ঐতিহাসিক স্থাপনা ধ্বংস করা হলেও শহরের জনসেবা বন্ধ হয়ে যাবে না। ঘটনার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। আগুনের সময় ভবনের ভেতরে থাকা কর্মকর্তা, পুলিশ ও কর্মচারীদের কেউ আহত হননি বলে প্রাথমিক প্রতিবেদনে জানানো হয়।
লিমোজেসের এই ঘটনা ফ্রান্সজুড়ে চলা বিক্ষোভের সবচেয়ে আলোচিত সহিংস ঘটনাগুলোর একটি হয়ে উঠেছে। জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি, শিক্ষা খাতের সমস্যা, সামাজিক বৈষম্য এবং সরকারি পরিষেবার অবনতি নিয়ে মানুষের অসন্তোষ এই আন্দোলনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। শিক্ষার্থী, শ্রমিক সংগঠন এবং বিভিন্ন সামাজিক গোষ্ঠীর অংশগ্রহণে বিক্ষোভ দেশের একাধিক শহরে ছড়িয়ে পড়ে। অনেক স্থানে মিছিল শান্তিপূর্ণ থাকলেও কিছু এলাকায় সংঘর্ষ, অগ্নিসংযোগ ও লুটপাটের ঘটনা ঘটে।
বিক্ষোভের সময় প্যারিসসহ বিভিন্ন শহরে পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষের খবর পাওয়া যায়। কয়েকটি দোকান ও সরকারি স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং পুলিশের যানবাহনে আগুন দেওয়ার ঘটনাও ঘটে। ফরাসি কর্তৃপক্ষ ও আন্দোলন আয়োজকদের দেওয়া হিসাবের মধ্যে অংশগ্রহণকারীর সংখ্যায় পার্থক্য রয়েছে। সরকারি হিসাবে দেশজুড়ে প্রায় পাঁচ লাখ ৫০ হাজার মানুষ বিক্ষোভে অংশ নেন; আয়োজকদের দাবি, সংখ্যাটি প্রায় আট লাখ। ফলে আন্দোলনের প্রকৃত অংশগ্রহণের সংখ্যা নিয়ে দুই পক্ষের হিসাব এক নয়।
গ্রেপ্তারের সংখ্যাও সময়ের সঙ্গে বেড়েছে। ১৭ অক্টোবরের প্রাথমিক প্রতিবেদনে প্রায় ৪০০ জনকে আটক করার কথা বলা হয়েছিল। পরদিন, ১৮ অক্টোবর, ফ্রান্সের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী লরাঁ নুনেজ দেশজুড়ে প্রায় ১ হাজার ৮০০ জনকে গ্রেপ্তারের কথা জানান। বিভিন্ন শহরে সহিংসতা, সরকারি সম্পত্তির ক্ষতি এবং লুটপাটের ঘটনায় তদন্ত শুরু হয়েছে। তবে গ্রেপ্তার হওয়া প্রত্যেক ব্যক্তি অপরাধে দোষী সাব্যস্ত হয়েছেন—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর সুযোগ নেই; তদন্ত ও বিচারপ্রক্রিয়ার মাধ্যমে দায় নির্ধারিত হবে।
ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল মাখোঁ সহিংসতার নিন্দা জানিয়ে সরকারি ভবন ও দোকানে হামলার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলেছেন। সরকারের বক্তব্য, নাগরিকদের শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ করার অধিকার রয়েছে, কিন্তু অগ্নিসংযোগ, লুটপাট ও সরকারি সম্পত্তি ধ্বংসের কোনো গ্রহণযোগ্যতা নেই। অন্যদিকে, আন্দোলনকারীদের বিভিন্ন অংশের দাবি, বাড়তি ব্যয়, অর্থনৈতিক চাপ এবং সরকারি সেবার দুর্বলতা নিয়ে মানুষের উদ্বেগ যথাযথভাবে বিবেচনা করা প্রয়োজন।
লিমোজেসের টাউন হলের অগ্নিকাণ্ড এখন শুধু একটি ভবনের ক্ষয়ক্ষতির ঘটনা নয়; এটি ফ্রান্সে চলমান সামাজিক অসন্তোষের মধ্যেও ঐতিহাসিক স্থাপনা ও জনসম্পত্তি রক্ষার প্রশ্ন সামনে এনেছে। ভবনটির ক্ষয়ক্ষতির পূর্ণাঙ্গ মূল্যায়ন, আগুনের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্তকরণ এবং শহরের প্রশাসনিক কার্যক্রম স্বাভাবিক রাখার বিষয়গুলো এখন কর্তৃপক্ষের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। একই সঙ্গে জীবনযাত্রার ব্যয় ও সরকারি সেবা নিয়ে মানুষের অসন্তোষ কীভাবে মোকাবিলা করা হবে, তা নিয়েও দেশটিতে আলোচনা অব্যাহত রয়েছে।





