সৌদি আরবের ইসরায়েল স্বীকৃতির সম্ভাবনা বাড়ার দাবি ট্রাম্পের, মধ্যপ্রাচ্যে নতুন কূটনৈতিক সমীকরণ
সৌদি আরবের আব্রাহাম চুক্তিতে যোগদানের সম্ভাবনা আগের চেয়ে বেড়েছে বলে মন্তব্য করেছেন ট্রাম্প, তবে ফিলিস্তিন প্রশ্নে এখনো রয়েছে গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক বাধা।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, সৌদি আরবের ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করা এবং আব্রাহাম চুক্তিতে যোগ দেওয়ার সম্ভাবনা এখন আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় বেশি হতে পারে। তাঁর এই বক্তব্য মধ্যপ্রাচ্যের কূটনীতিতে নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। তবে সৌদি আরবের পক্ষ থেকে চুক্তিতে যোগ দেওয়ার কোনো চূড়ান্ত ঘোষণা আসেনি। ফলে বিষয়টি এখনো সম্ভাবনা ও কূটনৈতিক আলোচনার পর্যায়েই রয়েছে।
আব্রাহাম চুক্তির মাধ্যমে ইসরায়েলের সঙ্গে কয়েকটি আরব দেশের সম্পর্ক স্বাভাবিক করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। ২০২০ সালে ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদে সংযুক্ত আরব আমিরাত ও বাহরাইন ইসরায়েলের সঙ্গে আনুষ্ঠানিক সম্পর্ক স্থাপনে সম্মত হয়। পরে মরক্কোও ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার প্রক্রিয়ায় যুক্ত হয়। এই উদ্যোগের লক্ষ্য ছিল কূটনৈতিক সম্পর্ক সম্প্রসারণ, অর্থনৈতিক সহযোগিতা বৃদ্ধি এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তা জোরদার করা।
সৌদি আরব এই চুক্তিতে যোগ দিলে মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতিতে বড় ধরনের পরিবর্তন ঘটতে পারে। দেশটি আরব ও মুসলিম বিশ্বের অন্যতম প্রভাবশালী রাষ্ট্র। সৌদি আরবের সঙ্গে ইসরায়েলের আনুষ্ঠানিক সম্পর্ক প্রতিষ্ঠিত হলে বাণিজ্য, প্রযুক্তি, বিনিয়োগ, পর্যটন এবং নিরাপত্তা সহযোগিতার নতুন সুযোগ তৈরি হতে পারে। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের আঞ্চলিক কৌশলও শক্তিশালী হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
তবে সৌদি আরবের অবস্থান এই উদ্যোগের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। রিয়াদ দীর্ঘদিন ধরে ফিলিস্তিনিদের রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার দাবিকে গুরুত্ব দিয়ে আসছে। সৌদি অবস্থান অনুযায়ী, স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার জন্য বিশ্বাসযোগ্য পথ নিশ্চিত করা ছাড়া ইসরায়েলের সঙ্গে পূর্ণাঙ্গ কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপন কঠিন। ১৯৬৭ সালের সীমান্তের ভিত্তিতে ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা এবং পূর্ব জেরুজালেমকে তার রাজধানী করার দাবিও এই আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ।
ফলে ট্রাম্পের আশাবাদ বাস্তবে রূপ নেওয়ার পথে ফিলিস্তিন প্রশ্ন বড় বাধা হয়ে রয়েছে। ইসরায়েল ও ফিলিস্তিনের মধ্যে দীর্ঘদিনের সংঘাত, গাজার পরিস্থিতি, পশ্চিম তীরের ভবিষ্যৎ এবং ফিলিস্তিনিদের রাজনৈতিক অধিকার নিয়ে মতবিরোধের সমাধান সহজ নয়। সৌদি নেতৃত্বকে নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক সুবিধার পাশাপাশি আরব বিশ্বের জনমত এবং ফিলিস্তিনিদের ভবিষ্যৎ নিয়েও হিসাব করতে হবে।
মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা পরিস্থিতিও এই আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। ইয়েমেনের হুতি গোষ্ঠীর হামলা এবং আঞ্চলিক সংঘাত সৌদি আরবের নিরাপত্তা উদ্বেগ বাড়িয়েছে। ট্রাম্পের বক্তব্যে ইঙ্গিত পাওয়া যায়, তিনি মনে করেন ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের সহযোগিতা সৌদি আরবের নিরাপত্তার জন্য উপকারী হতে পারে। তবে নিরাপত্তা সহযোগিতা এবং আনুষ্ঠানিক কূটনৈতিক স্বীকৃতি এক বিষয় নয়। কোনো সহযোগিতার কথা বলা হলেই দুই দেশের মধ্যে সম্পর্ক স্বাভাবিক হয়ে গেছে বলে ধরে নেওয়া যায় না।
সৌদি আরব ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে বেসামরিক পারমাণবিক সহযোগিতা নিয়েও আলোচনা গুরুত্বপূর্ণ। সৌদি আরব জ্বালানি খাতের বৈচিত্র্য বাড়াতে পারমাণবিক প্রযুক্তির উন্নয়ন চায়। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের কাছে সৌদি আরবের সঙ্গে প্রতিরক্ষা ও অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব জোরদার করা একটি গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত লক্ষ্য। এই আলোচনার সঙ্গে ইসরায়েলের সঙ্গে সৌদি সম্পর্ক স্বাভাবিক করার বিষয়টি যুক্ত হলে দর-কষাকষি আরও জটিল হতে পারে।
সৌদি আরবের আব্রাহাম চুক্তিতে যোগ দেওয়ার সম্ভাবনা নিয়ে ট্রাম্পের বক্তব্যকে তাই কূটনৈতিক আশাবাদ হিসেবে দেখা উচিত, চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হিসেবে নয়। এই উদ্যোগ সফল করতে হলে সৌদি আরবের শর্ত, ইসরায়েলের অবস্থান, ফিলিস্তিনের ভবিষ্যৎ এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তা পরিস্থিতির মধ্যে সমঝোতা প্রয়োজন হবে।
আনুষ্ঠানিক আলোচনা, সৌদি সরকারের প্রকাশ্য ঘোষণা কিংবা স্বীকৃত কোনো চুক্তি ছাড়া সৌদি আরব ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করেছে বলা যাবে না। আগামী দিনের কূটনৈতিক পদক্ষেপই নির্ধারণ করবে, ট্রাম্পের এই আশাবাদ ঐতিহাসিক সমঝোতায় রূপ নেবে, নাকি মধ্যপ্রাচ্যের দীর্ঘ কূটনৈতিক আলোচনার আরেকটি অধ্যায় হয়ে থাকবে।





