অংশ: যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচন ২০২৬
ট্রাম্পের গ্রামীণ ভোটব্যাংকে চাপ, আইওয়ায় সমর্থন ফেরাতে মাঠে ডেমোক্র্যাটরা
যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে আইওয়ার গ্রামীণ ভোটারদের মন জয়ের চেষ্টা করছে ডেমোক্র্যাটরা। জ্বালানির দাম, শুল্কনীতি ও জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ে অসন্তোষে নতুন রাজনৈতিক সমীকরণের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচন সামনে রেখে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের শক্ত ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত গ্রামীণ এলাকাগুলোতে ভোটারদের সমর্থন পাওয়ার চেষ্টা জোরদার করেছে ডেমোক্র্যাটিক পার্টি। বিশেষ করে আইওয়া অঙ্গরাজ্যে অর্থনৈতিক চাপ, জ্বালানির বাড়তি দাম এবং ট্রাম্প প্রশাসনের বিভিন্ন নীতি নিয়ে ভোটারদের অসন্তোষকে কাজে লাগাতে চাইছেন ডেমোক্র্যাট প্রার্থীরা। দীর্ঘদিন ধরে রিপাবলিকানদের শক্তিশালী সমর্থন পাওয়া এসব এলাকায় নির্বাচনী লড়াই কিছুটা প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ হয়ে উঠছে। তবে এই পরিবর্তন এখনো ডেমোক্র্যাটদের নিশ্চিত বিজয়ের ইঙ্গিত দিচ্ছে না।
১৮ অক্টোবর প্রকাশিত অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আইওয়ার উত্তর-পূর্বাঞ্চলের চিকাসো কাউন্টিসহ কয়েকটি গ্রামীণ এলাকায় কিছু ভোটার ট্রাম্পের আগের রাজনৈতিক অবস্থান ও বর্তমান নীতির মধ্যে পার্থক্য দেখছেন। তাঁদের একটি অংশ মনে করছেন, নির্বাচনের আগে জীবনযাত্রার ব্যয় কমানোর যে প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল, বাস্তবে তার সুফল প্রত্যাশামতো পাওয়া যায়নি। মধ্যবিত্ত পরিবারের ওপর অর্থনৈতিক চাপ বাড়ায় তাঁদের মধ্যে হতাশা তৈরি হয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে কিছু সাবেক ট্রাম্প সমর্থক এবার ডেমোক্র্যাট প্রার্থীদের ভোট দেওয়ার কথা ভাবছেন।
নিউ হ্যাম্পটন এলাকার বাসিন্দা ডেভ রোথলার আগে ট্রাম্পকে সমর্থন করেছিলেন। কিন্তু বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করে তিনি এবার ডেমোক্র্যাটদের সমর্থন করার পরিকল্পনার কথা জানিয়েছেন। একই এলাকার আরেক বাসিন্দা বিল স্টোনসাইফারও আগে ট্রাম্পকে ভোট দিয়েছিলেন। এবার তিনি পুরো ব্যালটে ডেমোক্র্যাট প্রার্থীদের সমর্থন করার কথা ভাবছেন বলে এপির প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। এসব ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা গ্রামীণ ভোটারদের একাংশের মনোভাব বোঝাতে সাহায্য করলেও, এগুলো দিয়ে পুরো অঙ্গরাজ্যের ভোটারদের অবস্থান নির্ধারণ করা যায় না।
ডেমোক্র্যাটদের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ হলো, গ্রামীণ এলাকায় আগের নির্বাচনে রিপাবলিকানদের পাওয়া বিপুল ভোটের ব্যবধান কমানো। আইওয়ার ডেমোক্র্যাট সিনেট প্রার্থী জশ টুরেকের মতে, তাঁর দলের শুধু শহরকেন্দ্রিক ভোটারদের ওপর নির্ভর করলে চলবে না; গ্রামীণ কাউন্টিগুলোতেও ভোটের ব্যবধান কমানোর দিকে নজর দিতে হবে। তাঁর লক্ষ্য হলো, যেসব এলাকায় রিপাবলিকানরা দীর্ঘদিন ধরে এগিয়ে আছে, সেখানে আরও বেশি ভোটারের কাছে পৌঁছানো এবং স্থানীয় সমস্যার সমাধান নিয়ে কথা বলা।
আইওয়ায় গভর্নর পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন ডেমোক্র্যাট প্রার্থী রব স্যান্ড। তিনি নিজেকে এমন একজন প্রার্থী হিসেবে তুলে ধরছেন, যিনি দলীয় বিভাজনের বাইরে গিয়ে সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন সমস্যা সমাধানে গুরুত্ব দিতে চান। তাঁর প্রচারে পরিচ্ছন্ন পানি, সরকারি জবাবদিহি, স্থানীয় এলাকার উন্নয়ন এবং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার বিষয়গুলো গুরুত্ব পাচ্ছে। সাংস্কৃতিক বিতর্কের পরিবর্তে বাস্তব সমস্যা নিয়ে কথা বলার কৌশল দিয়ে তিনি স্বতন্ত্র ভোটার ও অসন্তুষ্ট রিপাবলিকানদের কাছে টানার চেষ্টা করছেন। এপির প্রতিবেদনে এমন ভোটারদের কথাও উঠে এসেছে, যাঁরা রিপাবলিকান হলেও স্যান্ডের বক্তব্য শুনতে আগ্রহী।
অর্থনৈতিক চাপ ডেমোক্র্যাটদের জন্য একটি সুযোগ তৈরি করলেও, গ্রামীণ ভোটারদের সবাই ট্রাম্পের বিরোধিতা করছেন—এমন ধারণা সঠিক নয়। অনেক কৃষক ও রিপাবলিকান সমর্থক এখনো ট্রাম্পের নীতির পক্ষে রয়েছেন। তাঁদের কেউ কেউ মনে করেন, প্রশাসনের নেওয়া কঠোর সিদ্ধান্তগুলো দীর্ঘমেয়াদে দেশের স্বার্থে প্রয়োজনীয়। ফলে ডেমোক্র্যাটদের শুধু অসন্তোষকে সামনে আনলেই হবে না; ভোটারদের আস্থা অর্জনের জন্য বাস্তবসম্মত পরিকল্পনাও তুলে ধরতে হবে।
জ্বালানির দাম ও কৃষিপণ্যের বাণিজ্য নিয়েও উদ্বেগ বাড়ছে। আইওয়ার মতো কৃষিনির্ভর অঙ্গরাজ্যে শুল্কনীতি ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের পরিবর্তন কৃষকদের ব্যবসায় প্রভাব ফেলতে পারে। অন্যদিকে, ইরান যুদ্ধের কারণে জ্বালানির দাম বেড়ে গেলে কৃষিকাজ, পণ্য পরিবহন এবং সাধারণ মানুষের যাতায়াতের খরচও বাড়ে। ফলে অর্থনীতির এসব বিষয় এবারের নির্বাচনে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। ভোটারদের কাছে কোন দল দৈনন্দিন ব্যয় কমাতে এবং স্থানীয় অর্থনীতিকে শক্তিশালী করতে পারবে, সেটি বড় প্রশ্ন।
এদিকে ডেমোক্র্যাটদের নির্বাচনী সংগঠনগুলোও গ্রামীণ এলাকায় প্রচার বাড়াচ্ছে। এপির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ডেমোক্র্যাটিক গভর্নরস অ্যাসোসিয়েশন আইওয়াসহ কয়েকটি অঙ্গরাজ্যে অর্থায়ন করেছে। পাশাপাশি ডেমোক্র্যাটিক কংগ্রেশনাল ক্যাম্পেইন কমিটি গ্রামীণ ভোটারদের কাছে পৌঁছাতে নতুন কর্মসূচি, প্রচারকর্মী এবং বিজ্ঞাপনে বিনিয়োগ করছে। আইওয়ার দ্বিতীয় কংগ্রেশনাল জেলাতেও বিজ্ঞাপনের পেছনে অর্থ ব্যয় করা হয়েছে। এই উদ্যোগের লক্ষ্য হলো, যেসব এলাকায় দলটি আগে তুলনামূলকভাবে দুর্বল ছিল, সেখানে নতুন ভোটারদের সঙ্গে যোগাযোগ বাড়ানো।
আগামী ৩ নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনে যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ নির্ধারণে প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ আসনগুলো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। আইওয়ায় সিনেট, গভর্নর ও প্রতিনিধি পরিষদের কয়েকটি আসনে প্রতিযোগিতা থাকায় দুই দলই ভোটারদের সমর্থন নিশ্চিত করতে তৎপর। ট্রাম্পের গ্রামীণ সমর্থনে কোনো পরিবর্তন ঘটছে কি না, তা নির্বাচনের ফলাফলে আরও পরিষ্কার হতে পারে। তবে এখনই তাঁর গ্রামীণ ভোটব্যাংক ভেঙে পড়েছে বলে সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর সুযোগ নেই।
আইওয়া এবারের মার্কিন মধ্যবর্তী নির্বাচনে একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক পরীক্ষাক্ষেত্র হয়ে উঠেছে। জীবনযাত্রার ব্যয়, জ্বালানি, কৃষি অর্থনীতি ও সরকারি নীতির প্রশ্নে ভোটারদের অসন্তোষ ডেমোক্র্যাটদের জন্য নতুন সুযোগ তৈরি করেছে। কিন্তু সেই সুযোগকে আসনে জয় ও ভোটের সমর্থনে রূপান্তর করতে হলে তাঁদের গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর আস্থা অর্জন করতে হবে। অন্যদিকে, ট্রাম্প ও রিপাবলিকানদের সামনে চ্যালেঞ্জ হলো তাঁদের পুরোনো সমর্থকদের ভোটকেন্দ্রে নিয়ে যাওয়া এবং অর্থনীতি নিয়ে উদ্বেগের জবাব দেওয়া। শেষ পর্যন্ত আইওয়ার ভোটাররা কোন দলকে বেছে নেবেন, তা নির্ভর করবে নির্বাচনী প্রচার, স্থানীয় সমস্যার সমাধানের প্রতিশ্রুতি এবং ভোটারদের বাস্তব অভিজ্ঞতার ওপর।







