সাভারে সেনাবাহিনীর সাত ইউনিটকে জাতীয় পতাকা দিলেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান
সাভারে সাত সেনা ইউনিটকে জাতীয় পতাকা দিয়ে শৃঙ্খলা, পেশাদারত্ব, আধুনিক প্রতিরক্ষা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষার অঙ্গীকার তুলে ধরলেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর সাতটি ইউনিটকে জাতীয় পতাকা প্রদান করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। রোববার সকালে সাভার সেনানিবাসে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে পেশাগত দক্ষতা, অবদান ও গৌরবের স্বীকৃতিস্বরূপ এসব ইউনিটের হাতে জাতীয় পতাকা তুলে দেওয়া হয়। অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী সেনাবাহিনীর শৃঙ্খলা, পেশাদারত্ব, আধুনিকায়ন, প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং জনগণের আস্থা অর্জনের ওপর বিশেষ গুরুত্বারোপ করেন।
অনুষ্ঠানটি আয়োজন করে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর নবম পদাতিক ডিভিশন। বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, সকাল সোয়া নয়টার দিকে প্রধানমন্ত্রী সাভার সেনানিবাসে পৌঁছালে সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান তাঁকে স্বাগত জানান। সেখানে সেনাবাহিনীর একটি সুসজ্জিত দল তাঁকে আনুষ্ঠানিক অভিবাদন জানায়। পরে আয়োজিত পতাকা প্রদান অনুষ্ঠানে সাতটি ইউনিটের প্রতিনিধিদের হাতে জাতীয় পতাকা তুলে দেওয়া হয়।
এবার জাতীয় পতকাপ্রাপ্ত ইউনিটগুলো হলো প্রেসিডেন্ট গার্ড রেজিমেন্ট, সপ্তম ফিল্ড রেজিমেন্ট আর্টিলারি, বত্রিশতম ফিল্ড রেজিমেন্ট আর্টিলারি, পঁচিশতম আকাশ প্রতিরক্ষা রেজিমেন্ট, নবম ইঞ্জিনিয়ার ব্যাটালিয়ন, ছাপ্পান্নতম ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট এবং সাতান্নতম ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট। জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে দায়িত্ব পালন, পেশাগত উৎকর্ষ এবং বিভিন্ন ক্ষেত্রে অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে এসব ইউনিটকে এই সম্মান দেওয়া হয়েছে বলে সংবাদমাধ্যমগুলো জানিয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী তাঁর বক্তব্যে বলেন, জাতীয় পতাকা কেবল একটি আনুষ্ঠানিক প্রতীক নয়; এটি একটি ইউনিটের ইতিহাস, ঐতিহ্য, শৃঙ্খলা, আত্মত্যাগ, পেশাদারত্ব এবং দেশের প্রতি অঙ্গীকারের পরিচায়ক। এই সম্মান অর্জনের মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট সদস্যদের দায়িত্ব আরও নিষ্ঠা ও আন্তরিকতার সঙ্গে পালনের নতুন শপথ গ্রহণ করতে হবে। জাতীয় পতাকার মর্যাদা রক্ষা করা প্রত্যেক সৈনিকের পবিত্র দায়িত্ব বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
তারেক রহমান বলেন, একটি সশস্ত্র বাহিনীর শক্তি শুধু অস্ত্র, সামরিক সরঞ্জাম কিংবা জনবলের ওপর নির্ভর করে না। প্রকৃত শক্তি গড়ে ওঠে শৃঙ্খলা, দক্ষতা, নেতৃত্ব, নৈতিকতা, প্রশিক্ষণ এবং জনগণের আস্থার ভিত্তিতে। একই সঙ্গে বাহিনীর অভ্যন্তরীণ নির্দেশনা ও দায়িত্বের ধারাবাহিকতা বজায় রাখার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি। সংবিধান, দেশের প্রচলিত আইন, সামরিক বিধিবিধান এবং মানবিক মূল্যবোধ অনুসরণ করে দায়িত্ব পালনের জন্যও সেনাসদস্যদের প্রতি আহ্বান জানান প্রধানমন্ত্রী।
বর্তমান বিশ্বের নিরাপত্তা পরিস্থিতি দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, আধুনিক যুদ্ধের ধরন এখন আর শুধু স্থল, নৌ ও আকাশসীমার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। সাইবার জগৎ, মহাকাশ, চালকবিহীন উড়োজাহাজ, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, বৈদ্যুতিন যুদ্ধ এবং তথ্যনির্ভর সক্ষমতা জাতীয় নিরাপত্তার গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছে। এসব পরিবর্তনের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে বাংলাদেশের প্রতিরক্ষা প্রস্তুতি জোরদার করার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেন তিনি।
প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, বাংলাদেশ সেনাবাহিনীকে প্রযুক্তিনির্ভর, দক্ষ, শৃঙ্খলাবদ্ধ, পেশাদার ও আধুনিক বাহিনী হিসেবে গড়ে তোলার প্রচেষ্টা অব্যাহত রয়েছে। প্রতিরক্ষা খাতে দেশীয় উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানোর বিষয়েও সরকার গুরুত্ব দিচ্ছে। দেশে প্রয়োজনীয় অস্ত্র, গোলাবারুদ এবং অন্যান্য প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম উৎপাদনের সক্ষমতা গড়ে তোলা গেলে আমদানিনির্ভরতা কমানোর পাশাপাশি জাতীয় নিরাপত্তার ভিত্তিও শক্তিশালী হতে পারে।
তবে প্রযুক্তি কখনোই দক্ষ ও প্রশিক্ষিত মানুষের বিকল্প হতে পারে না বলে মন্তব্য করেন তারেক রহমান। তাঁর মতে, আধুনিক প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হলে প্রযুক্তিগত উন্নয়নের পাশাপাশি যোগ্য নেতৃত্ব, প্রশিক্ষণ, অভিজ্ঞতা এবং বাহিনীগুলোর মধ্যে সমন্বয় বাড়াতে হবে। প্রয়োজনের সময় সেনা, নৌ ও বিমান বাহিনী যেন সমন্বিতভাবে কাজ করতে পারে, সে ধরনের প্রতিরক্ষা সক্ষমতা গড়ে তোলার ওপরও তিনি গুরুত্ব দেন।
সেনাসদস্যদের কল্যাণের বিষয়টিও বক্তব্যে উঠে আসে। প্রধানমন্ত্রী জানান, আবাসন, চিকিৎসা, শিক্ষা, প্রশিক্ষণ, পেশাগত উন্নয়ন এবং অবসর-পরবর্তী সামাজিক নিরাপত্তার মতো বিষয়গুলোকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। জাতীয় বেতন কাঠামোর আওতায় সশস্ত্র বাহিনীর সদস্যদের বেতন ও ভাতা বৃদ্ধির বিষয়টি উল্লেখ করে তিনি বলেন, তাঁদের জীবনযাত্রার মান উন্নয়নে বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি সমপদমর্যাদায় সমপেনশন ব্যবস্থা বাস্তবায়নের কাজ চলমান রয়েছে বলেও জানান তিনি।
অনুষ্ঠানে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধে সেনাবাহিনীর ঐতিহাসিক ভূমিকার কথাও স্মরণ করেন প্রধানমন্ত্রী। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সঙ্গে সেনাবাহিনীর জন্ম ও বিকাশের গভীর সম্পর্ক রয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন। দেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব ও জাতীয় মর্যাদা রক্ষায় সেনাবাহিনীর অবদানকে তিনি গুরুত্বপূর্ণ বলে অভিহিত করেন।
প্রাকৃতিক দুর্যোগ, বন্যা, ঘূর্ণিঝড়, অগ্নিকাণ্ড এবং বিভিন্ন জরুরি পরিস্থিতিতে সশস্ত্র বাহিনীর ভূমিকার কথাও তুলে ধরেন তিনি। দেশের ভেতরে দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক শান্তিরক্ষা কার্যক্রমে বাংলাদেশি সেনাসদস্যদের অবদানের প্রশংসা করেন প্রধানমন্ত্রী।
বক্তব্যের শেষাংশে তারেক রহমান বলেন, জাতীয় স্বার্থ, সার্বভৌমত্ব ও আত্মমর্যাদা রক্ষা বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ অঙ্গীকারের অন্যতম প্রধান ভিত্তি হবে। একই সঙ্গে পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও সমতার ভিত্তিতে বিশ্বের সব দেশের সঙ্গে বন্ধুত্ব ও সহযোগিতা জোরদার করতে চায় বাংলাদেশ।
অনুষ্ঠানে মন্ত্রী, উপদেষ্টা, সেনাপ্রধান, সামরিক ও বেসামরিক কর্মকর্তা, কূটনৈতিক প্রতিনিধিসহ সেনাবাহিনীর বিভিন্ন পর্যায়ের সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন। সাতটি ইউনিটকে জাতীয় পতাকা প্রদানকে সংশ্লিষ্ট বাহিনীর পেশাগত অর্জনের স্বীকৃতি হিসেবে দেখা হচ্ছে। তবে এই সম্মান ভবিষ্যতে আরও দক্ষতা, দায়িত্বশীলতা এবং জনআস্থা অর্জনের প্রত্যাশাও সামনে নিয়ে এসেছে।





