বিশ্ববাজারে স্বর্ণের দামে ফের চাপ, বিনিয়োগকারীদের কপালে চিন্তার ভাঁজ
বিশ্ববাজারে স্বর্ণের দামে আবারও নিম্নমুখী চাপ দেখা দিয়েছে; মার্কিন মূল্যস্ফীতি, ডলারের শক্তি ও সুদের হার নিয়ে অনিশ্চয়তায় বাড়ছে বিনিয়োগকারীদের উদ্বেগ।
বিশ্ববাজারে স্বর্ণের দামে আবারও দুর্বলতার ইঙ্গিত দেখা যাচ্ছে। মূল্যবান এই ধাতুর বাজারে সাম্প্রতিক দরপতন, ডলারের শক্ত অবস্থান এবং যুক্তরাষ্ট্রের মূল্যস্ফীতি নিয়ে উদ্বেগের কারণে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে নতুন করে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। বছরের শুরুতে রেকর্ড উচ্চতায় ওঠার পর স্বর্ণের বাজারে যে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে, তা এখনো কাটেনি। ফলে স্বর্ণের দাম আরও কমবে, নাকি আবার ঘুরে দাঁড়াবে, তা নিয়ে বাজারসংশ্লিষ্টদের মধ্যে চলছে নানা হিসাব-নিকাশ।
বিশ্ববাজারের সর্বশেষ প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের ১৬ অক্টোবর শুক্রবার লেনদেন শেষে প্রতি ট্রয় আউন্স স্বর্ণের দাম ছিল প্রায় ৪ হাজার ১৬৫ দশমিক ৪২ মার্কিন ডলার। আগের দিনের তুলনায় দাম কমেছে সামান্য। পুরো সপ্তাহের হিসাবে দর কমেছে প্রায় শূন্য দশমিক ৭ শতাংশ। ১৮ অক্টোবর রবিবার আন্তর্জাতিক বাজারের নিয়মিত লেনদেন বন্ধ থাকায় শুক্রবারের সমাপনী দরই সর্বশেষ পূর্ণাঙ্গ লেনদেনের ভিত্তি হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
তবে সাম্প্রতিক দরপতনের চিত্রটি একটানা নিম্নমুখী নয়। গত ১৪ অক্টোবর বুধবার যুক্তরাষ্ট্রে মূল্যস্ফীতির তথ্য প্রকাশের পর স্বর্ণের দাম এক দিনে উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছিল। সেদিন আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতি আউন্স স্বর্ণের তাৎক্ষণিক দর প্রায় ১ দশমিক ৮ শতাংশ কমে ৪ হাজার ৮৩ দশমিক ৯৪ ডলারে নেমে আসে। একই সময়ে ভবিষ্যৎ সরবরাহের চুক্তিতেও দাম কমেছিল। এর পরদিন বৃহস্পতিবার ডলারের দুর্বলতা এবং মার্কিন সরকারি ঋণপত্রের মুনাফা কমে আসায় স্বর্ণের দাম আবার ১ শতাংশের বেশি বেড়ে যায়।
এই ওঠানামা থেকেই বোঝা যায়, স্বর্ণের বাজারে এখনো স্থিতিশীলতা ফেরেনি। একদিকে মূল্যস্ফীতির কারণে সুদের হার বাড়তে পারে—এমন আশঙ্কা স্বর্ণের ওপর চাপ তৈরি করছে। অন্যদিকে সুদের হার না বাড়ার সম্ভাবনা এবং ডলারের দুর্বলতা দামকে আবার সমর্থন দিচ্ছে। তাই সাম্প্রতিক পরিস্থিতিকে স্বর্ণের বাজারে নিশ্চিত ও দীর্ঘস্থায়ী পতন হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।
স্বর্ণের দামের ওপর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাবকগুলোর একটি হলো যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সুদনীতি। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে সুদের হার বাড়ানো হলে সাধারণত স্বর্ণের বাজারে চাপ সৃষ্টি হয়। কারণ, স্বর্ণ কোনো নিয়মিত সুদ বা মুনাফা দেয় না। অন্যদিকে সরকারি ঋণপত্রের মতো সম্পদ থেকে তুলনামূলক বেশি মুনাফা পাওয়া গেলে অনেক বিনিয়োগকারী স্বর্ণের পরিবর্তে সেদিকে অর্থ সরিয়ে নিতে পারেন। এতে স্বর্ণের চাহিদা কমে দাম নেমে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়।
অক্টোবরের মাঝামাঝি যুক্তরাষ্ট্রে মূল্যস্ফীতির পরিসংখ্যান প্রত্যাশার চেয়ে বেশি হওয়ায় সুদের হার বাড়ানোর সম্ভাবনা নিয়ে বাজারে আলোচনা জোরালো হয়েছিল। বিশেষ করে জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি এবং পণ্য ও পরিষেবার ব্যয় বেড়ে যাওয়ার বিষয়টি মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের চ্যালেঞ্জ বাড়িয়েছে। তবে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কর্মকর্তাদের বক্তব্যে তাৎক্ষণিকভাবে সুদের হার বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তা নিয়ে সতর্ক অবস্থানের ইঙ্গিতও পাওয়া গেছে। ফলে বিনিয়োগকারীরা এখন অর্থনৈতিক পরিসংখ্যানের পাশাপাশি নীতিনির্ধারকদের বক্তব্যও গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করছেন।
ডলারের বিনিময়মূল্যও স্বর্ণের বাজারে বড় ভূমিকা রাখছে। আন্তর্জাতিক বাজারে স্বর্ণের দাম সাধারণত ডলারে নির্ধারিত হয়। ডলার শক্তিশালী হলে অন্যান্য মুদ্রা ব্যবহারকারী ক্রেতাদের জন্য স্বর্ণ কেনা ব্যয়বহুল হয়ে উঠতে পারে। এতে চাহিদা কমার আশঙ্কা তৈরি হয়। বিপরীতে ডলারের মূল্য কমলে স্বর্ণের বাজারে ক্রয়চাপ বাড়তে পারে। গত সপ্তাহে ডলারের শক্তিশালী অবস্থান স্বর্ণের দামে চাপ সৃষ্টি করলেও পরবর্তী সময়ে ডলার দুর্বল হওয়ায় বাজারে কিছুটা পুনরুদ্ধার দেখা যায়।
আন্তর্জাতিক ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতিও স্বর্ণের ভবিষ্যৎ গতিপথ নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ। যুদ্ধ, সংঘাত, অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা কিংবা বৈশ্বিক বাণিজ্যে অনিশ্চয়তা দেখা দিলে অনেক বিনিয়োগকারী নিরাপদ সম্পদ হিসেবে স্বর্ণের দিকে ঝোঁকেন। এতে সাধারণত স্বর্ণের চাহিদা বাড়ে। কিন্তু সংঘাতের কারণে জ্বালানির দাম বাড়লে মূল্যস্ফীতি আরও দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে এবং সুদের হার বেশি থাকার সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে। এই দুই বিপরীত প্রভাব একই সময়ে কাজ করায় বর্তমান বাজারের গতিপথ অনুমান করা কঠিন হয়ে উঠেছে।
বিশ্ববাজারের এই পরিস্থিতি বাংলাদেশের স্বর্ণের বাজারেও প্রভাব ফেলতে পারে। আন্তর্জাতিক বাজারে স্বর্ণের দাম কমলে স্থানীয় বাজারে দাম কমার সুযোগ তৈরি হয়। তবে বাংলাদেশে স্বর্ণের খুচরা মূল্য শুধু আন্তর্জাতিক দর দিয়ে নির্ধারিত হয় না। ডলারের বিপরীতে টাকার বিনিময়মূল্য, আমদানি ও সরবরাহসংক্রান্ত ব্যয়, স্থানীয় বাজারের চাহিদা এবং স্বর্ণ ব্যবসায়ীদের নির্ধারিত মূল্যও গুরুত্বপূর্ণ। তাই আন্তর্জাতিক বাজারে দাম কমলেই বাংলাদেশে একই অনুপাতে দাম কমবে, এমন নিশ্চয়তা নেই।
বাংলাদেশের ক্রেতাদের জন্য আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো গয়নার মোট মূল্য। স্বর্ণের মূল দামের পাশাপাশি গয়না তৈরির মজুরি, প্রযোজ্য কর এবং অন্যান্য খরচ যুক্ত হতে পারে। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে স্বর্ণের দর কমলেও ক্রেতার প্রকৃত ব্যয়ে পরিবর্তন তুলনামূলক কম হতে পারে। স্থানীয় বাজারে কেনাকাটার আগে বাংলাদেশ জুয়েলার্স অ্যাসোসিয়েশনের সর্বশেষ ঘোষিত দর যাচাই করা প্রয়োজন।
বিনিয়োগকারীদের জন্য বর্তমান পরিস্থিতিতে তাড়াহুড়া করে সিদ্ধান্ত নেওয়া ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে। স্বর্ণের দাম সাময়িকভাবে কমেছে বলে দ্রুত কেনা যেমন ঝুঁকিমুক্ত নয়, তেমনি আরও কমবে ভেবে সব স্বর্ণ বিক্রি করাও বিচক্ষণ সিদ্ধান্ত নাও হতে পারে। বিনিয়োগের আগে ব্যক্তিগত আর্থিক সামর্থ্য, অর্থের প্রয়োজনীয়তা, কেনাবেচার খরচ এবং সম্ভাব্য মূল্যপরিবর্তন বিবেচনা করা জরুরি।
সামনের দিনগুলোতে যুক্তরাষ্ট্রের মূল্যস্ফীতির নতুন তথ্য, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সুদনীতি, ডলারের গতিপথ এবং বৈশ্বিক রাজনৈতিক পরিস্থিতির দিকে নজর রাখবেন বাজারসংশ্লিষ্টরা। এসব বিষয়ে ইতিবাচক পরিবর্তন এলে স্বর্ণের দাম আবার বাড়তে পারে। বিপরীতে সুদের হার বাড়ানোর সম্ভাবনা জোরালো হলে কিংবা ডলার আরও শক্তিশালী হলে দামের ওপর নতুন চাপ সৃষ্টি হতে পারে।
বিশ্ববাজারে স্বর্ণের সাম্প্রতিক দুর্বলতা বিনিয়োগকারীদের জন্য সতর্কসংকেত হলেও বাজারে দীর্ঘমেয়াদি পতন নিশ্চিত হয়েছে এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর মতো যথেষ্ট প্রমাণ নেই। সর্বশেষ প্রাপ্ত দর অনুযায়ী, সপ্তাহজুড়ে স্বর্ণের দাম কমলেও মাঝখানে উল্লেখযোগ্য পুনরুদ্ধার হয়েছে। তাই আগামী দিনের বাজার পরিস্থিতি বুঝতে এক দিনের দরপতনের পরিবর্তে ধারাবাহিক মূল্যপরিবর্তন, সুদনীতি এবং ডলারের গতিপথ পর্যবেক্ষণ করাই হবে বেশি যুক্তিসংগত।





