ইরানে নারী নিরাপত্তা কমান্ডারকে গুলি করে হত্যা, দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলে বাড়ছে অস্থিরতা
ইরানের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলে নারী আধাসামরিক কমান্ডার ও এক পুলিশ সদস্য নিহত হওয়ার ঘটনায় নিরাপত্তা উদ্বেগ বেড়েছে, হামলাকারীদের পরিচয় এখনো নিশ্চিত নয়।
ইরানে নারী আধাসামরিক বাহিনীর এক কমান্ডারকে গুলি করে হত্যার ঘটনায় দেশটির দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলে নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। একই দিনে পৃথক হামলায় এক পুলিশ সদস্যের মৃত্যুর খবরও প্রকাশিত হয়েছে। ঘটনাগুলো ঘটেছে সিস্তান-বেলুচিস্তান প্রদেশের মেহরেস্তান এলাকায়। সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে এ অঞ্চলে নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যদের লক্ষ্য করে একাধিক হামলা, সশস্ত্র সংঘর্ষ ও বোমা বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটেছে বলে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে।
নিহত নারী কমান্ডারের নাম আফসানে আকিলা। ইরানের সংবাদমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, তিনি দেশটির ইসলামি বিপ্লবী রক্ষীবাহিনীর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বাসিজ বাহিনীর একটি নারী ইউনিটের নেতৃত্বে ছিলেন। বুধবার, ১৪ অক্টোবর, তাঁকে নিজ বাড়ির সামনে গুলি করে হত্যা করা হয় বলে ইরানি সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। পরবর্তী প্রতিবেদনগুলোতেও তাঁর মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে।
ইরানের সংবাদমাধ্যমগুলোর বরাতে জানা গেছে, আকিলা মেহরেস্তান এলাকার শাহিদে আফজাল নারী বাসিজ ইউনিটের কমান্ডার ছিলেন। তাঁর জন্মস্থান ছিল জাবোল। তবে হামলাটি কীভাবে সংঘটিত হয়, হামলাকারীর সংখ্যা কত ছিল এবং তাঁরা কোন পথে পালিয়ে যান—এসব বিষয়ে নির্ভরযোগ্য ও পূর্ণাঙ্গ তথ্য এখনো প্রকাশ্যে আসেনি।
একই দিনে মেহরেস্তান এলাকায় আরেকটি পৃথক হামলায় মোহাম্মদ আলী শাহরিয়ারি নামের এক পুলিশ সদস্য নিহত হন। সংবাদমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, বন্দুকধারীরা পুলিশের একটি গাড়িতে হামলা চালায়। এতে শাহরিয়ারি গুরুতর আহত হন এবং পরে হাসপাতালে তাঁর মৃত্যু হয়। হামলাকারীদের সঙ্গে পুলিশের গোলাগুলির ঘটনাও ঘটেছিল বলে ইরানি সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে। কয়েকটি প্রতিবেদনে ওই হামলায় আরও পুলিশ সদস্য আহত হওয়ার কথাও উল্লেখ করা হয়েছে।
দুটি হত্যাকাণ্ড একই এলাকায় সংঘটিত হলেও এগুলো একই হামলার অংশ ছিল—এমন প্রমাণ এখনো পাওয়া যায়নি। বরং প্রকাশিত প্রতিবেদনগুলোতে ঘটনাগুলোকে পৃথক হামলা হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। ফলে দুই ঘটনার মধ্যে সরাসরি যোগসূত্র রয়েছে বলে দাবি করার আগে তদন্তের ফলাফল জানা জরুরি।
নারী কমান্ডার হত্যার ঘটনাটি নিয়ে ইরানের সংবাদমাধ্যমে হামলাকারীদের বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ তোলা হয়েছে। তবে কারা এই হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছে, তাদের সাংগঠনিক পরিচয় কী এবং কোনো গোষ্ঠী হামলার দায় স্বীকার করেছে কি না, তা স্বাধীনভাবে নিশ্চিত করা যায়নি। কোনো পক্ষের অভিযোগকে নিরপেক্ষ তদন্তে প্রমাণিত তথ্য হিসেবে বিবেচনা করার সুযোগ নেই।
বাসিজ হলো ইরানের ইসলামি বিপ্লবী রক্ষীবাহিনীর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট একটি আধাসামরিক সংগঠন। দেশটির অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা ও রাজনৈতিক ব্যবস্থায় এ সংগঠনের ভূমিকা রয়েছে। সংগঠনটির নারী শাখার সদস্যরাও বিভিন্ন কার্যক্রমে অংশ নেন। ফলে নারী ইউনিটের একজন কমান্ডারকে হত্যা করার ঘটনা নিরাপত্তা বাহিনীর জন্য তাৎপর্যপূর্ণ বলে বিবেচিত হচ্ছে।
সিস্তান-বেলুচিস্তান ইরানের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের একটি সীমান্তবর্তী প্রদেশ। এর সঙ্গে পাকিস্তান ও আফগানিস্তানের সীমান্ত রয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে এ অঞ্চলে সশস্ত্র গোষ্ঠীর তৎপরতা, নিরাপত্তা বাহিনীর সঙ্গে সংঘর্ষ এবং চোরাচালানসংক্রান্ত সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে। অঞ্চলটির ভৌগোলিক অবস্থান, অর্থনৈতিক বৈষম্য ও দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক-সামাজিক বিরোধ পরিস্থিতিকে জটিল করে তুলেছে।
সাম্প্রতিক সহিংসতার ধারাবাহিকতায় ৯ অক্টোবর জাহেদান এলাকায় সড়কের পাশে বিস্ফোরণে নোসরাত এফতেখারি নামের এক জ্যেষ্ঠ পুলিশ কর্মকর্তা নিহত হওয়ার খবর প্রকাশ করে ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম। এর আগে বিভিন্ন এলাকায় পুলিশ চৌকিতে হামলা এবং নিরাপত্তা বাহিনীর সঙ্গে সশস্ত্র ব্যক্তিদের সংঘর্ষের খবরও সামনে এসেছে। এসব ঘটনা প্রদেশটিতে নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ আরও বাড়িয়েছে।
তবে ধারাবাহিক হামলার খবর থাকলেও পুরো ইরানের নিরাপত্তা ব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর মতো পর্যাপ্ত প্রমাণ নেই। বরং প্রকাশিত তথ্যগুলো মূলত সিস্তান-বেলুচিস্তান প্রদেশের নির্দিষ্ট কয়েকটি এলাকা ও নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যদের ওপর হামলাকে কেন্দ্র করে। পরিস্থিতির সামগ্রিক চিত্র বুঝতে সরকারি তথ্য, স্থানীয় সংবাদ, স্বাধীন পর্যবেক্ষণ এবং তদন্তের ফলাফল একসঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন।
এই হত্যাকাণ্ডের পর কর্তৃপক্ষ কী ধরনের নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়েছে, সন্দেহভাজন কাউকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে কি না এবং তদন্তে নতুন কোনো তথ্য পাওয়া গেছে কি না এসব প্রশ্নের পূর্ণাঙ্গ উত্তর এখনো প্রকাশিত প্রতিবেদনগুলোতে স্পষ্ট নয়। হামলাকারীদের পরিচয় ও উদ্দেশ্য নির্ধারণের ক্ষেত্রেও আরও যাচাই প্রয়োজন।
সামগ্রিকভাবে, নারী বাসিজ কমান্ডার আফসানে আকিলা এবং পুলিশ সদস্য মোহাম্মদ আলী শাহরিয়ারির পৃথক হত্যাকাণ্ড ইরানের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলে চলমান নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জের নতুন উদাহরণ। তবে ঘটনার দায়, সম্ভাব্য পরিকল্পনাকারী এবং দুই হামলার মধ্যে কোনো সম্পর্ক রয়েছে কি না, তা নিশ্চিত করতে তদন্তের ফলাফলের অপেক্ষা করতে হবে।





