মধ্যবর্তী নির্বাচনে কারচুপির অভিযোগ উঠলে সামরিক আইন চান ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ মিত্ররা
যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচন ঘিরে নতুন উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। কারচুপির অভিযোগ উঠলে সামরিক আইনসহ কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ার প্রস্তাব দিয়েছেন ট্রাম্পের কয়েকজন ঘনিষ্ঠ রাজনৈতিক মিত্র।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের কয়েকজন ঘনিষ্ঠ রাজনৈতিক মিত্র আসন্ন মধ্যবর্তী নির্বাচনে কারচুপি হয়েছে বলে মনে করলে সামরিক আইন জারিসহ ব্যতিক্রমী পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। তাঁদের প্রস্তাবের মধ্যে রয়েছে ভোট স্থগিত রাখার দাবি, ব্যালট ও ভোট গণনার সরঞ্জামের নিয়ন্ত্রণ নেওয়া এবং নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় কেন্দ্রীয় সরকারের হস্তক্ষেপ বাড়ানো। মার্কিন সংবাদমাধ্যম অ্যাক্সিওসের ১৬ অক্টোবর প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে। তবে এসব প্রস্তাবকে ট্রাম্পের আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।
গত ৩০ সেপ্টেম্বর নির্বাচনী নিরাপত্তা নিয়ে আয়োজিত একটি অনলাইন আলোচনায় ট্রাম্পপন্থী কয়েকজন কর্মী নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচন নিয়ে আশঙ্কা প্রকাশ করেন। তাঁদের দাবি ছিল, নির্বাচনে নিরাপত্তা বিঘ্নিত হতে পারে এবং ভোটে কারচুপি ঘটতে পারে। তবে তাঁদের এসব আশঙ্কার পক্ষে দেশজুড়ে নির্বাচনে ব্যাপক কারচুপির কোনো প্রমাণ উপস্থাপন করা হয়নি।
এই আলোচনায় অংশ নেওয়া পিটার টিকটিন বলেন, আরেকটি নির্বাচন কারচুপির মাধ্যমে পরিচালিত হলে সামরিক আইন জারি করতে হবে। টিকটিন ট্রাম্পের দীর্ঘদিনের পরিচিত এবং শৈশবের বন্ধু। তিনি ভোটের ব্যালট ও নির্বাচনী সরঞ্জামের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার সম্ভাবনার কথাও বলেছেন। তাঁর বক্তব্যে নির্বাচনের ফল নিয়ে সন্দেহ দেখা দিলে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার পক্ষে অবস্থান স্পষ্ট হয়েছে।
ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ রাজনৈতিক মহলের আরেক ব্যক্তি গ্রেগরি স্টেনস্ট্রম নির্বাচনের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তাঁর প্রস্তাবের মধ্যে ছিল নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন উঠলে নির্বাচন সাময়িকভাবে স্থগিত রাখা। বিকল্প হিসেবে তিনি জাতীয় জরুরি অবস্থা-সংক্রান্ত আইনের মাধ্যমে অঙ্গরাজ্যগুলোর নির্বাচনী ব্যবস্থায় পরিবর্তন আনার কথাও বলেছেন। তবে এসব প্রস্তাব বাস্তবায়নের জন্য আইনি ক্ষমতা রয়েছে কি না, তা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন রয়েছে।
এই বিতর্কের সঙ্গে যুক্ত রয়েছেন টিনা পিটার্সও। কলোরাডোর সাবেক এই নির্বাচনী কর্মকর্তা ২০২৪ সালে নির্বাচনী সরঞ্জামে অননুমোদিত প্রবেশসংক্রান্ত অপরাধে দোষী সাব্যস্ত হন। পরে ২০২৬ সালে কলোরাডোর গভর্নর জ্যারেড পলিস তাঁর সাজা কমিয়ে দেওয়ায় তিনি মুক্তি পান। অ্যাক্সিওসের প্রতিবেদন অনুযায়ী, পিটার্স ও তাঁর আইনজীবী টিকটিন চলতি বছরের জুনে হোয়াইট হাউসে ট্রাম্পের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছিলেন। পিটার্সের পরিকল্পনার মধ্যে কাগজের ব্যালট ব্যবহার এবং সম্ভব হলে হাতে ভোট পুনর্গণনার প্রস্তাব রয়েছে।
তবে নির্বাচনে কারচুপির অভিযোগ এবং প্রমাণিত অনিয়ম এক বিষয় নয়। যুক্তরাষ্ট্রে নির্বাচনী অনিয়মের বিচ্ছিন্ন ঘটনা ঘটতে পারে, কিন্তু আসন্ন মধ্যবর্তী নির্বাচন ব্যাপকভাবে কারচুপির শিকার হবে—এমন দাবির পক্ষে এখন পর্যন্ত নির্ভরযোগ্য প্রমাণ পাওয়া যায়নি। নির্বাচনী নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করা আর প্রমাণ ছাড়া পুরো নির্বাচনকে অবৈধ বলে দাবি করা এক নয়।
আইন বিশেষজ্ঞরাও প্রস্তাবিত পদক্ষেপের সীমাবদ্ধতার কথা তুলে ধরেছেন। ব্রেনান সেন্টারের নির্বাচনী কর্মসূচির আইনজীবী ডেরেক টিসলার অ্যাক্সিওসকে বলেছেন, জরুরি ক্ষমতা প্রেসিডেন্টকে সংবিধান ও কংগ্রেসের প্রণীত আইন অমান্য করার অবাধ অধিকার দেয় না। যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল নির্বাচনের তারিখ নির্ধারণ করে কংগ্রেস। অঙ্গরাজ্যগুলোও ফেডারেল আইনের অধীনে নিজেদের ভোট গ্রহণ ও গণনার পদ্ধতি পরিচালনা করে। ফলে প্রেসিডেন্ট একক সিদ্ধান্তে মধ্যবর্তী নির্বাচন পিছিয়ে দিতে পারেন না কিংবা সব অঙ্গরাজ্যে বাধ্যতামূলকভাবে ভোট পুনর্গণনার নির্দেশ দিতে পারেন না।
হোয়াইট হাউসও নির্বাচনী নিরাপত্তা নিয়ে নিজেদের অবস্থান জানিয়েছে। মুখপাত্র লরেন বিস এক বিবৃতিতে বলেছেন, মার্কিন নাগরিকদের এমন নির্বাচন প্রাপ্য, যা নিরাপদ, সুরক্ষিত ও স্বচ্ছ। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, প্রেসিডেন্ট চান প্রতিটি বৈধ ভোট গণনা করা হোক এবং নির্বাচনের ওপর জনগণের আস্থা বজায় থাকুক। এই বিবৃতি থেকে সামরিক আইন জারি বা নির্বাচনের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার কোনো আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্তের প্রমাণ পাওয়া যায় না।
যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক ব্যবস্থায় মধ্যবর্তী নির্বাচন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এ নির্বাচনের মাধ্যমে কংগ্রেসের প্রতিনিধি পরিষদ ও সিনেটের আসনগুলোর নিয়ন্ত্রণ নির্ধারিত হয়। কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ পরিবর্তিত হলে প্রেসিডেন্টের আইন প্রণয়ন, বাজেট অনুমোদন এবং প্রশাসনিক নীতির ওপর রাজনৈতিক প্রভাব পড়তে পারে। এ কারণে নির্বাচনের ফল, ভোটের স্বচ্ছতা এবং ক্ষমতার সাংবিধানিক সীমা নিয়ে রাজনৈতিক বিতর্ক তীব্র হয়ে উঠেছে।
ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ কয়েকজন রাজনৈতিক মিত্র নির্বাচনে কারচুপির আশঙ্কাকে সামনে রেখে সামরিক আইনসহ কঠোর পদক্ষেপের প্রস্তাব দিয়েছেন বলে অ্যাক্সিওসের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে। তবে এসব বক্তব্যকে যুক্তরাষ্ট্রে অভ্যুত্থানের সিদ্ধান্ত বা সামরিক আইন জারির নিশ্চিত পরিকল্পনা হিসেবে উপস্থাপন করা সঠিক হবে না। এখন পর্যন্ত প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, এগুলো কয়েকজন রাজনৈতিক কর্মী ও মিত্রের প্রস্তাব; ট্রাম্পের আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত নয়। আসন্ন নির্বাচনে প্রকৃত অনিয়মের কোনো অভিযোগ উঠলে তা প্রমাণ, আইন এবং নির্ধারিত নির্বাচনী প্রক্রিয়ার ভিত্তিতেই যাচাই করতে হবে।





