ব্রেকিং
মুসলিমদের ‘মোহাম্মদ’ নাম নিয়ে ট্রাম্পের কটাক্ষ, নতুন করে বিতর্করুশ তেল ইস্যুতে ভারতের ওপর শতভাগ শুল্কের হুমকি স্থগিত করলেন ট্রাম্প, স্বস্তিতে মোদি সরকারসাত দিনের আলটিমেটাম দিয়ে উত্তরায় হাসপাতাল ও কলেজে তারেক রহমানের ঝটিকা সফরইউক্রেনকে ঘিরে ট্রাম্পের কঠোর অবস্থান, ন্যাটোর সহায়তা নিয়ে বাড়ছে উদ্বেগচীনের ১৩ ফুটের দৈত্যাকার রোবট, তুলতে পারে ৫০০ কেজি ভার, প্রযুক্তিবিশ্বে তোলপাড়!

ফ্রান্সজুড়ে মূল্যবৃদ্ধির প্রতিবাদে উত্তাল রাজপথ, শিক্ষার্থী ও শ্রমিকদের সঙ্গে নামলেন ইয়েলো ভেস্ট সমর্থকেরা

নিত্যপণ্যের উচ্চ দাম, জ্বালানি ব্যয় ও শিক্ষাব্যবস্থার সংকটের প্রতিবাদে ফ্রান্সের বিভিন্ন শহরে বিক্ষোভ ছড়িয়েছে, সংঘর্ষে বাড়ছে উদ্বেগ।

ফ্রান্সজুড়ে মূল্যবৃদ্ধির প্রতিবাদে উত্তাল রাজপথ, শিক্ষার্থী ও শ্রমিকদের সঙ্গে নামলেন ইয়েলো ভেস্ট সমর্থকেরা
ফ্রান্সজুড়ে মূল্যবৃদ্ধির প্রতিবাদে উত্তাল রাজপথ, শিক্ষার্থী ও শ্রমিকদের সঙ্গে নামলেন ইয়েলো ভেস্ট সমর্থকেরা

ফ্রান্সে জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি, জ্বালানির উচ্চ দাম এবং সরকারি পরিষেবার মান নিয়ে অসন্তোষের জেরে দেশজুড়ে বিক্ষোভ হয়েছে। শনিবার রাজধানী প্যারিসসহ বিভিন্ন শহরের রাজপথে জড়ো হন শিক্ষার্থী, শ্রমিক সংগঠনের সদস্য এবং ইয়েলো ভেস্ট আন্দোলনের সমর্থকেরা। তাদের দাবির মধ্যে রয়েছে মানুষের ক্রয়ক্ষমতা রক্ষা, মজুরি ও পেনশন বৃদ্ধি, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পরিবেশ উন্নত করা এবং সাধারণ মানুষের প্রয়োজনীয় সরকারি পরিষেবা নিশ্চিত করা। বিক্ষোভের কয়েকটি স্থানে পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষ, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটেছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে বিভিন্ন এলাকায় ব্যাপক নিরাপত্তাব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। রয়টার্স ও অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসের প্রতিবেদন অনুযায়ী, এই আন্দোলন কেবল শিক্ষার্থীদের দাবিতে সীমাবদ্ধ নেই; এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ফ্রান্সের সাধারণ মানুষের দীর্ঘদিনের অর্থনৈতিক অসন্তোষ।

দেশটির বিভিন্ন অঞ্চলে শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের মধ্য দিয়ে বর্তমান পরিস্থিতির সূচনা হয়। বিশেষ করে প্যারিসের উত্তরাঞ্চলের তুলনামূলকভাবে দরিদ্র এলাকাগুলোর কয়েকটি বিদ্যালয়ে শিক্ষকসংকট, শ্রেণিকক্ষে অতিরিক্ত শিক্ষার্থী এবং দুর্বল অবকাঠামো নিয়ে ক্ষোভ বাড়তে থাকে। শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, পর্যাপ্ত শিক্ষক না থাকায় নিয়মিত পাঠদান ব্যাহত হচ্ছে। কোথাও কোথাও বিদ্যালয়ের ভবন ও শিক্ষার পরিবেশও প্রত্যাশিত মানের নয়। এসব সমস্যা সমাধানের দাবিতে শিক্ষার্থীরা বিক্ষোভ, শ্রেণি বর্জন এবং বিদ্যালয়ের প্রবেশপথ অবরোধের মতো কর্মসূচি পালন করে। পরবর্তী সময়ে তাদের দাবির সঙ্গে জীবনযাত্রার ব্যয়, সামাজিক বৈষম্য এবং সরকারি ব্যয় কমানোর নীতির বিরুদ্ধে অসন্তোষ যুক্ত হয়। ফলে আন্দোলনটি আরও বিস্তৃত রূপ নেয়।

শনিবারের বিক্ষোভে শ্রমিক সংগঠনগুলোর অংশগ্রহণ পরিস্থিতিকে নতুন মাত্রা দিয়েছে। ফ্রান্সের অন্যতম বড় শ্রমিক সংগঠন সিজিটি আন্দোলনকারীদের দাবির প্রতি সমর্থন জানিয়েছে। সংগঠনটির দাবির মধ্যে রয়েছে মজুরি ও পেনশন বৃদ্ধি, পণ্যের দাম কমানো এবং মানুষের প্রয়োজন অনুযায়ী সরকারি পরিষেবা সুরক্ষিত রাখা। শ্রমিকদের একটি অংশের বক্তব্য, কাজ করেও অনেক মানুষ সংসারের ব্যয় সামলাতে হিমশিম খাচ্ছেন। খাদ্য, জ্বালানি, বাসস্থান ও অন্যান্য নিত্যপ্রয়োজনীয় খাতে ব্যয় বাড়লে সীমিত আয়ের পরিবারগুলো সবচেয়ে বেশি চাপে পড়ে। শিক্ষার্থীদের ক্ষেত্রেও জীবনযাত্রার ব্যয় এবং শিক্ষাসংক্রান্ত খরচ বড় উদ্বেগের বিষয়। এ কারণে ভিন্ন ভিন্ন দাবিতে শুরু হওয়া আন্দোলনগুলো একই বিক্ষোভে মিলিত হয়েছে।

এই আন্দোলনে ইয়েলো ভেস্ট বা হলুদ জ্যাকেট পরা বিক্ষোভকারীদের অংশগ্রহণ বিশেষভাবে নজর কেড়েছে। ২০১৮ সালে ফ্রান্সে জ্বালানির ওপর কর বৃদ্ধি এবং জীবনযাত্রার ব্যয়ের প্রতিবাদ থেকে ইয়েলো ভেস্ট আন্দোলনের উত্থান হয়েছিল। পরবর্তী সময়ে এটি সামাজিক বৈষম্য, সরকারের অর্থনৈতিক নীতি এবং সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা নিয়ে বৃহত্তর প্রতিবাদে পরিণত হয়। সেই আন্দোলনের স্মৃতি ফিরিয়ে এনে বর্তমান বিক্ষোভকারীরা আবারও উচ্চ মূল্য এবং অর্থনৈতিক চাপের বিরুদ্ধে নিজেদের অবস্থান জানাচ্ছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আন্দোলনে অংশ নেওয়ার আহ্বান ছড়িয়ে পড়ার পাশাপাশি পুরোনো আন্দোলনের সমর্থকেরাও নতুন কর্মসূচিতে যুক্ত হওয়ার আগ্রহ দেখিয়েছেন। তবে বর্তমান বিক্ষোভকে ২০১৮ সালের আন্দোলনের সম্পূর্ণ পুনরাবৃত্তি বলা যাবে না। এবারের পরিস্থিতিতে শিক্ষাব্যবস্থা, শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা এবং সরকারি পরিষেবার সংকটও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে উঠেছে।

ফরাসি কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, শনিবার দুপুরের মধ্যে প্যারিসের বাইরের এলাকাগুলোতে ১৪০টি বিক্ষোভ কর্মসূচিতে প্রায় ৩২ হাজার ৮০০ মানুষের অংশগ্রহণ নথিভুক্ত হয়েছিল। এই সংখ্যা নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত সংগ্রহ করা তথ্যের ভিত্তিতে প্রকাশিত; সারা দিনের মোট অংশগ্রহণকারীর সংখ্যা এর চেয়ে আলাদা হতে পারে। প্যারিসসহ কয়েকটি বড় শহরে পুলিশ ও বিক্ষোভকারীদের মধ্যে সংঘর্ষের খবর পাওয়া গেছে। মার্সেই শহরে সরকারি ভবনে ভাঙচুরের ঘটনা ঘটেছে বলে কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে। কিছু স্থানে আগুন জ্বালানো, পুলিশের ওপর হামলা এবং জনসম্পত্তি ক্ষতিগ্রস্ত করার অভিযোগও উঠেছে। এসব ঘটনার কারণে বিক্ষোভের পাশাপাশি জননিরাপত্তা ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ বেড়েছে।

বিক্ষোভ মোকাবিলায় পুলিশের ভূমিকা নিয়েও ফ্রান্সে বিতর্ক চলছে। সাম্প্রতিক শিক্ষার্থী আন্দোলনের সময় কয়েকজন কিশোর গুরুতর আহত হওয়ার পর পুলিশের জনতা নিয়ন্ত্রণের পদ্ধতি নিয়ে সমালোচনা বেড়েছে। কিছু ঘটনায় পুলিশের ব্যবহৃত অস্ত্রের আঘাতে শিক্ষার্থীদের গুরুতর ক্ষতি হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। এসব ঘটনার তদন্ত চলছে এবং পুলিশের বলপ্রয়োগের যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। প্রধানমন্ত্রী সেবাস্তিয়াঁ লেকর্নুর বক্তব্য অনুযায়ী, সাম্প্রতিক আন্দোলন শুরুর পর নয় শতাধিক পুলিশ সদস্য আহত হয়েছেন। অন্যদিকে, বিক্ষোভকারীদের মধ্যেও আহত হওয়ার ঘটনা ঘটেছে। ফলে পরিস্থিতি মোকাবিলায় নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি পুলিশের কার্যক্রমের স্বচ্ছতা এবং জবাবদিহি নিশ্চিত করার দাবি জোরালো হয়েছে।

ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল মাখোঁ বিক্ষোভের অধিকারকে স্বীকৃতি দেওয়ার পাশাপাশি শান্ত থাকার এবং মানুষের জীবন ও সম্পত্তির প্রতি সম্মান দেখানোর আহ্বান জানিয়েছেন। সরকারের সামনে এখন দুটি গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ রয়েছে। একদিকে সহিংসতা ও ভাঙচুর ঠেকিয়ে জননিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে, অন্যদিকে বিক্ষোভকারীদের অর্থনৈতিক ও সামাজিক দাবির বাস্তবসম্মত সমাধান খুঁজতে হবে। শুধু কঠোর নিরাপত্তাব্যবস্থার মাধ্যমে দীর্ঘদিনের অসন্তোষ দূর করা কঠিন হতে পারে। আবার বিক্ষোভের নামে সহিংসতা ও জনসম্পত্তি ধ্বংসের ঘটনাও সাধারণ মানুষের ক্ষতি করে। এ কারণে শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদের অধিকার রক্ষা এবং আইন ভঙ্গের ঘটনায় নিরপেক্ষ তদন্ত—দুটিই গুরুত্বপূর্ণ।

অর্থনৈতিক পরিস্থিতিও সরকারের ওপর চাপ বাড়াচ্ছে। ফ্রান্সের সরকারি ঋণ এবং বাজেট নিয়ে উদ্বেগের কারণে দেশটির অর্থনৈতিক নীতি নিয়ে আগে থেকেই আলোচনা চলছে। সরকারি ব্যয় নিয়ন্ত্রণের প্রচেষ্টা, সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির ভবিষ্যৎ এবং মানুষের দৈনন্দিন ব্যয়ের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করা সরকারের জন্য কঠিন হয়ে উঠেছে। সাধারণ মানুষের একটি অংশ মনে করছে, অর্থনৈতিক নীতি নির্ধারণের সময় নিম্ন ও মধ্যম আয়ের পরিবারের বাস্তব সমস্যাগুলোকে আরও গুরুত্ব দেওয়া দরকার। বিশেষ করে তরুণদের জন্য মানসম্মত শিক্ষা, কর্মসংস্থানের সুযোগ এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে নিশ্চয়তা তৈরি করা জরুরি।

ফ্রান্সের বর্তমান বিক্ষোভ দেশটির অর্থনৈতিক চাপ, সামাজিক বৈষম্য, শিক্ষাব্যবস্থার দুর্বলতা এবং পুলিশের জবাবদিহি নিয়ে গভীর অসন্তোষের প্রতিফলন। শিক্ষার্থী, শ্রমিক এবং ইয়েলো ভেস্ট আন্দোলনের সমর্থকদের একসঙ্গে রাজপথে নামা সরকারের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা। তবে আন্দোলনের ভবিষ্যৎ নির্ভর করবে বিক্ষোভকারীদের অংশগ্রহণ কতটা অব্যাহত থাকে, সরকার কী ধরনের পদক্ষেপ নেয় এবং আলোচনার মাধ্যমে সমস্যার সমাধান কতটা সম্ভব হয় তার ওপর। মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় কমানো, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পরিবেশ উন্নত করা এবং সরকারি পরিষেবার মান বাড়ানোর ক্ষেত্রে দৃশ্যমান অগ্রগতি না এলে অসন্তোষ দীর্ঘায়িত হতে পারে। একই সঙ্গে সংঘর্ষের ঘটনাগুলোর নিরপেক্ষ তদন্ত এবং সব পক্ষের সংযম পরিস্থিতি শান্ত করার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

ট্যাগ: ফ্রান্সফ্রান্সেরবিক্ষোভদ্রব্যমূল্যবৃদ্ধিশিক্ষার্থীআন্দোলনসামাজিকবৈষম্যইয়েলোভেস্ট

প্রতিবেদক

staf reporter

Reporter

ফটোকার্ড তৈরি হচ্ছে…

সংবাদ পান আপনার ইনবক্সে

প্রতিদিন সকালে প্রধান সংবাদ, আর ব্রেকিং নিউজ ঘটার সাথে সাথে। বিনামূল্যে।