পাঁচ দিনেই বিদায়, তবু ট্রাম্পের প্রশংসায় পঞ্চমুখ কেটি জাকারিয়া
পদে যোগ দেওয়ার পাঁচ দিনের মধ্যেই বিদায় কেটি জাকারিয়ার; বিদায়বার্তায় ট্রাম্পের প্রশংসা, পেছনে রয়েছে বিতর্কিত সম্মেলন ও যোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রেস সচিবের পদ থেকে সরে যাচ্ছেন কেটি জাকারিয়া। দায়িত্ব গ্রহণের মাত্র পাঁচ দিনের মাথায় তাঁর এই বিদায়কে ঘিরে মার্কিন রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনা শুরু হয়েছে। তবে পদ ছাড়ার সময়ও প্রেসিডেন্টের প্রতি প্রকাশ্যে প্রশংসা জানিয়েছেন তিনি। বিদায়বার্তায় ট্রাম্পকে দয়ালু, চমৎকার, উদার, চিন্তাশীল, উৎসাহী ও অত্যন্ত পরিশ্রমী ব্যক্তি হিসেবে বর্ণনা করেছেন জাকারিয়া। একই সঙ্গে তাঁর দাবি, যুক্তরাষ্ট্রকে মহান করে তোলার ক্ষেত্রে ট্রাম্পের মতো অবদান আর কেউ রাখতে পারবেন না। তিনি আরও বলেন, প্রেসিডেন্টের জন্য কাজ করতে পারা ছিল তাঁর কাছে সম্মানের বিষয়।
ঘটনাটির উল্লেখযোগ্য দিক হলো, যে পদে বসার জন্য ট্রাম্পের আস্থা অর্জন করেছিলেন জাকারিয়া, সেই পদে তাঁর অবস্থান স্থায়ী হলো না এক সপ্তাহও। ৯ অক্টোবর ট্রাম্প তাঁকে হোয়াইট হাউসের নতুন প্রেস সচিব হিসেবে মনোনীত করার কথা জানান। এর আগে এই দায়িত্বে ছিলেন ক্যারোলিন লেভিট। জাকারিয়ার নিয়োগের মধ্য দিয়ে ট্রাম্প প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ সংবাদমাধ্যম-সংক্রান্ত দায়িত্বে নতুন মুখ আসেন। কিন্তু দায়িত্ব নেওয়ার পরপরই তাঁর সংবাদ সম্মেলন, পেশাগত পরিচয় এবং সাংবাদিকদের প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার ধরন নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয়। শেষ পর্যন্ত ১৬ অক্টোবর তাঁর পদ থেকে সরে যাওয়ার খবর প্রকাশ্যে আসে।
জাকারিয়ার বিদায়ের বিষয়টি সামনে আসে শুক্রবার। বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়, তিনি প্রেস সচিবের দায়িত্ব থেকে সরে যাচ্ছেন এবং প্রশাসনের ভেতরে তাঁর ভূমিকার পরিবর্তন ঘটতে পারে। তবে তাঁকে ভবিষ্যতে ঠিক কোন দায়িত্ব দেওয়া হবে, সে বিষয়ে নিশ্চিত ঘোষণা না আসা পর্যন্ত চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো সম্ভব নয়। তাঁকে পুরো প্রশাসন থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে, নাকি অন্য কোনো পদে কাজ করবেন, সেটিও আলাদাভাবে বিবেচনা করা জরুরি।
নিজের বিদায়ের আগে ট্রাম্পও সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন। তিনি জানান, জাকারিয়াকে পদটি নিয়ে নতুন করে ভাবতে পরামর্শ দিয়েছিলেন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, সংবাদমাধ্যমের কঠোর সমালোচনার মুখে জাকারিয়ার জন্য কাজটি মানসিকভাবে কঠিন হয়ে উঠেছিল। ট্রাম্প বলেন, তিনি চান জাকারিয়া সুখী থাকুন এবং এমন একটি দায়িত্বে নিজেকে জড়িয়ে না ফেলুন, যেখানে তাঁকে ক্রমাগত সমালোচনার মুখোমুখি হতে হয়। একই সঙ্গে তিনি দাবি করেন, সংবাদমাধ্যম তাঁর সঙ্গে অন্যায় আচরণ করেছে। নতুন প্রেস সচিব নিয়োগের বিষয়েও ট্রাম্প তখনই তাড়াহুড়ো করতে চাননি বলে জানান।
জাকারিয়ার সংক্ষিপ্ত দায়িত্বকালের সবচেয়ে আলোচিত ঘটনা ছিল তাঁর প্রথম সংবাদ সম্মেলন। ১৩ অক্টোবর হোয়াইট হাউসের সংবাদ সম্মেলনকক্ষে তিনি সাংবাদিকদের সামনে বক্তব্য দেন। বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, অনুষ্ঠানটি প্রায় ১৪ থেকে ১৫ মিনিট স্থায়ী হয়েছিল। তিনি মূলত ট্রাম্প প্রশাসনের কর্মকাণ্ড ও অর্জন তুলে ধরেন এবং অল্প কয়েকজন সাংবাদিকের প্রশ্নের উত্তর দেন। সংবাদ সম্মেলনটি স্বল্প সময়ে শেষ হওয়ায় এবং তাঁর বক্তব্য উপস্থাপনের ধরন নিয়ে সমালোচনা তৈরি হয়। কিছু পর্যবেক্ষক তাঁর প্রস্তুতি ও সাংবাদিকদের প্রশ্ন মোকাবিলার সক্ষমতা নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেন। তবে তিনি নিজেই বলেছিলেন, প্রেসিডেন্টের জন্য সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলার পর্যাপ্ত সময় রাখতে তিনি সংবাদ সম্মেলন সংক্ষিপ্ত রেখেছিলেন।
এরপর তাঁর পেশাগত যোগ্যতা নিয়েও প্রশ্ন ওঠে। ক্যালিফোর্নিয়ার পেপারডাইন বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগ থেকে ডিগ্রি অর্জন করলেও যুক্তরাষ্ট্রে আইনজীবী হিসেবে কাজ করার প্রয়োজনীয় পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার প্রমাণ নিয়ে বিতর্ক দেখা দেয়। জাকারিয়া বিভিন্ন সময় নিজেকে আইনজীবী হিসেবে পরিচয় দিয়েছিলেন এবং ট্রাম্পও তাঁর নিয়োগের সময় তাঁকে আইনজীবী হিসেবে উল্লেখ করেন। কিন্তু ১৫ অক্টোবর এক সাক্ষাৎকারে জাকারিয়া স্বীকার করেন, তিনি ক্যালিফোর্নিয়ার আইনজীবী নিবন্ধন পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হননি। সংবাদমাধ্যমের অনুসন্ধানেও যুক্তরাষ্ট্রের কোনো অঙ্গরাজ্য বা রাজধানী অঞ্চলে তাঁর আইনজীবী হিসেবে নিবন্ধিত থাকার তথ্য পাওয়া যায়নি। আইন বিষয়ে ডিগ্রি অর্জন করা এবং আইন পেশায় বৈধভাবে কাজ করার অনুমতি পাওয়া এক বিষয় নয়—এই পার্থক্যই বিতর্কের কেন্দ্রে উঠে আসে।
রাজনীতিতে আসার আগে জাকারিয়া ট্রাম্পের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠান ট্রাম্প মিডিয়া অ্যান্ড টেকনোলজি গ্রুপে যোগাযোগবিষয়ক উপদেষ্টা হিসেবে কাজ করেছেন। তিনি রক্ষণশীল মতাদর্শের বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমেও ভাষ্যকার হিসেবে পরিচিত ছিলেন। এ ছাড়া যুক্তরাষ্ট্রের স্বরাষ্ট্র নিরাপত্তা বিভাগে অল্প সময়ের জন্য কাজ করার অভিজ্ঞতা ছিল তাঁর। ফলে প্রশাসনের সঙ্গে তাঁর পূর্বপরিচয় থাকলেও হোয়াইট হাউসের প্রধান মুখপাত্রের মতো উচ্চপর্যায়ের দায়িত্বে তাঁর প্রস্তুতি ও অভিজ্ঞতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে।
জাকারিয়ার বিদায়বার্তায় ট্রাম্পের প্রতি যে প্রশংসা দেখা গেছে, তা তাঁর সংক্ষিপ্ত কর্মকালকে ঘিরে তৈরি হওয়া বিতর্কের সঙ্গে এক ভিন্ন চিত্র তুলে ধরেছে। তিনি শুধু প্রেসিডেন্টের ব্যক্তিগত গুণাবলির প্রশংসাই করেননি, বরং যুক্তরাষ্ট্রকে মহান করে তোলার ক্ষেত্রে তাঁর অবদানকে অনন্য বলেও উল্লেখ করেছেন। তবে এই বক্তব্যকে ট্রাম্প প্রশাসনের প্রতি তাঁর ব্যক্তিগত সমর্থনের প্রকাশ হিসেবে দেখা যেতে পারে; এটি তাঁর পদ ছাড়ার কারণ সম্পর্কে স্বাধীন প্রমাণ নয়। তাঁর প্রশংসার ভাষা এবং পদ ছাড়ার সময়কাল পাশাপাশি থাকায় ঘটনাটি রাজনৈতিক সংবাদমাধ্যমে বিশেষ মনোযোগ পেয়েছে।
কেটি জাকারিয়ার বিদায় ট্রাম্প প্রশাসনের যোগাযোগব্যবস্থার জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন। প্রশাসনের নীতি, সিদ্ধান্ত ও অর্জন সংবাদমাধ্যমের কাছে তুলে ধরার দায়িত্ব অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সেই সময়ে প্রেস সচিবের পদে এমন দ্রুত পরিবর্তন প্রশাসনের সামনে নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করতে পারে। তবে তাঁর পরবর্তী দায়িত্ব কী হবে এবং নতুন প্রেস সচিব কে হবেন, সে বিষয়ে নিশ্চিত ঘোষণা না আসা পর্যন্ত চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো সম্ভব নয়। আপাতত আলোচনার কেন্দ্রে রয়েছে তাঁর অল্প সময়ের দায়িত্বকাল, পেশাগত যোগ্যতা নিয়ে বিতর্ক এবং বিদায়ের মুহূর্তেও ট্রাম্পের প্রতি প্রকাশ্য প্রশংসা।





