ব্রেকিং
মিশিগানে নির্বাচনে ৩৭ ভোট গণনায় বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত মুহিত মাহমুদ ১২ ভোটে এগিয়েপুকুরে ডুবছিল দাদি ও দুই শিশু, প্রাণ বাঁচিয়ে প্রশংসায় ভাসছে দুই কিশোর ভাইমাত্র পাঁচ দিনেই বিদায়ের মুখে কেটি, ট্রাম্পের হোয়াইট হাউসে নতুন বিতর্কনতুন প্রশাসনই যথেষ্ট! যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণ সীমান্তে অভিবাসন নিয়ন্ত্রণে ট্রাম্পের বড় দাবিমিয়ানমারের সামরিক সরকারের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের গোপন বৈঠক, বাংলাদেশের সীমান্তে কী প্রভাব পড়বে?

মিশিগানে নির্বাচনে ৩৭ ভোট গণনায় বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত মুহিত মাহমুদ ১২ ভোটে এগিয়ে

দীর্ঘ আইনি লড়াইয়ের পর ৩৭টি বিতর্কিত ভোট গণনায় এগিয়ে গেছেন মুহিত মাহমুদ। তবে মেয়র পদে তাঁর জয় এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে চূড়ান্ত হয়নি।

মিশিগানে নির্বাচনে ৩৭ ভোট গণনায় বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত মুহিত মাহমুদ ১২ ভোটে এগিয়ে
মিশিগানে নির্বাচনে ৩৭ ভোট গণনায় বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত মুহিত মাহমুদ ১২ ভোটে এগিয়ে

যুক্তরাষ্ট্রের মিশিগান অঙ্গরাজ্যের হ্যামট্রাম্যাক শহরের মেয়র নির্বাচন ঘিরে প্রায় এক বছর ধরে চলা বিতর্কে নতুন মোড় এসেছে। গত বছরের নির্বাচনে অল্প ভোটের ব্যবধানে পরাজিত বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত প্রার্থী মুহিত মাহমুদ এবার নতুন গণনায় বর্তমান মেয়র আদম আলহারবিকে পেছনে ফেলেছেন। দীর্ঘ আইনি লড়াইয়ের পর আগে গণনা না হওয়া ৩৭টি ডাকযোগে দেওয়া ভোট গণনা করায় পাল্টে গেছে নির্বাচনের হিসাব। নতুন অনানুষ্ঠানিক ফলাফলে মুহিত পেয়েছেন ২ হাজার ৮৯ ভোট, আর আদম পেয়েছেন ২ হাজার ৭৭ ভোট। অর্থাৎ মুহিত এগিয়ে রয়েছেন ১২ ভোটে। তবে এই ফলাফল এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে চূড়ান্ত হয়নি। মুহিতের শহরে বসবাসের যোগ্যতা নিয়ে চলমান মামলাসহ একাধিক আইনি জটিলতা থাকায় মেয়র পদে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের জন্য অপেক্ষা করতে হচ্ছে।

১৬ অক্টোবর ওয়েন কাউন্টির নির্বাচনসংক্রান্ত দায়িত্বপ্রাপ্ত বোর্ডের তত্ত্বাবধানে বিতর্কিত ৩৭টি ভোট গণনা করা হয়। যুক্তরাষ্ট্রের স্থানীয় সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৫ সালের নভেম্বরে অনুষ্ঠিত নির্বাচনের পর এসব ভোট শহরের নির্বাচনী কর্মকর্তার দপ্তরে পাওয়া যায়। ভোটগুলো নির্ধারিত সময়ের মধ্যে মূল গণনায় যুক্ত না হওয়ায় প্রথম থেকেই প্রশ্ন ওঠে নির্বাচনী ব্যবস্থাপনা ও ভোটের নিরাপত্তা নিয়ে। পরবর্তী সময়ে আদালতে মামলা গড়ালে প্রায় এক বছর ধরে বিষয়টি আইনি প্রক্রিয়ার মধ্যে আটকে থাকে।

প্রাথমিক ফলাফলে আদম আলহারবি মুহিত মাহমুদের চেয়ে অল্প ব্যবধানে এগিয়ে ছিলেন। পরবর্তী পুনর্গণনায়ও আদমের জয় বহাল থাকে। ২০২৫ সালের ডিসেম্বরের পুনর্গণনায় আদমের ভোট দাঁড়ায় ২ হাজার ৭১ এবং মুহিতের ভোট ছিল ২ হাজার ৬০। তখন আদম ১১ ভোটের ব্যবধানে এগিয়ে ছিলেন। কিন্তু আগে বাদ পড়া ৩৭টি ভোট গণনার পর পুরো চিত্র পাল্টে যায়। নতুন গণনায় মুহিতের ভোট বেড়ে দাঁড়ায় ২ হাজার ৮৯, আর আদমের ভোট দাঁড়ায় ২ হাজার ৭৭। ফলে এত দিন ধরে চলা নির্বাচনী বিরোধে মুহিত প্রথমবারের মতো ভোটের হিসাবে এগিয়ে গেলেন।

এই ৩৭টি ভোট কেন এত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠল, তার পেছনে রয়েছে নির্বাচনী ব্যবস্থাপনার একটি গুরুতর প্রশ্ন। ভোটের পরদিন শহরের তৎকালীন নির্বাচনী কর্মকর্তা রানা ফারাজ দপ্তরে থাকা কিছু খাম পরীক্ষা করতে গিয়ে দেখতে পান, ৩৭টি ডাকযোগে আসা ভোটের খাম খোলা থাকলেও সেগুলোর ভেতরের ভোট গণনায় অন্তর্ভুক্ত হয়নি। বিষয়টি জানাজানি হওয়ার পর ভোটগুলো কীভাবে সংরক্ষিত ছিল, সেগুলোর নিরাপত্তা বজায় ছিল কি না এবং অনুমোদনহীন কেউ সেগুলোর কাছে পৌঁছেছিলেন কি না, তা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়।

নির্বাচনী ব্যবস্থায় ভোটের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য ভোট গ্রহণ থেকে শুরু করে গণনা পর্যন্ত প্রতিটি ধাপে কে ভোটের দায়িত্বে ছিলেন, কোথায় ভোট রাখা হয়েছিল এবং কীভাবে সেগুলো এক স্থান থেকে অন্য স্থানে নেওয়া হয়েছে, তার ধারাবাহিক হিসাব রাখা জরুরি। এই ধারাবাহিকতা ক্ষতিগ্রস্ত হলে ভোটের সত্যতা ও নির্ভরযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিতে পারে। হ্যামট্রাম্যাকের বিতর্কিত ভোটগুলোর ক্ষেত্রেও এমন উদ্বেগ সামনে আসে। নির্বাচনী কর্মকর্তাদের দপ্তরে অনুমোদনহীন ব্যক্তিদের প্রবেশের অভিযোগ ওঠায় সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ ভোটগুলোর নিরাপত্তা নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেছিল।

মুহিত মাহমুদ এসব ভোট গণনার দাবিতে আদালতের দ্বারস্থ হন। তাঁর পক্ষের যুক্তি ছিল, ভোটাররা নিয়ম মেনে ভোট দিয়ে থাকলে প্রশাসনিক ভুলের কারণে তাঁদের ভোট গণনার বাইরে রাখা উচিত নয়। কারণ, অল্প ভোটের ব্যবধানের নির্বাচনে কয়েক ডজন ভোটও চূড়ান্ত ফল নির্ধারণ করে দিতে পারে। এ ক্ষেত্রে ৩৭টি ভোটের সংখ্যা দুই প্রার্থীর মধ্যকার ব্যবধানের চেয়ে অনেক বেশি হওয়ায় বিরোধটি আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।

মামলার প্রথম পর্যায়ে আদালত বিতর্কিত ভোট গণনার দাবি গ্রহণ করেনি। তবে পরবর্তী সময়ে আপিল আদালত আগের সিদ্ধান্ত পাল্টে বিষয়টি পুনর্বিবেচনার পথ তৈরি করে। এরপর নিম্ন আদালতের নির্দেশে ভোটগুলো গণনার প্রক্রিয়া এগিয়ে যায়। ২০২৬ সালের অক্টোবরের শুরুতে আদালত ১৬ অক্টোবরের মধ্যে ভোট গণনার নির্দেশ দেন। সেই নির্দেশের পর ওয়েন কাউন্টির সংশ্লিষ্ট বোর্ড ভোটগুলো যাচাই করে গণনা করে এবং নতুন অনানুষ্ঠানিক ফলাফল প্রকাশ করে।

নতুন ফলাফল ঘোষণার পর মুহিত মাহমুদ সমর্থকদের সামনে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন। তাঁর বক্তব্যের মূল সুর ছিল, বিষয়টি শুধু জয়-পরাজয়ের নয়; ভোটারের অধিকার এবং গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার প্রতি সম্মান নিশ্চিত করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। প্রায় এক বছর ধরে চলা এই বিরোধে ভোট গণনার সুযোগ তৈরি হওয়াকে তিনি ভোটারদের অধিকার প্রতিষ্ঠার পথে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে দেখছেন। তবে নতুন গণনায় এগিয়ে যাওয়ার অর্থ এই নয় যে তিনি ইতিমধ্যে আনুষ্ঠানিকভাবে মেয়র হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের অধিকার পেয়েছেন।

বর্তমান মেয়র আদম আলহারবি নতুন ফলাফল মেনে নিতে রাজি নন। তিনি এবং তাঁর আইনজীবী বিতর্কিত ভোটগুলোর গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। তাঁদের বক্তব্য, ভোটগুলো যেভাবে পাওয়া গিয়েছিল এবং সংরক্ষণ করা হয়েছিল, তাতে সেগুলোর নিরাপত্তা নিয়ে সন্দেহ রয়েছে। আদমের পক্ষ থেকে ভোটগুলোর বৈধতা চ্যালেঞ্জ করার পরিকল্পনার কথাও জানানো হয়েছে। ফলে ভোট গণনা শেষ হলেও এ নিয়ে আইনি বিরোধ আরও বাড়তে পারে।

এখানেই শেষ নয়। মুহিত মাহমুদের শহরে বসবাসের যোগ্যতা নিয়েও আলাদা মামলা চলছে। অভিযোগ করা হয়েছে, মেয়র পদে প্রার্থী হওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় শর্ত অনুযায়ী তিনি হ্যামট্রাম্যাক শহরে বসবাস করেন না। অভিযোগের বিপরীতে মুহিত জানিয়েছেন, তিনি শহরেই বসবাস করেন, যদিও ট্রয় শহরে তাঁর আরেকটি বাড়ি রয়েছে এবং পরিবারের সঙ্গে সেখানে সময় কাটান। এই অভিযোগ এখনো আদালতে চূড়ান্তভাবে নিষ্পত্তি হয়নি। তাই তাঁকে মেয়র হিসেবে ঘোষণা করা যাবে কি না, তা শুধু ভোটের হিসাবের ওপর নির্ভর করছে না; বসবাসের যোগ্যতা নিয়েও আইনি সিদ্ধান্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

স্থানীয় সংবাদমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, বসবাসের যোগ্যতা নিয়ে মামলার পরবর্তী শুনানি ২২ অক্টোবর ২০২৬ তারিখে ওয়েন কাউন্টির সার্কিট আদালতে নির্ধারিত রয়েছে। এই শুনানি নির্বাচনের ভবিষ্যৎ নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। সংশ্লিষ্ট বোর্ডের পক্ষ থেকেও জানানো হয়েছে, মামলাটি চলমান থাকায় নতুন ভোটের হিসাব এখনই আনুষ্ঠানিকভাবে প্রত্যয়ন করা যাচ্ছে না। অর্থাৎ মুহিত ভোটের হিসাবে এগিয়ে থাকলেও চূড়ান্ত আইনি সিদ্ধান্ত না আসা পর্যন্ত নির্বাচনের ফলাফল নিয়ে অনিশ্চয়তা বজায় থাকবে।

হ্যামট্রাম্যাক শহরটি ডেট্রয়েটের কাছাকাছি অবস্থিত এবং সেখানে বাংলাদেশি ও ইয়েমেনি বংশোদ্ভূত মানুষের উল্লেখযোগ্য বসবাস রয়েছে। স্থানীয় রাজনীতিতে দুই সম্প্রদায়েরই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা আছে। এই নির্বাচনে মুহিত মাহমুদ বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন, আর আদম আলহারবি ইয়েমেনি বংশোদ্ভূত মার্কিন নাগরিক। ফলে নির্বাচনের ফলাফল নিয়ে স্থানীয় বাসিন্দাদের আগ্রহের পাশাপাশি প্রবাসী বাংলাদেশিদের মধ্যেও ব্যাপক আলোচনা তৈরি হয়েছে।

মুহিত জয়ী হলে হ্যামট্রাম্যাকের প্রথম বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত মেয়র হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে বলে সংবাদমাধ্যমগুলো উল্লেখ করেছে। তবে তাঁর মেয়র হওয়া এখনো নিশ্চিত নয়। ভোটের হিসাবে এগিয়ে থাকা, ফলাফল আনুষ্ঠানিকভাবে প্রত্যয়ন করা এবং মেয়র হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ—এগুলো নির্বাচনী প্রক্রিয়ার পৃথক ধাপ। আদালতের রায়, ভোটের বৈধতা নিয়ে সম্ভাব্য আপত্তি এবং বসবাসের যোগ্যতার মামলার নিষ্পত্তি এই তিনটি বিষয়ই চূড়ান্ত ফলাফলে প্রভাব ফেলতে পারে।

সব মিলিয়ে, হ্যামট্রাম্যাকের মেয়র নির্বাচন এখন যুক্তরাষ্ট্রের স্থানীয় নির্বাচনে ভোট গণনা, প্রশাসনিক জবাবদিহি এবং ভোটারের অধিকার নিয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ হয়ে উঠেছে। ৩৭টি ভোটের কারণে প্রায় এক বছর আগের নির্বাচনের ফলাফল পাল্টে যাওয়ার পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। মুহিত মাহমুদ আপাতত ১২ ভোটে এগিয়ে থাকলেও আদম আলহারবির আইনি চ্যালেঞ্জ এবং বসবাসের যোগ্যতা নিয়ে মামলার নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত এই লড়াইয়ের চূড়ান্ত পরিণতি জানা যাচ্ছে না। এখন স্থানীয় বাসিন্দা ও প্রবাসী বাংলাদেশিদের নজর আদালতের পরবর্তী শুনানি এবং নির্বাচনী কর্তৃপক্ষের আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্তের দিকে।


ট্যাগ: মুহিত মাহমুদহ্যামট্রাম্যাক নির্বাচনমিশিগান সংবাদবাংলাদেশি প্রবাসীযুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতিমেয়র নির্বাচনআদম আলহারবিবিতর্কিত ভোটভোট পুনর্গণনানির্বাচনী মামলাপ্রবাসী বাংলাদেশিভোটারের অধিকার

প্রতিবেদক

Desk Report

Reporter

ফটোকার্ড তৈরি হচ্ছে…

সংবাদ পান আপনার ইনবক্সে

প্রতিদিন সকালে প্রধান সংবাদ, আর ব্রেকিং নিউজ ঘটার সাথে সাথে। বিনামূল্যে।