ব্রেকিং
নিউইয়র্কে শীতের জ্বালানি বিলে ৯৯০ ডলার পর্যন্ত সহায়তা, আবেদন শুরু ২ নভেম্বরজুলাই সনদের সংস্কার কি থমকে যাচ্ছে? ২৩ অধ্যাদেশ ঘিরে নতুন প্রশ্নপাঁচ দিনেই বিদায়, তবু ট্রাম্পের প্রশংসায় পঞ্চমুখ কেটি জাকারিয়ালস অ্যাঞ্জেলেসের দাবানলে সর্বস্ব হারানো ১,৪০০ পরিবার, বন্ধের শঙ্কায় পুনর্বাসন সহায়তানিউইয়র্কে ট্রাম্পবিরোধী বিক্ষোভের ডাক, যানজটের আশঙ্কায় সতর্ক নগরবাসী

জুলাই সনদের সংস্কার কি থমকে যাচ্ছে? ২৩ অধ্যাদেশ ঘিরে নতুন প্রশ্ন

জুলাই সনদের সংস্কার বাস্তবায়ন নিয়ে নতুন বিতর্ক। ১৬টি অধ্যাদেশ অনুমোদন পায়নি, বাতিল হয়েছে সাতটি; সরকার ও বিরোধীদের মধ্যে বাড়ছে মতবিরোধ।

জুলাই সনদের সংস্কার কি থমকে যাচ্ছে? ২৩ অধ্যাদেশ ঘিরে নতুন প্রশ্ন
জুলাই সনদের সংস্কার কি থমকে যাচ্ছে? ২৩ অধ্যাদেশ ঘিরে নতুন প্রশ্ন

জুলাই গণঅভ্যুত্থানের আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়ন, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান সংস্কার এবং ক্ষমতার ভারসাম্য প্রতিষ্ঠার প্রতিশ্রুতি নিয়ে স্বাক্ষরিত জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়ন ঘিরে নতুন করে রাজনৈতিক বিতর্ক তৈরি হয়েছে। অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে জারি করা সংস্কারসংক্রান্ত কয়েকটি অধ্যাদেশ বর্তমান সরকারের আমলে অনুমোদন না পাওয়া ও বাতিলের ঘটনায় সংস্কার কার্যক্রমের ভবিষ্যৎ নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। বিরোধী দলগুলোর অভিযোগ, জুলাই সনদ বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে সরকার জনগণের প্রত্যাশা থেকে সরে যাচ্ছে। অন্যদিকে সরকার বলছে, সনদের প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে, তবে সাংবিধানিক পরিবর্তন করতে হবে সংসদীয় প্রক্রিয়ায়।

প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, অন্তর্বর্তী সরকারের জারি করা মোট ১৩৩টি অধ্যাদেশের মধ্যে ১৬টি বর্তমান সরকার অনুমোদন করেনি এবং আরও সাতটি বাতিল করেছে। এসব অধ্যাদেশের কয়েকটি বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, দুর্নীতি দমন, মানবাধিকার সুরক্ষা, গুমের বিচার এবং পুলিশি ব্যবস্থার সংস্কারের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের সঙ্গে সম্পর্কিত ছিল। ফলে সংস্কার কার্যক্রমের ধারাবাহিকতা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করছেন বিরোধী রাজনৈতিক পক্ষগুলো। তবে সব অধ্যাদেশ একই ধরনের ছিল না এবং অনুমোদন না পাওয়া কিংবা বাতিল হওয়া প্রতিটি বিধানের বর্তমান আইনি অবস্থাও এক নয়।

সংস্কারসংক্রান্ত যেসব পদক্ষেপ নিয়ে বেশি আলোচনা হচ্ছে, তার মধ্যে রয়েছে সুপ্রিম কোর্টের বিচারক নিয়োগ, সুপ্রিম কোর্টের পৃথক সচিবালয় প্রতিষ্ঠা, দুর্নীতি দমন কমিশন, জাতীয় মানবাধিকার কমিশন এবং পুলিশ কমিশনসংক্রান্ত ব্যবস্থা। বিরোধী পক্ষের বক্তব্য, এসব উদ্যোগের উদ্দেশ্য ছিল রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে আরও স্বাধীন, জবাবদিহিমূলক ও কার্যকর করা। সেগুলোর কোনোটি বাতিল বা অনুমোদন না পাওয়ায় সংস্কারের গতি কমে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। সরকার অবশ্য জানিয়েছে, প্রয়োজনীয় পর্যালোচনা ও পরামর্শের পর সংশ্লিষ্ট কিছু বিষয় নতুন করে বিল আকারে আনার উদ্যোগ রয়েছে।

জুলাই জাতীয় সনদে পৌঁছানোর প্রক্রিয়াটি ছিল দীর্ঘ রাজনৈতিক আলোচনার ফল। ২০২৫ সালের মার্চ থেকে অক্টোবর পর্যন্ত জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের উদ্যোগে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সঙ্গে রাষ্ট্রব্যবস্থার সংস্কার নিয়ে আলোচনা হয়। সংবিধান, নির্বাচনব্যবস্থা, বিচার বিভাগ, জনপ্রশাসন, পুলিশ এবং দুর্নীতি দমন ব্যবস্থার পরিবর্তন ছিল আলোচনার গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। ওই আলোচনার ভিত্তিতে ৮৪টি সংস্কার প্রস্তাব নিয়ে জুলাই জাতীয় সনদ চূড়ান্ত করা হয়। ২০২৫ সালের ১৭ অক্টোবর জাতীয় সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায় বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধিরা এতে স্বাক্ষর করেন। সনদটির উদ্দেশ্য ছিল রাষ্ট্র পরিচালনায় জবাবদিহি বাড়ানো এবং ভবিষ্যতে কর্তৃত্ববাদী শাসনের পুনরাবৃত্তি ঠেকাতে প্রাতিষ্ঠানিক পরিবর্তনের পথ তৈরি করা।

পরবর্তী সময়ে সনদের সাংবিধানিক সংস্কার বাস্তবায়নের পদ্ধতি নিয়ে সরকার ও বিরোধী দলের মধ্যে মতবিরোধ দেখা দেয়। ২০২৫ সালের ১৩ নভেম্বর তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়ন আদেশ জারি করেন। ওই আদেশের আওতায় ২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি জাতীয় নির্বাচনের সঙ্গে গণভোট আয়োজন করা হয়। নির্ধারিত কাঠামো অনুযায়ী, নির্বাচিত সংসদ সদস্যদের সংসদ সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবেও কাজ করার কথা ছিল। পরিষদটির মাধ্যমে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে সাংবিধানিক সংস্কার বাস্তবায়নের পরিকল্পনা করা হয়েছিল।

কিন্তু নির্বাচনের পর এ প্রক্রিয়া নিয়ে অচলাবস্থা তৈরি হয়। ক্ষমতাসীন বিএনপির সংসদ সদস্যরা সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে অতিরিক্ত শপথ নিতে রাজি হননি। তাঁদের যুক্তি, বিদ্যমান সংবিধানে এ ধরনের পরিষদের বিধান নেই। অন্যদিকে জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন বিরোধী জোটের সদস্যরা অতিরিক্ত শপথ নিয়ে গণভোটের রায় ও বাস্তবায়ন আদেশ কার্যকর করার দাবি জানান। ফলে প্রস্তাবিত সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠিত হয়নি। সরকার এর পরিবর্তে সংসদীয় বিশেষ কমিটির মাধ্যমে সংস্কার প্রস্তাব পর্যালোচনা ও প্রয়োজনীয় সংশোধনী তৈরির উদ্যোগ নেয়। বিরোধীরা এ ব্যবস্থাকে সনদে নির্ধারিত কাঠামোর বিকল্প হিসেবে মেনে নিতে আপত্তি জানায়।

এই বিরোধের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো বাস্তবায়ন আদেশের বৈধতা। ২০২৬ সালের ৩১ মার্চ সংসদে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ আদেশটিকে শুরু থেকেই আইনগতভাবে অকার্যকর বলে অভিহিত করেন। তাঁর যুক্তি, ১৯৭৩ সালে প্রথম জাতীয় সংসদ গঠনের পর রাষ্ট্রপতির ওই ধরনের আদেশ জারির বিশেষ ক্ষমতা আর বহাল ছিল না। বিরোধী দলগুলো এ অবস্থানের সঙ্গে একমত নয়। তাদের বক্তব্য, গণভোটের মাধ্যমে জনগণ যে সংস্কারপ্রক্রিয়ার প্রতি সমর্থন জানিয়েছে, তা পাশ কাটিয়ে শুধু সংসদীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতার ভিত্তিতে সংবিধান সংশোধন করলে জনগণের রায়ের যথাযথ প্রতিফলন ঘটবে না। এ নিয়ে রাজনৈতিক ও আইনগত বিতর্ক এখনও অব্যাহত রয়েছে।

অন্যদিকে সরকার জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়নের অঙ্গীকার থেকে সরে আসেনি বলে দাবি করছে। ২০২৬ সালের ২০ সেপ্টেম্বর স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জানান, সনদে স্বাক্ষরকারী রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে আলোচনা করে সংস্কার প্রস্তাবের সুপারিশ তৈরি করা হবে। ডিসেম্বরের মধ্যে আলোচনা শেষ করে সংসদে প্রতিবেদন দেওয়ার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। এরপর প্রয়োজনীয় সাংবিধানিক সংশোধনী বিল সংসদে উত্থাপন করে বিস্তারিত আলোচনা ও বিতর্কের মাধ্যমে তা পাসের উদ্যোগ নেওয়ার কথা জানানো হয়। ১৩ অক্টোবরও তিনি বিরোধী দলগুলোর সঙ্গে ঐকমত্যের ভিত্তিতে সংস্কার করার আগ্রহ প্রকাশ করেন, তবে বিরোধীরা অংশ না নিলেও সরকার প্রক্রিয়া এগিয়ে নেবে বলে জানান।

এদিকে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিয়ে কাজ করা ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ সনদের প্রথম বর্ষপূর্তিতে সংস্কারপ্রক্রিয়া নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। প্রতিষ্ঠানটির বক্তব্য অনুযায়ী, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর জবাবদিহিমূলক শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা এবং রাষ্ট্রীয় সংস্কারের যে সুযোগ তৈরি হয়েছিল, তা ক্ষমতার রাজনীতি ও আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। প্রতিষ্ঠানটি রাজনৈতিক দলগুলোকে সনদে ঐকমত্যে পৌঁছানোর সময়কার সদিচ্ছা বজায় রাখার আহ্বান জানিয়েছে।

সব মিলিয়ে, জুলাই সনদ ঘিরে বর্তমান পরিস্থিতিকে শুধু সনদ বাতিলের ঘটনা হিসেবে বর্ণনা করা যথাযথ হবে না। এখানে একদিকে রয়েছে সংস্কারসংক্রান্ত কিছু অধ্যাদেশ অনুমোদন না পাওয়া ও বাতিল হওয়ার বাস্তবতা, অন্যদিকে রয়েছে সনদের সাংবিধানিক অংশ বাস্তবায়নের পদ্ধতি নিয়ে রাজনৈতিক ও আইনগত বিরোধ। সরকার বলছে, সংসদের মাধ্যমে সংস্কার বাস্তবায়ন করা হবে; বিরোধীরা চাইছে গণভোটে অনুমোদিত কাঠামো অনুসরণ করা হোক। কোন প্রস্তাব শেষ পর্যন্ত আইনে পরিণত হবে, কোন সংস্কার নতুনভাবে আনা হবে এবং কোনগুলো বাদ পড়বে তা নির্ভর করছে পরবর্তী সংসদীয় আলোচনা ও আইন প্রণয়নের ওপর।

তাই ‘জুলাই জাতীয় সনদ পুরোপুরি বাতিল’ বলা যাচাই করা তথ্যের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। বরং কিছু সংস্কার উদ্যোগ বাতিল বা স্থগিত হওয়া এবং বাস্তবায়নপ্রক্রিয়া নিয়ে গভীর রাজনৈতিক বিরোধ তৈরি হওয়াই বর্তমান পরিস্থিতির মূল চিত্র।


ট্যাগ: জুলাইসনদেরসংস্কারথমকেযাচ্ছেঅধ্যাদেশ

ফটোকার্ড তৈরি হচ্ছে…

সংবাদ পান আপনার ইনবক্সে

প্রতিদিন সকালে প্রধান সংবাদ, আর ব্রেকিং নিউজ ঘটার সাথে সাথে। বিনামূল্যে।