লস অ্যাঞ্জেলেসের দাবানলে সর্বস্ব হারানো ১,৪০০ পরিবার, বন্ধের শঙ্কায় পুনর্বাসন সহায়তা
দাবানলে ঘর হারানো প্রায় ১,৪০০ পরিবার অক্টোবরের শেষে ব্যক্তিগত পুনর্বাসন সহায়তাকারীদের হারাতে পারে, অর্থায়ন নিয়ে অচলাবস্থায় বাড়ছে অনিশ্চয়তা।
যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়া অঙ্গরাজ্যের লস অ্যাঞ্জেলেস অঞ্চলে ২০২৫ সালের ভয়াবহ দাবানলে ক্ষতিগ্রস্ত প্রায় ১,৪০০ পরিবার নতুন করে অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে। রাজ্য সরকার ও কেন্দ্রীয় দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের মধ্যে অর্থায়ন নিয়ে অমীমাংসিত পরিস্থিতির কারণে অক্টোবরের শেষে এসব পরিবার ব্যক্তিগত পুনর্বাসন সহায়তাকারীদের সেবা হারাতে পারে। ঘরবাড়ি পুনর্নির্মাণ, বিমার টাকা আদায়, আর্থিক সহায়তা পাওয়া এবং অস্থায়ী আবাসনের ব্যবস্থা করতে গিয়ে যখন পরিবারগুলো এখনো সংগ্রাম করছে, তখন এই সহায়তা বন্ধ হওয়ার আশঙ্কা তাদের উদ্বেগ বাড়িয়েছে। ১৬ অক্টোবর প্রকাশিত মার্কিন সংবাদ সংস্থা এপির প্রতিবেদনে এসব তথ্য জানানো হয়েছে।
দাবানলে ক্ষতিগ্রস্ত আলতাডেনার ৭৮ বছর বয়সী অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষিকা মেরি ল্যান্ডাউ এই সংকটের অন্যতম উদাহরণ। প্রায় ৫০ বছর ধরে যে বাড়িতে তিনি বসবাস করেছেন, ২০২৫ সালের ইটন দাবানলে সেটি ধ্বংস হয়ে যায়। এরপর থেকে বাড়িটি পুনর্নির্মাণের চেষ্টা করছেন তিনি। এই কঠিন সময়ে তাঁর পাশে রয়েছেন দুর্যোগ-পরবর্তী পুনর্বাসন সহায়তাকারী ভেদা অ্যাশবি রোমেরো। বিমার কাগজপত্র পূরণ, আর্থিক সহায়তার আবেদন এবং বিভিন্ন সরকারি সুবিধা পাওয়ার প্রক্রিয়ায় তিনি ল্যান্ডাউকে সহযোগিতা করছেন।
ল্যান্ডাউয়ের জন্য এই সহযোগিতা শুধু কাগজপত্র পূরণের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; এটি মানসিক শক্তি ফিরে পাওয়ারও একটি মাধ্যম। এপিকে তিনি জানিয়েছেন, তাঁর সহায়তাকারী তাঁকে বারবার সাহস জুগিয়েছেন এবং কঠিন পরিস্থিতি সামলে ওঠার আশ্বাস দিয়েছেন। কিন্তু অক্টোবরের শেষে কর্মসূচিটি বন্ধ হয়ে গেলে এই নিয়মিত সহায়তা আর পাওয়া যাবে না এমন আশঙ্কা তাঁকে বিচলিত করছে।
২০২৫ সালের জানুয়ারিতে লস অ্যাঞ্জেলেস অঞ্চলে ইটন ও প্যালিসেডস দাবানল ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ চালায়। আগুনে ১৬ হাজারের বেশি স্থাপনা ধ্বংস হয়। বহু পরিবার ঘরবাড়ি হারিয়ে অস্থায়ী আবাসনে আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়। প্রায় ২০ মাস পেরিয়ে গেলেও অনেক বাসিন্দার পুনর্গঠনকাজ শেষ হয়নি। বিমার অর্থ পেতে বিলম্ব, বাড়ি তৈরির বিপুল ব্যয়, ঋণের কিস্তি এবং সরকারি সহায়তার জটিল আবেদনপ্রক্রিয়া তাদের দুর্ভোগ দীর্ঘায়িত করছে।
এই পরিস্থিতিতে দুর্যোগ-পরবর্তী ব্যক্তিগত সহায়তা কর্মসূচি ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর জন্য গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। প্রশিক্ষিত সহায়তাকারীরা বাসাভাড়ার সহায়তা, নতুন কর্মসংস্থান, বিমার অর্থ আদায়, পুনর্নির্মাণের জন্য আর্থিক ঘাটতি পূরণ এবং সরকারি সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আপিল করার ক্ষেত্রে পরিবারগুলোকে পথ দেখান। বিমা থেকে পাওয়া অর্থ দিয়ে বাড়ি পুনর্নির্মাণের সম্পূর্ণ ব্যয় মেটানো সম্ভব না হলে কোথায় অতিরিক্ত সহায়তা পাওয়া যেতে পারে, সে বিষয়েও তাঁরা পরামর্শ দেন। প্রতারণা এড়ানো এবং জটিল সরকারি আবেদন সঠিকভাবে সম্পন্ন করতেও তাঁদের সহযোগিতা গুরুত্বপূর্ণ।
ক্যালিফোর্নিয়া কর্তৃপক্ষ প্রথমে এই কর্মসূচির জন্য প্রায় ২ কোটি ৮০ লাখ ডলার চেয়েছিল। তবে কেন্দ্রীয় দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা সংস্থা ২৪ মাসের জন্য ১ কোটি ৩২ লাখ ডলার অনুমোদন করে। অর্থ চার কিস্তিতে দেওয়ার পরিকল্পনা ছিল। ক্যালিফোর্নিয়ার সামাজিক পরিষেবা বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, অর্থ ফেরত পেতে বারবার আবেদন করার পরও অর্থ ছাড়ে বিলম্ব হয়েছে। পরে বকেয়া অর্থের পরিশোধ করা হলেও কর্মসূচিটি পুরো মেয়াদ চালানোর জন্য অতিরিক্ত ৬৫ লাখ ডলারের আবেদনের বিষয়ে ১৬ অক্টোবর পর্যন্ত কোনো চূড়ান্ত উত্তর পাওয়া যায়নি বলে এপি জানিয়েছে।
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, অনুমোদিত সব অর্থ এখনো আটকে আছে এমন দাবি সঠিক নয়। গত ৩০ সেপ্টেম্বর আইনপ্রণেতাদের চাপের পর কেন্দ্রীয় কর্তৃপক্ষ আগে অনুমোদিত অর্থের ৬৬ লাখ ডলার ছাড় করে। তবে ওই অর্থ ছাড়ের পরও অতিরিক্ত অর্থায়ন এবং কর্মসূচির ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়ে গেছে। লস অ্যাঞ্জেলেস কাউন্টির প্রশাসনিক কর্মকর্তারা ৬ অক্টোবর জানিয়েছিলেন, আগামী ২০ অক্টোবর কাউন্টি পরিষদে এমন একটি উদ্যোগ তোলার পরিকল্পনা রয়েছে, যাতে কেন্দ্রীয় অর্থায়ন না এলে কাউন্টি ক্ষতিগ্রস্তদের সহায়তা চালিয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা বিবেচনা করতে পারে।
বর্তমান সংকট শুধু ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর জন্য নয়, সহায়তা কর্মীদের জন্যও উদ্বেগজনক। এপির প্রতিবেদন অনুযায়ী, কর্মসূচি বন্ধ হলে শতাধিক সহায়তাকারীর চাকরি চলে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। পাঁচটি অলাভজনক প্রতিষ্ঠান বর্তমানে কর্মসূচিটি পরিচালনায় যুক্ত। তারা সীমিত অনুদান ও অন্যান্য বেসরকারি অর্থায়নের মাধ্যমে কিছু পরিবারকে অন্য প্রতিষ্ঠানের কাছে স্থানান্তর করার চেষ্টা করছে। কিন্তু সব পরিবারের জন্য বিকল্প সহায়তা নিশ্চিত করার মতো পর্যাপ্ত অর্থ নেই। একটি প্রতিষ্ঠান ইতিমধ্যে তুলনামূলক কম জটিল কিছু মামলা বন্ধ করেছে এবং নিজেদের ৪৫০টি পরিবারের মধ্যে ২০০টির দায়িত্ব অন্য প্রতিষ্ঠানের কাছে হস্তান্তরের চেষ্টা করছে।
এদিকে প্রায় ৭০০ পরিবার এখনো ব্যক্তিগত পুনর্বাসন সহায়তা পাওয়ার অপেক্ষমাণ তালিকায় রয়েছে। অর্থাৎ কর্মসূচি অব্যাহত থাকলেও চাহিদা পূরণের ক্ষেত্রে ঘাটতি রয়েছে। কংগ্রেস সদস্য জুডি চু সতর্ক করেছেন, প্রয়োজনীয় অর্থায়ন নিশ্চিত না হলে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষকে পুনরুদ্ধারের কঠিন প্রক্রিয়ায় একা ফেলে দেওয়ার ঝুঁকি তৈরি হবে। তিনি কর্মসূচির জন্য অতিরিক্ত অর্থ ছাড় এবং প্রয়োজনে এর মেয়াদ বাড়ানোর আহ্বান জানিয়েছেন।
কেন্দ্রীয় সরকার ও ক্যালিফোর্নিয়া প্রশাসনের মধ্যে বৃহত্তর পুনর্গঠন সহায়তা নিয়েও মতবিরোধ রয়েছে। ক্যালিফোর্নিয়ার গভর্নর গ্যাভিন নিউসম ক্ষতিগ্রস্ত অঞ্চল পুনর্গঠনের জন্য ১৫৭০ কোটি ডলারের অতিরিক্ত কেন্দ্রীয় সহায়তা চেয়েছেন। হোয়াইট হাউসের পক্ষ থেকে রাজ্য প্রশাসনের ব্যবস্থাপনা নিয়ে সমালোচনা করা হয়েছে এবং বলা হয়েছে, লস অ্যাঞ্জেলেসের পুনরুদ্ধারে ইতিমধ্যে বিপুল অর্থ বরাদ্দ করা হয়েছে। ফলে অর্থায়ন নিয়ে বিরোধটি প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক বিতর্কেরও অংশ হয়ে উঠেছে।
লস অ্যাঞ্জেলেসের দাবানলে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর পুনর্বাসন এখনো অসম্পূর্ণ। আগে অনুমোদিত অর্থের একটি অংশ ছাড়া হলেও অতিরিক্ত অর্থায়ন নিয়ে সিদ্ধান্ত না আসায় প্রায় ১,৪০০ পরিবারের সহায়তা অক্টোবরের শেষে বন্ধ হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। তবে কর্মসূচি নিশ্চিতভাবেই বন্ধ হয়ে গেছে এমন কথা এখনই বলা যাবে না। ২০ অক্টোবর লস অ্যাঞ্জেলেস কাউন্টির সম্ভাব্য উদ্যোগ এবং কেন্দ্রীয় কর্তৃপক্ষের পরবর্তী সিদ্ধান্ত পরিস্থিতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ হবে।





