নেত্রকোণায় সাংবাদিক আলিফ ফকিরকে গুলি করে হত্যা, ময়নাতদন্তে মিলল ছয়টি ক্ষতের চিহ্ন
নেত্রকোণার দুর্গাপুরে সাংবাদিক লুৎফুজ্জামান আলিফ ফকিরকে গুলি করে হত্যা করেছে দুর্বৃত্তরা। ময়নাতদন্তে তাঁর শরীরে ছয়টি গুলির ক্ষত পাওয়া গেছে। হামলাকারীদের পরিচয় ও হত্যার উদ্দেশ্য এখনো নিশ্চিত হয়নি।
নেত্রকোণার দুর্গাপুরে সাংবাদিক লুৎফুজ্জামান আলিফ ফকিরকে গুলি করে হত্যার ঘটনায় এলাকাজুড়ে চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। বৃহস্পতিবার (১৫ অক্টোবর) রাত সোয়া আটটার দিকে শ্যামগঞ্জ-বিরিশিরি সড়কের তেলনজিয়া বাজার এলাকায় এ হত্যাকাণ্ড ঘটে। নিহত আলিফ ফকির বেসরকারি আইপিটিভি চ্যানেল রূপসী বাংলার নেত্রকোণা প্রতিনিধি হিসেবে কর্মরত ছিলেন। পাশাপাশি তিনি ‘ডিটেকটিভ আর্টিকেল’ নামে একটি ফেসবুক পেজ পরিচালনা করতেন, যেখানে বিভিন্ন অনিয়ম ও অপরাধের বিষয়ে লেখালেখি করতেন।
পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রের বরাতে জানা গেছে, ঘটনার সময় আলিফ ফকির বাজারের একটি দোকানের কাছে ছিলেন। প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য অনুযায়ী, দুই যুবক সেখানে এসে তাঁকে লক্ষ্য করে একাধিক গুলি ছোড়ে। গুলির শব্দ শুনে আশপাশের লোকজন এগিয়ে এলে হামলাকারীরা মোটরসাইকেলে করে পালিয়ে যায়। পরে গুরুতর আহত অবস্থায় আলিফকে দুর্গাপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে যাওয়া হলে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাঁকে মৃত ঘোষণা করেন।
ঘটনার পর পুলিশ হত্যাকাণ্ডের তদন্ত শুরু করে। দুর্গাপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা খন্দকার শাকের আহমদ খান জানান, নিহত সাংবাদিকের মাথা, গলা ও বুকসহ শরীরের বিভিন্ন স্থানে গুলির ক্ষত পাওয়া গেছে। ঘটনাস্থল থেকে গুলির খোসাও উদ্ধার করা হয়। হামলাকারীদের শনাক্ত ও গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে বলে পুলিশ জানিয়েছে।
শুক্রবার (১৬ অক্টোবর) ময়নাতদন্তের পর নিহত সাংবাদিকের শরীরে ছয়টি গুলির ক্ষত পাওয়ার তথ্য প্রকাশিত হয়। ময়নাতদন্তকারী চিকিৎসক শ্রদ্ধ্যানন্দ নাথ জানান, পাঁচটি গুলি শরীর ভেদ করে বেরিয়ে যায় এবং একটি গুলি পিঠের ভেতরে আটকে ছিল, যা ময়নাতদন্তের সময় উদ্ধার করা হয়। ক্ষতগুলোর ধরন পর্যবেক্ষণ করে প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হয়েছে, তাঁকে সামনের দিক থেকে গুলি করা হয়ে থাকতে পারে।
নিহত আলিফ ফকিরের গ্রামের বাড়ি নেত্রকোণার কলমাকান্দা উপজেলার পোগলা ইউনিয়নের সুনই গ্রামে। তাঁর শ্বশুরবাড়ি দুর্গাপুরের তেলনজিয়া এলাকায়। সাংবাদিকতার পাশাপাশি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিভিন্ন অনিয়ম ও অপরাধের ঘটনা তুলে ধরতেন তিনি। তাঁর কাজের সঙ্গে হত্যাকাণ্ডের কোনো সম্পর্ক রয়েছে কি না, তা তদন্তের মাধ্যমে নিশ্চিত হওয়া প্রয়োজন।
এর আগে ২০২৫ সালের ১০ নভেম্বর দুর্গাপুরের সোমেশ্বরী নদীর তেরিবাজার ঘাট এলাকায় আলিফ ফকির দুর্বৃত্তদের হামলার শিকার হয়েছিলেন। ওই ঘটনায় তাঁকে কুপিয়ে আহত করা হয়েছিল। তাঁর সঙ্গে থাকা এক সহকর্মী বাধা দিতে গেলে তাঁকেও অস্ত্র দেখিয়ে ধাওয়া করা হয় বলে সে সময়ের সংবাদ প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছিল। আগের হামলার সঙ্গে এবারের হত্যাকাণ্ডের কোনো যোগসূত্র রয়েছে কি না, সে বিষয়ে নিশ্চিত সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর মতো তথ্য এখনো প্রকাশিত হয়নি।
একজন সাংবাদিকের ওপর এমন প্রাণঘাতী হামলা সাংবাদিকদের নিরাপত্তা এবং অপরাধ ও অনিয়মের খবর প্রকাশের স্বাধীনতা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে। তবে হত্যার পেছনে কারা রয়েছে, কী উদ্দেশ্যে হামলা চালানো হয়েছে এবং আগের ঘটনার সঙ্গে এর কোনো সম্পর্ক আছে কি না—এসব প্রশ্নের উত্তর তদন্তের মাধ্যমেই বেরিয়ে আসবে।
এ ঘটনায় জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্ত করা, হত্যার প্রকৃত কারণ উদ্ঘাটন এবং আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া এখন গুরুত্বপূর্ণ। পুলিশি তদন্তের অগ্রগতি ও আনুষ্ঠানিক বক্তব্যের ভিত্তিতেই পরবর্তী তথ্য নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।





