মাত্র পাঁচ দিনেই বিদায়ের মুখে কেটি, ট্রাম্পের হোয়াইট হাউসে নতুন বিতর্ক
৬ মিনিটে পড়ুন
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসনে নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে হোয়াইট হাউসের মুখপাত্র কেটি জাকারিয়ার আকস্মিক বিদায়ের খবর। দায়িত্ব নেওয়ার মাত্র কয়েক দিনের মাথায় তাঁকে এই পদ থেকে সরিয়ে দেওয়া হচ্ছে বলে একাধিক সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে। ফক্স নিউজের সাংবাদিক পিটার ডুসি এক জ্যেষ্ঠ হোয়াইট হাউস কর্মকর্তার বরাতে জানিয়েছেন, জাকারিয়া তাঁর বর্তমান পদ থেকে সরে যাচ্ছেন। অন্যদিকে, রয়টার্স ও অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসের প্রতিবেদনেও তাঁর ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তার কথা উঠে এসেছে।
শুক্রবার, ১৬ অক্টোবর, হোয়াইট হাউস থেকে জর্জিয়া অঙ্গরাজ্যে রাজনৈতিক সমাবেশে যোগ দিতে যাওয়ার আগে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন ট্রাম্প। এ সময় তিনি জাকারিয়ার কাজের চাপ, সংবাদমাধ্যমের সমালোচনা এবং এই পদে তাঁর থাকা উচিত কি না, তা নিয়ে নিজের উদ্বেগের কথা জানান। ট্রাম্পের বক্তব্যের পরপরই জাকারিয়ার পদ ছাড়ার খবর সামনে আসে। শুরুতে বিষয়টি ছিল তাঁর ভবিষ্যৎ নিয়ে সংশয়; পরে একাধিক সংবাদমাধ্যম জানায়, তিনি আর এই দায়িত্বে থাকছেন না।
তবে এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য রয়েছে। জাকারিয়ার পদত্যাগের ঘোষণা, নতুন পদে নিয়োগ কিংবা প্রশাসনের অন্য কোনো দায়িত্বে তাঁর যোগদানের বিষয়ে বিস্তারিত আনুষ্ঠানিক ঘোষণা এখনো স্পষ্ট নয়। হোয়াইট হাউসের কর্মকর্তার বরাতে তাঁকে বর্তমান পদ থেকে সরে যাওয়ার প্রক্রিয়ায় থাকার কথা জানানো হয়েছে। তাই তাঁকে অন্য কোনো দায়িত্ব দেওয়া হচ্ছে—এমন সিদ্ধান্তকে নিশ্চিত তথ্য হিসেবে উপস্থাপন করা ঠিক হবে না।
জাকারিয়ার এই আকস্মিক বিদায়ের পেছনে সবচেয়ে বড় আলোচনার বিষয় হয়ে উঠেছে তাঁর প্রথম সংবাদ সম্মেলন এবং আইনজীবী হিসেবে তাঁর যোগ্যতা নিয়ে বিতর্ক। গত ১৩ অক্টোবর হোয়াইট হাউসের সংবাদ সম্মেলনকক্ষে প্রথমবারের মতো সাংবাদিকদের মুখোমুখি হন তিনি। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টের সরকারি বক্তব্য, প্রশাসনের নীতি এবং বিভিন্ন সিদ্ধান্ত সম্পর্কে সাংবাদিকদের প্রশ্নের উত্তর দেওয়াই এই পদের প্রধান দায়িত্ব। কিন্তু প্রথম দিন থেকেই জাকারিয়ার উপস্থাপনা, প্রস্তুতি এবং সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাব দেওয়ার ধরন নিয়ে সমালোচনা শুরু হয়।
ট্রাম্পের প্রশাসনের পক্ষ থেকে প্রথম সংবাদ সম্মেলনকে ইতিবাচকভাবে তুলে ধরার চেষ্টা করা হলেও সংবাদমাধ্যমের একাংশ তাঁর সংক্ষিপ্ত বক্তব্য ও সীমিত প্রশ্নোত্তর নিয়ে প্রশ্ন তোলে। অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসের প্রতিবেদন অনুযায়ী, তিনি অল্প কয়েকটি প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার পর সংবাদ সম্মেলন শেষ করেন। ফলে এত গুরুত্বপূর্ণ একটি দায়িত্ব পালনের জন্য তিনি কতটা প্রস্তুত ছিলেন, তা নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয়।
তবে সংবাদ সম্মেলনের প্রস্তুতি নিয়ে জাকারিয়া নিজেও ব্যাখ্যা দিয়েছেন। অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসকে দেওয়া বক্তব্যে তিনি জানান, প্রথম সংবাদ সম্মেলনের প্রস্তুতির জন্য খুব বেশি সময় পাননি। আগের দিন দেরিতে প্রয়োজনীয় তথ্য হাতে পাওয়া এবং শেষ মুহূর্তে প্রস্তুতি সম্পন্ন করার বিষয়টিও সামনে আসে। পরে তিনি স্বীকার করেন, পেছন ফিরে দেখলে প্রশ্নোত্তর শুরু করার আগে নিজের পরিচয় দিয়ে বক্তব্য শেষ করাই হয়তো ভালো হতো। এরপর বিতর্ক আরও বাড়ে তাঁর আইনজীবী হিসেবে পরিচয় ও পেশাগত যোগ্যতা নিয়ে। ট্রাম্প তাঁকে নিয়োগ দেওয়ার সময় আইনজীবী হিসেবে পরিচয় করিয়ে দিয়েছিলেন। জাকারিয়া পেপারডাইন বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন অনুষদে পড়াশোনা করেছেন এবং আইন বিষয়ে ডিগ্রি অর্জন করেছেন। কিন্তু পরবর্তী প্রতিবেদনে জানা যায়, তিনি যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়া অঙ্গরাজ্যের আইনজীবীদের নিবন্ধন পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হননি। এ কারণে তাঁর আইনজীবী হিসেবে পেশাগত অবস্থান নিয়ে প্রশ্ন ওঠে।
এ বিষয়ে জাকারিয়ার বক্তব্যও সামনে এসেছে। তিনি বলেছেন, তিনি নিজেকে এমনভাবে উপস্থাপন করেননি, যাতে বোঝায় যে তিনি যুক্তরাষ্ট্রে নিবন্ধিত আইনজীবী হিসেবে আদালতে আইন পেশা পরিচালনা করছেন। তাঁর ব্যাখ্যায়, আইন বিষয়ে পড়াশোনা ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক আইনসংক্রান্ত কাজের অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে তিনি নিজের পরিচয় দিয়েছেন। চীনে যাওয়ার পরিকল্পনা এবং সেখানে তাঁর পেশাগত ভবিষ্যৎ নিয়ে করা মন্তব্যও আলোচনায় আসে। ফলে বিষয়টি কেবল তাঁর সংবাদ সম্মেলনের দক্ষতার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি; তাঁর পরিচয় ও যোগ্যতা নিয়েও জনসমক্ষে বিতর্ক ছড়িয়েছে। অন্যদিকে, ট্রাম্প জাকারিয়ার বিরুদ্ধে সংবাদমাধ্যমের আচরণকে কঠোর বলে বর্ণনা করেছেন। সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলার সময় তিনি জানান, জাকারিয়াকে তিনি বলেছেন, এই কাজের জন্য তাঁকে এতটা মানসিক চাপ নিতে হবে কি না, তা ভেবে দেখতে। ট্রাম্পের বক্তব্য অনুযায়ী, তিনি চান জাকারিয়া ভালো থাকুন এবং ব্যক্তিগত জীবনেও সুখী থাকুন। তাঁর ভাষ্য, গত কয়েক দিনে জাকারিয়াকে যেভাবে সমালোচনার মুখে পড়তে হয়েছে, তা তিনি ন্যায্য মনে করেন না। ট্রাম্প আরও বলেছেন, জাকারিয়ার প্রতি সংবাদমাধ্যমের আচরণ অন্যায্য ছিল। তাঁর মতে, নতুন দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই জাকারিয়াকে অতিরিক্ত চাপের মধ্যে রাখা হয়েছে। তবে সংবাদমাধ্যমের সমালোচনার কারণ হিসেবে শুধু ব্যক্তিগত আক্রমণের বিষয়টি সামনে আসেনি; তাঁর প্রথম সংবাদ সম্মেলন এবং আইনজীবী পরিচয় নিয়ে প্রশ্নও প্রতিবেদনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছে। অর্থাৎ, বিতর্কের একদিকে রয়েছে সংবাদমাধ্যমের সমালোচনার ধরন, অন্যদিকে রয়েছে একজন সরকারি মুখপাত্রের যোগ্যতা, প্রস্তুতি ও জবাবদিহির প্রশ্ন।
জাকারিয়ার নিয়োগও ছিল আলোচিত। গত ৯ অক্টোবর ট্রাম্প তাঁকে হোয়াইট হাউসের মুখপাত্র হিসেবে মনোনীত করার কথা জানান। এর আগে তিনি ট্রাম্পের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠান ট্রাম্প মিডিয়া অ্যান্ড টেকনোলজি গ্রুপে জ্যেষ্ঠ যোগাযোগ উপদেষ্টা হিসেবে কাজ করেছেন। পাশাপাশি রক্ষণশীল রাজনৈতিক ধারার টেলিভিশন আলোচনায় অংশ নিয়েছেন এবং ট্রাম্পের রাজনৈতিক অবস্থানের প্রতি সমর্থন জানিয়েছেন। এর আগে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের স্বরাষ্ট্র নিরাপত্তা বিভাগের মুখপাত্র হিসেবেও স্বল্প সময়ের জন্য কাজ করেছিলেন।
এই পটভূমিতে তাঁকে মুখপাত্র হিসেবে নিয়োগ দেওয়ার সময় ট্রাম্পের আস্থার বিষয়টি বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছিল। কিন্তু সেই আস্থার পরও এত অল্প সময়ের মধ্যে তাঁর ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হওয়ায় প্রশাসনের যোগাযোগব্যবস্থা নিয়ে নতুন প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। হোয়াইট হাউসের মুখপাত্রের কাজ শুধু প্রেসিডেন্টের বক্তব্য তুলে ধরা নয়; প্রশাসনের সিদ্ধান্ত সম্পর্কে প্রশ্নের উত্তর দেওয়া, নীতিগত অবস্থান ব্যাখ্যা করা এবং সাংবাদিকদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ বজায় রাখাও তাঁর দায়িত্বের অংশ। জাকারিয়ার আগে এই পদে ছিলেন ক্যারোলিন লেভিট। তিনি দায়িত্ব ছাড়ার পর ট্রাম্প প্রশাসনের বিভিন্ন কর্মকর্তা পর্যায়ক্রমে সাংবাদিকদের প্রশ্নের উত্তর দিয়েছেন। জাকারিয়াকে নতুন মুখপাত্র হিসেবে নিয়োগ দেওয়ার মাধ্যমে প্রশাসন আবার একজন নির্দিষ্ট ব্যক্তির হাতে নিয়মিত সংবাদ সম্মেলনের দায়িত্ব তুলে দিয়েছিল। কিন্তু তাঁর স্বল্পস্থায়ী দায়িত্বকাল সেই পরিকল্পনাকে নতুন অনিশ্চয়তার মুখে ফেলেছে।
এদিকে শুক্রবার জর্জিয়া অঙ্গরাজ্যের উদ্দেশে রওনা হন ট্রাম্প। সেখানে রিপাবলিকান দলের রাজনৈতিক সমাবেশে অংশ নিয়ে আসন্ন মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে দলীয় প্রার্থীদের সমর্থন দেওয়ার কথা রয়েছে তাঁর। এই সফরের সময়ই জাকারিয়ার ভবিষ্যৎ নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। ফলে একদিকে নির্বাচনী প্রচার, অন্যদিকে হোয়াইট হাউসের যোগাযোগব্যবস্থায় সম্ভাব্য পরিবর্তন—দুটি বিষয় একই দিনে যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক আলোচনায় গুরুত্ব পেয়েছে।
জাকারিয়া ভবিষ্যতে ট্রাম্প প্রশাসনের অন্য কোনো পদে কাজ করবেন কি না, তা এখনো নিশ্চিত নয়। তাঁর অভিজ্ঞতা ও দক্ষতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ অন্য দায়িত্বে তাঁকে রাখা হতে পারে—এমন সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা থাকলেও নির্দিষ্ট পদ বা নিয়োগের তথ্য প্রকাশিত হয়নি। একইভাবে, তাঁর বর্তমান পদ থেকে সরে যাওয়ার প্রক্রিয়ার চূড়ান্ত প্রশাসনিক বিবরণও স্পষ্ট হওয়া প্রয়োজন। সব মিলিয়ে, কেটি জাকারিয়ার বিদায়ের খবর ট্রাম্প প্রশাসনের জন্য একটি উল্লেখযোগ্য ঘটনা। কারণ, হোয়াইট হাউসের মুখপাত্রের পদে তাঁর যাত্রা শুরু হয়েছিল প্রেসিডেন্টের প্রকাশ্য আস্থা ও প্রশংসার মধ্য দিয়ে। অথচ কয়েক দিনের মধ্যেই প্রথম সংবাদ সম্মেলন, পেশাগত যোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন এবং সংবাদমাধ্যমের সমালোচনাকে কেন্দ্র করে তাঁর ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত হয়ে পড়ে। সর্বশেষ প্রতিবেদন অনুযায়ী, তিনি আর এই পদে থাকছেন না বলেই ইঙ্গিত মিলছে। তবে প্রশাসনের পরবর্তী আনুষ্ঠানিক ঘোষণা না আসা পর্যন্ত তাঁর ভবিষ্যৎ দায়িত্ব সম্পর্কে নিশ্চিত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যাবে না।