কিয়েভে রুশ ক্ষেপণাস্ত্র হামলার আগে মিত্রদের সতর্কবার্তা পায়নি ইউক্রেন, জানালেন জেলেনস্কি
কিয়েভে রুশ ক্ষেপণাস্ত্র হামলার আগে মিত্রদের সতর্কবার্তা না পাওয়ার অভিযোগ জেলেনস্কির। প্রাণ বাঁচাতে গোয়েন্দা তথ্য বিনিময় জোরদারের আহ্বান জানিয়েছেন ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট।
ইউক্রেনের রাজধানী কিয়েভে রাশিয়ার ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলার আগে মিত্রদেশগুলোর কাছ থেকে কোনো আগাম সতর্কবার্তা পায়নি বলে জানিয়েছেন দেশটির প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি। তাঁর এই বক্তব্য নতুন করে আন্তর্জাতিক গোয়েন্দা তথ্য বিনিময়, বেসামরিক নাগরিকদের নিরাপত্তা এবং ইউক্রেনকে সামরিক সহায়তা দেওয়ার বিষয়গুলো সামনে নিয়ে এসেছে। মঙ্গলবার প্রকাশিত আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, সোমবার রাতে কিয়েভে চালানো হামলায় পাঁচটি ক্ষেপণাস্ত্র বেসামরিক অবকাঠামোয় আঘাত হানে।
জেলেনস্কি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া বক্তব্যে হামলাটিকে অত্যন্ত নিন্দনীয় বলে উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, রাশিয়ার ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণের বিষয়ে আগাম গোয়েন্দা তথ্য পাওয়া মানুষের জীবন রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। তাঁর মতে, সম্ভাব্য হামলার বিষয়ে সময়মতো সতর্ক করা গেলে সাধারণ মানুষকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া এবং প্রাণহানি কমানোর সুযোগ তৈরি হয়।
ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট স্পষ্ট করে জানিয়েছেন, কিয়েভে হামলার আগে মিত্রদের কাছ থেকে প্রয়োজনীয় আগাম সতর্কবার্তা পাওয়া যায়নি। তবে তিনি এই পরিস্থিতির জন্য কোনো নির্দিষ্ট মিত্রদেশকে সরাসরি দায়ী করেননি। কেন সতর্কবার্তা পাওয়া যায়নি, তা নিয়ে বিভিন্ন প্রশ্ন তৈরি হলেও ঘটনাটির পেছনে ইচ্ছাকৃতভাবে গোয়েন্দা তথ্য আটকে রাখার বিষয়টি নিশ্চিত হয়নি।
রয়টার্সের প্রতিবেদন অনুযায়ী, হামলার সময় কিয়েভে বিস্ফোরণের শব্দ শোনার পর বিমান হামলার সতর্কসংকেত বেজে ওঠে। ইউক্রেনের বিমানবাহিনীও জানিয়েছে, ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণ সম্পর্কে আগাম তথ্য তারা পায়নি এবং বিষয়টি তদন্ত করে দেখছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, রাশিয়ার ছোড়া পাঁচটি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র রাজধানীর বেসামরিক অবকাঠামোয় আঘাত হানে।
এই ঘটনা এমন এক সময়ে ঘটল, যখন ইউক্রেন ও রাশিয়ার মধ্যে জ্বালানি অবকাঠামোয় হামলা বন্ধ রাখার সম্ভাব্য সমঝোতা নিয়ে আলোচনা চলছে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এর আগে দুই দেশের মধ্যে জ্বালানি স্থাপনায় হামলা বন্ধ রাখার একটি সমঝোতার কথা জানিয়েছিলেন। তবে রাশিয়ার পক্ষ থেকে এ ধরনের সমঝোতার বিষয়ে স্পষ্ট ও আনুষ্ঠানিক নিশ্চয়তা পাওয়া যায়নি। রুশ কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, এ বিষয়ে যোগাযোগ অব্যাহত রয়েছে।
জেলেনস্কির দাবি, যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টের ঘোষণার পর ইউক্রেন দুই দিন ধরে রাশিয়ার তেল শোধনাগার বা জ্বালানি স্থাপনায় হামলা চালায়নি। কিন্তু তাঁর অভিযোগ, এই সময়েও রাশিয়া ইউক্রেনের জ্বালানি স্থাপনা ও গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোয় হামলা চালিয়েছে। এ বিষয়ে ইউক্রেনের বক্তব্য এবং রাশিয়ার অবস্থান আলাদাভাবে বিবেচনা করা প্রয়োজন। যুদ্ধের মধ্যে উভয় পক্ষের দাবি যাচাই করতে স্বাধীন তথ্য ও নির্ভরযোগ্য প্রতিবেদন গুরুত্বপূর্ণ।
এদিকে ইউক্রেনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আন্দ্রি সিবিহা বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে তাঁদের গোয়েন্দা সহযোগিতা অব্যাহত রয়েছে। তিনি ইঙ্গিত দিয়েছেন, কিয়েভে হামলার আগে সতর্কবার্তা না পাওয়ার বিষয়টি রাশিয়ার ব্যবহৃত নির্দিষ্ট ধরনের অস্ত্রের সঙ্গে সম্পর্কিত হতে পারে। ফলে এই ঘটনাকে যুক্তরাষ্ট্র বা অন্য কোনো মিত্রের গোয়েন্দা সহযোগিতা পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যাওয়ার প্রমাণ হিসেবে দেখা যাচ্ছে না।
কিয়েভের পাশাপাশি ইউক্রেনের অন্যান্য এলাকাতেও হামলার খবর পাওয়া গেছে। জেলেনস্কির দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, সোমবার সন্ধ্যা থেকে পরবর্তী সময়ে রাশিয়া শতাধিক বিভিন্ন ধরনের অস্ত্র ব্যবহার করে হামলা চালিয়েছে। উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় খারকিভ শহরে একটি আবাসিক ভবন ধসে চারজন নিহত হয়েছেন এবং ৪১ জন আহত হয়েছেন বলে তিনি জানিয়েছেন। দেশটির বিভিন্ন এলাকায় ক্ষয়ক্ষতি ও হতাহতের খবরও পাওয়া গেছে।
ইউক্রেনের জন্য আগাম সতর্কবার্তা বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ, কারণ ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র খুব অল্প সময়ে লক্ষ্যবস্তুতে পৌঁছাতে পারে। ফলে হামলার পূর্বাভাস পাওয়ার জন্য গোয়েন্দা তথ্য, উপগ্রহভিত্তিক নজরদারি এবং দ্রুত সতর্কসংকেত ব্যবস্থা অত্যন্ত প্রয়োজনীয়। ইউক্রেনের সামরিক সক্ষমতা বাড়ানোর পাশাপাশি বেসামরিক মানুষকে নিরাপদ রাখার ক্ষেত্রেও এসব ব্যবস্থার গুরুত্ব রয়েছে।
জেলেনস্কি আন্তর্জাতিক অংশীদারদের রাশিয়ার ওপর কার্যকর চাপ প্রয়োগের আহ্বান জানিয়েছেন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, যুদ্ধের উত্তেজনা কমাতে হলে কেবল কূটনৈতিক আলোচনা নয়, হামলা বন্ধের বাস্তব পদক্ষেপও প্রয়োজন। একই সঙ্গে তিনি ইউক্রেনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপ এবং অন্যান্য মিত্রের সহযোগিতার গুরুত্ব তুলে ধরেছেন।
কিয়েভে হামলার আগে সতর্কবার্তা না পাওয়ার ঘটনা ভবিষ্যতে ইউক্রেনের সঙ্গে মিত্রদেশগুলোর গোয়েন্দা তথ্য বিনিময় কীভাবে আরও কার্যকর করা যায়, সেই প্রশ্নকে সামনে এনেছে। তবে হামলার বিষয়ে আগাম তথ্য কেন পাওয়া যায়নি, তার পূর্ণাঙ্গ ব্যাখ্যা তদন্ত ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বক্তব্যের ওপর নির্ভর করছে। যুদ্ধের পরিস্থিতিতে বেসামরিক মানুষের প্রাণ রক্ষা এবং সংঘাতের বিস্তার ঠেকানোই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোর একটি।





