পাসপোর্টেও ট্রাম্পের ছবি, যুক্তরাষ্ট্রে রাষ্ট্রীয় পরিচয় নিয়ে নতুন বিতর্ক
যুক্তরাষ্ট্রের স্বাধীনতার আড়াইশ বছর পূর্তি উপলক্ষে বিশেষ পাসপোর্টে ট্রাম্পের ছবি ও স্বাক্ষর যুক্ত হওয়ায় দেশজুড়ে শুরু হয়েছে নতুন আলোচনা ও বিতর্ক।
যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় পরিচয়ের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দলিল পাসপোর্টে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ছবি ও স্বাক্ষর যুক্ত করাকে কেন্দ্র করে নতুন করে আলোচনা তৈরি হয়েছে। দেশটির স্বাধীনতার আড়াইশ বছর পূর্তি উপলক্ষে বিশেষ নকশার পাসপোর্ট চালু করেছে মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর। এতে একদিকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠার ইতিহাস ও জাতীয় প্রতীক তুলে ধরা হয়েছে, অন্যদিকে বর্তমান প্রেসিডেন্টের প্রতিকৃতি যুক্ত হওয়ায় দলিলটির নিরপেক্ষতা ও রাজনৈতিক ব্যবহার নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
২০২৬ সালের ৪ জুলাই যুক্তরাষ্ট্রের স্বাধীনতার আড়াইশ বছর পূর্তি উদযাপিত হয়েছে। এই ঐতিহাসিক উপলক্ষ স্মরণীয় করে রাখতে বিশেষ পাসপোর্ট তৈরির উদ্যোগ নেয় দেশটির পররাষ্ট্র দপ্তর। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, বিশেষ সংস্করণটির প্রচ্ছদ, ভেতরের পৃষ্ঠা এবং পেছনের অংশে নতুন চিত্র ও নকশা ব্যবহার করা হয়েছে। সাধারণ পাসপোর্টের তুলনায় এর সবচেয়ে আলোচিত বৈশিষ্ট্য হলো, ভেতরের একটি পাতায় প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের বড় প্রতিকৃতি এবং তাঁর স্বাক্ষর সংযোজন।
বিশেষ পাসপোর্টের বাইরের প্রচ্ছদ গাঢ় নীল রঙের। এতে সোনালি অক্ষরে যুক্তরাষ্ট্রের নাম এবং পাসপোর্ট পরিচিতি তুলে ধরা হয়েছে। মাঝখানে রয়েছে দেশটির সরকারি সিল। ভেতরের প্রচ্ছদে ট্রাম্পের প্রতিকৃতির সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রের লেখা এবং জাতীয় পতাকার রং ব্যবহার করা হয়েছে। অন্য একটি পাতায় স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র স্বাক্ষরের ঐতিহাসিক দৃশ্য তুলে ধরা হয়েছে। পেছনের প্রচ্ছদে যুক্তরাষ্ট্রের আড়াইশ বছর পূর্তি উপলক্ষে তৈরি বিশেষ প্রতীক রাখা হয়েছে।
মার্কিন প্রশাসনের বক্তব্য অনুযায়ী, এই বিশেষ সংস্করণের উদ্দেশ্য দেশের স্বাধীনতার ইতিহাস এবং জাতীয় ঐতিহ্যকে স্মরণ করা। তবে প্রেসিডেন্টের ব্যক্তিগত প্রতিকৃতি রাষ্ট্রীয় পরিচয়পত্রে যুক্ত করার বিষয়টি রাজনৈতিক বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। সমালোচকদের মতে, পাসপোর্ট কেবল ভ্রমণের অনুমতিপত্র নয়; এটি নাগরিকের পরিচয় এবং রাষ্ট্রের প্রতিনিধিত্বকারী গুরুত্বপূর্ণ দলিল। তাই সেখানে দায়িত্বে থাকা কোনো প্রেসিডেন্টের ছবি সংযোজন রাষ্ট্রীয় প্রতীককে ব্যক্তিকেন্দ্রিক করে তোলার ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
এ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন মার্কিন আইনপ্রণেতাদের কয়েকজনও। ২০২৬ সালের মে মাসে পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিওকে পাঠানো এক চিঠিতে তাঁরা বিশেষ পাসপোর্টে দায়িত্বে থাকা প্রেসিডেন্টের ছবি ব্যবহারের পরিকল্পনা নিয়ে আপত্তি জানান। তাঁদের বক্তব্য ছিল, দেশের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উদযাপনের সঙ্গে কোনো একজন নেতার ব্যক্তিগত পরিচিতিকে যুক্ত করলে জাতীয় ঐক্যের প্রতীক রাজনৈতিক প্রচারের মাধ্যম হয়ে উঠতে পারে। তবে এই আপত্তি থাকলেও বিশেষ পাসপোর্ট চালুর সরকারি সিদ্ধান্ত কার্যকর হয়েছে।
এই বিতর্কের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, বিশেষ পাসপোর্টটি যুক্তরাষ্ট্রের সব নাগরিকের জন্য বাধ্যতামূলক করা হয়নি। পররাষ্ট্র দপ্তরের প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, এটি সীমিত সংখ্যায় তৈরি স্মারক সংস্করণ। প্রথমে নির্দিষ্ট স্থানে আবেদন করার সুযোগ থাকলেও পরে দেশজুড়ে আরও আবেদনকারীর কাছে এটি পৌঁছে দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়। সরকারি ঘোষণা অনুযায়ী, এ ধরনের মোট আড়াই লাখ পাসপোর্ট দেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়েছে।
তবে এই বিশেষ পাসপোর্ট পেতে সাধারণ আবেদনপদ্ধতি অনুসরণ করলেই হবে না। সরকারি নির্দেশনা অনুযায়ী, অনলাইনে আবেদন, ডাকযোগে আবেদন কিংবা সাধারণ পাসপোর্ট গ্রহণকেন্দ্রে আবেদন করলে এই স্মারক সংস্করণ পাওয়া যায় না। নির্ধারিত পাসপোর্ট কার্যালয় অথবা বিশেষ আবেদন অনুষ্ঠানের মাধ্যমে সরাসরি আবেদন করার ব্যবস্থা রয়েছে। আবেদনকারীদের আগে থেকে যোগাযোগ করে সময় নির্ধারণ করতে বলা হয়েছে। নিয়মিত পাসপোর্টের নির্ধারিত ফি ও প্রক্রিয়াকরণের সময় সাধারণভাবে প্রযোজ্য থাকে।
বিশেষ সংস্করণটির নকশা বদলালেও এর নিরাপত্তাব্যবস্থা অপরিবর্তিত রাখা হয়েছে বলে জানিয়েছে মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর। বর্তমান প্রজন্মের মার্কিন পাসপোর্টে নিরাপত্তা বৈশিষ্ট্য হিসেবে শক্ত উপাদানে তৈরি তথ্যপাতা, লেজার খোদাই এবং বিশেষ নিরাপত্তা তন্তু ব্যবহার করা হয়। নতুন স্মারক সংস্করণেও একই ধরনের নিরাপত্তাব্যবস্থা রাখা হয়েছে। ফলে নকশা নিয়ে রাজনৈতিক বিতর্ক থাকলেও সরকারি ব্যাখ্যা অনুযায়ী, এটি ভ্রমণ ও পরিচয় যাচাইয়ের ক্ষেত্রে প্রচলিত নিরাপত্তার মান বজায় রাখে।
এখানে একটি বিষয় বিশেষভাবে পরিষ্কার করা প্রয়োজন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নতুন নকশার ছবি দেখে কেউ কেউ ধারণা করতে পারেন, যুক্তরাষ্ট্রের সব নাগরিকের পাসপোর্টে এখন ট্রাম্পের ছবি থাকবে। বাস্তবে সরকারি নথিতে এমন কোনো নির্দেশনা পাওয়া যায়নি। এটি স্বাধীনতার আড়াইশ বছর পূর্তি উপলক্ষে তৈরি বিশেষ সংস্করণ। পুরোনো নকশার পাসপোর্ট মেয়াদোত্তীর্ণ বা ক্ষতিগ্রস্ত না হলে আন্তর্জাতিক ভ্রমণে ব্যবহারযোগ্য রয়েছে বলেও পররাষ্ট্র দপ্তর জানিয়েছে।
পাসপোর্টের নকশা নিয়ে বিতর্কটি যুক্তরাষ্ট্রে রাষ্ট্রীয় প্রতীক, রাজনৈতিক নেতৃত্ব এবং জাতীয় ইতিহাসের সম্পর্ক নিয়ে বৃহত্তর আলোচনার অংশ হয়ে উঠেছে। সমর্থকেরা এটিকে স্বাধীনতার ঐতিহাসিক মাইলফলক উদযাপনের একটি স্মারক হিসেবে দেখতে পারেন। অন্যদিকে সমালোচকেরা মনে করছেন, রাষ্ট্রের স্থায়ী পরিচয়পত্রে দায়িত্বে থাকা নেতার ছবি সংযোজন ভবিষ্যতে রাজনৈতিক নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করতে পারে। তবে এসব প্রতিক্রিয়ার ব্যাপকতা নির্ধারণ করতে হলে নির্ভরযোগ্য জরিপ ও আরও তথ্য প্রয়োজন।
সব মিলিয়ে, ট্রাম্পের প্রতিকৃতি ও স্বাক্ষরসংবলিত বিশেষ মার্কিন পাসপোর্ট চালুর খবর সত্য। যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তরের সরকারি ওয়েবসাইটে নকশা, আবেদনপদ্ধতি এবং নিরাপত্তাব্যবস্থা সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করা হয়েছে। তবে এটিকে সবার জন্য বাধ্যতামূলক নতুন পাসপোর্ট বলা ভুল হবে। প্রকৃত ঘটনা হলো, দেশের স্বাধীনতার আড়াইশ বছর পূর্তি উপলক্ষে সীমিত সংস্করণের একটি স্মারক পাসপোর্ট চালু করা হয়েছে, যার নকশা নিয়ে রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক বিতর্ক তৈরি হয়েছে।





