ঋণখেলাপি বেক্সিমকোর দুই প্রতিষ্ঠানে বিশেষ ছাড়, ১০৫ কোটি টাকার ঋণসীমা নবায়নের অনুমতি
ঋণখেলাপি হওয়া সত্ত্বেও বেক্সিমকো গ্রুপের দুই প্রতিষ্ঠান পেল বিশেষ ব্যাংকিং সুবিধা, শর্তসাপেক্ষে নবায়ন হবে ঋণসীমা, খুলতে পারবে আমদানি ঋণপত্রও।
বাংলাদেশ ব্যাংক ঋণখেলাপি বেক্সিমকো গ্রুপের দুটি প্রতিষ্ঠানকে বিশেষ ব্যাংকিং সুবিধা দিয়েছে। প্রতিষ্ঠান দুটি হলো শাইনপুকুর সিরামিকস ও বেক্সিমকো এলপিজি ইউনিট-১। এর ফলে একটি প্রতিষ্ঠান সোনালী ব্যাংকে বিদ্যমান ১০৫ কোটি টাকার চলতি মূলধন ঋণসীমা নবায়নের সুযোগ পেয়েছে। অন্যদিকে, ন্যাশনাল ব্যাংকের মাধ্যমে ঋণপত্র খোলা এবং চলতি মূলধন পাওয়ার সুযোগ পেয়েছে বেক্সিমকো এলপিজি ইউনিট-১। তবে এই সুবিধা কার্যকর করতে উভয় প্রতিষ্ঠানকে নির্দিষ্ট শর্ত পূরণ করতে হবে। ১২ অক্টোবর জারি করা পৃথক প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে কেন্দ্রীয় ব্যাংক এ সিদ্ধান্ত জানায়। বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, সুবিধাগুলো ২০২৭ সালের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত কার্যকর থাকবে।
শাইনপুকুর সিরামিকসের ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, প্রতিষ্ঠানটির বিদ্যমান ১০৫ কোটি টাকার চলতি মূলধন ঋণসীমা নবায়নের অনুমতি দেওয়া হয়েছে। প্রতিষ্ঠানটি সোনালী ব্যাংকের ঋণখেলাপি গ্রাহক হিসেবে বিবেচিত হওয়ায় প্রচলিত আইনি বিধিনিষেধের কারণে ব্যাংকিং সুবিধা পেতে সমস্যায় পড়ছিল। বাংলাদেশ ব্যাংক রাষ্ট্রীয় স্বার্থের কথা উল্লেখ করে এ ক্ষেত্রে আইনি বাধা শিথিল করেছে। এর ফলে প্রতিষ্ঠানটির উৎপাদন কার্যক্রম সচল রাখা এবং কাঁচামাল সংগ্রহের ক্ষেত্রে আর্থিক চাপ কমার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সিদ্ধান্তের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, ঋণখেলাপি গ্রাহককে ঋণসুবিধা দেওয়ার ক্ষেত্রে ব্যাংক কোম্পানি আইন, ১৯৯১-এর ২৭কক(৩) ধারার বিধিনিষেধ শিথিল করা হয়েছে। সাধারণভাবে এই বিধান অনুযায়ী ঋণখেলাপি গ্রাহককে ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠান নতুন ঋণসুবিধা দিতে পারে না। তবে আইনের ১২১ ধারায় প্রদত্ত ক্ষমতা প্রয়োগ করে কেন্দ্রীয় ব্যাংক নির্দিষ্ট শর্তে ব্যতিক্রমী সুবিধা দিয়েছে। এর অর্থ, প্রতিষ্ঠান দুটি সাধারণ নিয়মের বাইরে বিশেষ অনুমতি পেয়েছে; এটি সবার জন্য প্রযোজ্য কোনো সাধারণ ছাড় নয়।
বেক্সিমকো এলপিজি ইউনিট-১-এর ক্ষেত্রেও একই ধরনের বিধিনিষেধ শিথিল করা হয়েছে। প্রতিষ্ঠানটি ন্যাশনাল ব্যাংকের ঋণখেলাপি গ্রাহক। নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, ব্যাংকটি শতভাগ নগদ মার্জিনের বিপরীতে প্রতিষ্ঠানটির অনুকূলে ঋণপত্র খুলতে পারবে এবং চলতি মূলধন সরবরাহ করতে পারবে। শতভাগ নগদ মার্জিনের অর্থ হলো, ঋণপত্রের বিপরীতে প্রয়োজনীয় অর্থের পুরোটা আগেই জমা রাখতে হবে। ফলে প্রতিষ্ঠানটি আমদানির সুযোগ পেলেও এ সুবিধাকে বিনা জামানতে অর্থায়ন হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।
বেক্সিমকো এলপিজির জন্য এই অনুমতি গুরুত্বপূর্ণ, কারণ ব্যাংকিং সুবিধা সীমিত থাকায় প্রতিষ্ঠানটির কাঁচামাল আমদানিতে জটিলতা তৈরি হয়েছিল। দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আগে প্রতিষ্ঠানটি নিজে সরাসরি আমদানি করতে না পেরে দেশের অন্য এলপিজি প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে কাঁচামাল সংগ্রহ করে বাজারে সরবরাহ করত। নতুন অনুমতির ফলে সরাসরি আমদানির সুযোগ তৈরি হতে পারে। এতে প্রতিষ্ঠানটির সরবরাহব্যবস্থা ও উৎপাদন কার্যক্রমে ইতিবাচক প্রভাব পড়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
তবে দুই প্রতিষ্ঠানের জন্যই বাংলাদেশ ব্যাংক আর্থিক জবাবদিহির শর্ত আরোপ করেছে। তাদের সব আয় নির্ধারিত ব্যাংক হিসাবে জমা রাখতে হবে। সেই হিসাব থেকে সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের পাওনা নিয়মিত ও আনুপাতিক হারে পরিশোধ করতে হবে। শাইনপুকুর সিরামিকসের ক্ষেত্রে সোনালী ব্যাংক এবং বেক্সিমকো এলপিজির ক্ষেত্রে ন্যাশনাল ব্যাংকের পাওনা পরিশোধের বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। অর্থাৎ নতুন ব্যবসায়িক সুবিধা পাওয়ার পাশাপাশি ঋণ পরিশোধের ধারাবাহিকতা বজায় রাখাও বাধ্যতামূলক।
এ ছাড়া নতুন ঋণসুবিধার কারণে সরকার বা বাংলাদেশ ব্যাংকের কোনো আর্থিক দায় সৃষ্টি হবে না বলে শর্ত দেওয়া হয়েছে। ভবিষ্যতে এ সুবিধার জন্য সংশ্লিষ্ট ব্যাংক সরকার বা কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কাছে আর্থিক সহায়তা দাবি করতে পারবে না। ফলে প্রতিষ্ঠান দুটির ব্যবসা চালু রাখার সুযোগ দেওয়া হলেও সম্ভাব্য আর্থিক ঝুঁকি সরকারি অর্থের ওপর চাপিয়ে দেওয়ার সুযোগ সীমিত রাখার ব্যবস্থা করা হয়েছে।
বেক্সিমকো গ্রুপের প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যক্রম পুনরায় সচল করার উদ্যোগের মধ্যে এই সিদ্ধান্ত এসেছে। এর আগে ৯ অক্টোবর বেক্সিমকো কম্পিউটার্সের সরকারি চারটি প্রকল্পে পণ্য সরবরাহের জন্য দেওয়া প্রায় ১৬ কোটি টাকার ব্যাংক জামানতের মেয়াদ নবায়নের সুযোগ দেওয়া হয়েছিল বলে সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে। পাশাপাশি গ্রুপের কয়েকটি তালিকাভুক্ত প্রতিষ্ঠানের পরিচালনা পর্ষদ পুনর্গঠন নিয়েও সাম্প্রতিক সময়ে পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। এসব উদ্যোগের লক্ষ্য হিসেবে ব্যবসায়িক কার্যক্রম পুনরুদ্ধার ও দীর্ঘদিনের অচলাবস্থা কাটানোর বিষয়টি সামনে এসেছে।
তবে বিশেষ সুবিধা দেওয়ার সিদ্ধান্তের ফলে ঋণখেলাপি প্রতিষ্ঠানের আর্থিক দায় স্বয়ংক্রিয়ভাবে শেষ হয়ে যায় না। ঋণের বকেয়া পরিশোধ, আয় নির্ধারিত হিসাবে জমা এবং ব্যাংকের পাওনা নিয়মিত মেটানোর শর্ত বহাল থাকছে। সুবিধাগুলো কতটা কার্যকর হবে, তা নির্ভর করবে প্রতিষ্ঠানগুলোর উৎপাদন, বিক্রি, নগদ প্রবাহ এবং ঋণ পরিশোধের সক্ষমতার ওপর।
বাংলাদেশ ব্যাংকের এই সিদ্ধান্ত বেক্সিমকো গ্রুপের দুটি প্রতিষ্ঠানের ব্যবসা সচল রাখার জন্য গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ তৈরি করেছে। একদিকে শাইনপুকুর সিরামিকস ১০৫ কোটি টাকার চলতি মূলধন ঋণসীমা নবায়নের সুযোগ পেয়েছে, অন্যদিকে বেক্সিমকো এলপিজি ইউনিট-১ আমদানি ঋণপত্র খোলা ও চলতি মূলধন পাওয়ার অনুমতি পেয়েছে। তবে এই সুবিধার পাশাপাশি ঋণ পরিশোধ ও আর্থিক শৃঙ্খলা বজায় রাখার দায়িত্বও প্রতিষ্ঠান দুটির ওপর থাকছে।





