জবাবদিহি জোরদারে নিউইয়র্কে পুলিশের বলপ্রয়োগ নীতি পর্যালোচনার নির্দেশ দিলেন মেয়র মামদানি
নিউইয়র্কে পুলিশের বলপ্রয়োগ নীতি পর্যালোচনা, স্বাধীন তদারকিতে অর্থ বৃদ্ধি এবং অসদাচরণের অভিযোগে জবাবদিহি জোরদারে নতুন উদ্যোগ নিলেন মেয়র জোহরান মামদানি।
যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্ক নগরে পুলিশের বলপ্রয়োগসংক্রান্ত নীতিমালা ও কার্যপদ্ধতি ব্যাপকভাবে পর্যালোচনার নির্দেশ দিয়েছেন মেয়র জোহরান মামদানি। পুলিশের বিরুদ্ধে অসদাচরণের অভিযোগের জবাবদিহি নিশ্চিত করা, তদন্তের স্বচ্ছতা বাড়ানো এবং নাগরিকদের আস্থা ফিরিয়ে আনার লক্ষ্যে এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। নগর প্রশাসনের ঘোষণায় বলা হয়েছে, প্রায় এক দশকের মধ্যে প্রথমবারের মতো এ ধরনের বিস্তৃত পর্যালোচনা করা হবে। আগামী কয়েক মাস ধরে চলা এই প্রক্রিয়ায় সাধারণ মানুষের মতামতও নেওয়া হবে।
মেয়রের দপ্তর জানিয়েছে, পুলিশের বলপ্রয়োগ কখন, কী পরিস্থিতিতে এবং কীভাবে করা হচ্ছে, সেই নীতিমালা ও বাস্তব প্রয়োগ খতিয়ে দেখা হবে। একই সঙ্গে কর্মকর্তাদের প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ ও নির্দেশনা যথেষ্ট কি না, তাও পর্যালোচনার আওতায় আসবে। প্রশাসনের লক্ষ্য হলো, পুলিশ যেন আইন মেনে, সতর্কতার সঙ্গে এবং একান্ত প্রয়োজন হলেই বলপ্রয়োগ করে। তবে এই ঘোষণা নিজে থেকে পুলিশের বিদ্যমান সব নিয়ম বাতিল করছে না; বরং বর্তমান নীতিমালা ও কার্যপদ্ধতি পর্যালোচনা করে প্রয়োজনীয় পরিবর্তনের পথ তৈরি করছে।
এই সিদ্ধান্তের পাশাপাশি পুলিশি অসদাচরণের অভিযোগ তদন্ত ও শৃঙ্খলামূলক ব্যবস্থা জোরদারে একাধিক পদক্ষেপ ঘোষণা করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে নিউইয়র্ক পুলিশ বিভাগকে স্বাধীনভাবে তদারকির দায়িত্বে থাকা পরিদর্শক দপ্তরের জন্য অতিরিক্ত ২৬ লাখ ডলার বরাদ্দ। নগর প্রশাসনের ভাষ্য অনুযায়ী, এই অর্থ দিয়ে দপ্তরটির কর্মীসংখ্যা আগের সর্বোচ্চ পর্যায়ে ফিরিয়ে নেওয়া হবে। এতে বর্তমান কর্মীসংখ্যা প্রায় তিন গুণ হতে পারে। দপ্তরটি পুলিশের এমন নীতি ও কার্যপদ্ধতি তদন্ত করতে পারবে, যেগুলো অসদাচরণের অভিযোগের জবাবদিহি বাধাগ্রস্ত করতে পারে।
মেয়র মামদানির ঘোষণার পেছনে উইন রোজারিও নামের ১৯ বছর বয়সী এক তরুণের মৃত্যুর ঘটনাও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। ২০২৪ সালের মার্চে নিউইয়র্কের কুইন্স এলাকায় মানসিক স্বাস্থ্যসংকটে থাকা রোজারিওর বাড়িতে পুলিশ পৌঁছায়। ওই সময় পুলিশের গুলিতে তাঁর মৃত্যু হয়। ঘটনার সঙ্গে জড়িত কর্মকর্তাদের একজনের বিরুদ্ধে বিভাগীয় শৃঙ্খলাভঙ্গের অভিযোগে ব্যবস্থা নেওয়ার প্রক্রিয়া চলছিল। কিন্তু বিচারধর্মী বিভাগীয় শুনানি সম্পন্ন হওয়ার আগেই ওই কর্মকর্তা অবসর নেন। নগর প্রশাসনের বক্তব্য অনুযায়ী, এই ঘটনা পুলিশের বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগের নিষ্পত্তি এবং অবসরের নিয়ম নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করেছে।
নগর প্রশাসন জানিয়েছে, ভবিষ্যতে কোনো কর্মকর্তার বিরুদ্ধে শৃঙ্খলামূলক অভিযোগ থাকলে অবসরের আগে সেই প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার ব্যবস্থা আরও কার্যকর করা হবে। এ জন্য নিউইয়র্ক পুলিশ বিভাগ নতুন বিজ্ঞপ্তি ও সমন্বয়ব্যবস্থা চালু করেছে। এর উদ্দেশ্য হলো, কোনো কর্মকর্তা অবসরে চলে যাওয়ার কারণে যেন তাঁর বিরুদ্ধে চলমান বিভাগীয় কার্যক্রম অকার্যকর হয়ে না পড়ে। পুলিশ কমিশনার জেসিকা টিশের দপ্তরও আগের ঘটনায় প্রয়োজনীয় বিজ্ঞপ্তি দিতে ব্যর্থ হওয়ার বিষয়টি স্বীকার করেছে এবং একে মানবিক ভুল হিসেবে বর্ণনা করে দুঃখ প্রকাশ করেছে।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হলো, কোনো কর্মকর্তা গুরুতর বিভাগীয় অভিযোগ চলমান থাকা অবস্থায় অবসর নিলে সংশ্লিষ্ট তথ্য নিউইয়র্ক অঙ্গরাজ্যের অপরাধবিচারবিষয়ক কর্তৃপক্ষকে জানানোর ব্যবস্থা আনুষ্ঠানিক করা। এর মাধ্যমে এমন কর্মকর্তাদের অন্য কোনো আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থায় চাকরি পাওয়ার সুযোগ সীমিত করার চেষ্টা করা হবে, যাঁদের বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগের নিষ্পত্তি হয়নি। তবে কোনো অভিযোগ থাকা মানেই অপরাধ প্রমাণিত হওয়া নয়। তাই তদন্ত, প্রযোজ্য শৃঙ্খলামূলক প্রক্রিয়া এবং আইনসম্মত সিদ্ধান্তের মধ্যে পার্থক্য বজায় রাখাও গুরুত্বপূর্ণ।
পুলিশের বলপ্রয়োগে মৃত্যু বা গুরুতর আহত হওয়ার ঘটনা নিয়ে তথ্য প্রকাশের ব্যবস্থাও আরও সুসংগঠিত করার কথা জানিয়েছে নগর প্রশাসন। গুরুত্বপূর্ণ ঘটনার পর জনসাধারণ এবং ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তিদের পরিবারের সঙ্গে তথ্য বিনিময়ের নিয়ম নির্ধারণ করা হবে। প্রয়োজন হলে নিহত বা গুরুতর আহত ব্যক্তিদের পরিবারের সদস্য কিংবা তাঁদের প্রতিনিধিদের কাছে পুলিশের বলপ্রয়োগ তদন্ত বিভাগের চূড়ান্ত প্রতিবেদন দেওয়া হবে। এ ছাড়া পুলিশ-সংশ্লিষ্ট মৃত্যুর তথ্য অঙ্গরাজ্য কর্তৃপক্ষকে সময়মতো জানানোর আইনি বাধ্যবাধকতা যথাযথভাবে পালনের কথাও পুনর্ব্যক্ত করা হয়েছে।
মামদানি নির্বাচনী প্রচারে পুলিশের কিছু দায়িত্ব মানসিক স্বাস্থ্যসেবায় প্রশিক্ষিত দলের কাছে হস্তান্তরের মতো পরিবর্তনের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। তবে তাঁর প্রশাসনের পুলিশ সংস্কার পরিকল্পনা নিয়ে সমর্থকদের একাংশের মধ্যে অসন্তোষ রয়েছে। পুলিশ কমিশনার জেসিকা টিশকে পদে বহাল রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েও প্রগতিশীল রাজনৈতিক কর্মীদের কেউ কেউ প্রশ্ন তুলেছেন। সাম্প্রতিক সময়ে নগরে ফেডারেল অভিবাসন কর্মকর্তাদের গুলির ঘটনাকে কেন্দ্র করে পুলিশি নেতৃত্ব ও জবাবদিহি নিয়ে বিতর্ক আরও তীব্র হয়েছে। তবে ফেডারেল কর্মকর্তাদের ওই ঘটনা এবং পুলিশের নিজস্ব বলপ্রয়োগ নীতিমালার পর্যালোচনা আলাদা বিষয়; দুটিকে এক ঘটনা হিসেবে দেখা ঠিক হবে না।
পুলিশের প্রতিনিধিত্বকারী একটি সংগঠন নতুন উদ্যোগের সমালোচনা করেছে। সংগঠনটির নেতার বক্তব্য, এসব পদক্ষেপ রাজনৈতিক সমর্থকদের সন্তুষ্ট করার চেষ্টা এবং এতে জননিরাপত্তা বাড়বে কি না, তা নিয়ে সন্দেহ রয়েছে। অন্যদিকে নগর প্রশাসনের অবস্থান হলো, পুলিশ কর্মকর্তাদের কাজের জন্য স্পষ্ট নির্দেশনা থাকা এবং গুরুতর অভিযোগের নিরপেক্ষ নিষ্পত্তি নিশ্চিত করা জননিরাপত্তা ও জনগণের আস্থা—দুইয়ের জন্যই গুরুত্বপূর্ণ।
নীতিমালা পর্যালোচনার বাস্তব ফল নির্ভর করবে সুপারিশগুলো কীভাবে কার্যকর করা হয়, তদন্ত কতটা স্বাধীনভাবে পরিচালিত হয় এবং অভিযোগের নিষ্পত্তিতে কতটা স্বচ্ছতা বজায় থাকে তার ওপর। শুধু নতুন নিয়ম ঘোষণা করলেই নাগরিকদের আস্থা ফিরে আসে না; বাস্তবে নিয়ম অনুসরণ, কর্মকর্তাদের প্রশিক্ষণ, নিরপেক্ষ তদন্ত এবং জনসাধারণকে তথ্য দেওয়ার ধারাবাহিকতাও জরুরি।
নিউইয়র্কে মেয়র জোহরান মামদানির এই সিদ্ধান্ত পুলিশি জবাবদিহি জোরদারের একটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ। নীতিমালা পর্যালোচনা, স্বাধীন তদারকি দপ্তরে অতিরিক্ত অর্থ বরাদ্দ এবং অভিযোগ নিষ্পত্তির প্রক্রিয়া উন্নত করার পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে পুলিশি কার্যক্রমের স্বচ্ছতা বাড়তে পারে। তবে পরিবর্তনের প্রকৃত প্রভাব বোঝার জন্য পর্যালোচনার ফলাফল, নতুন নিয়মের বাস্তব প্রয়োগ এবং ভবিষ্যতে অভিযোগ নিষ্পত্তির অগ্রগতি পর্যবেক্ষণ করতে হবে।





