ডিজেলের দাম নিয়ে ট্রাম্পের সঙ্গে মতবিরোধ, হরমুজ সংকটের প্রভাব সামনে আনছে ইউক্রেন
বিশ্ববাজারে ডিজেলের দাম নিয়ে নতুন বিতর্ক। রাশিয়ার জ্বালানি স্থাপনায় হামলা, হরমুজ প্রণালির সংকট ও ট্রাম্পের নতুন উদ্যোগ ঘিরে বাড়ছে আন্তর্জাতিক উত্তেজনা।
বিশ্ববাজারে ডিজেলের দাম নিয়ন্ত্রণ, রাশিয়ার জ্বালানি রপ্তানি এবং হরমুজ প্রণালির অচলাবস্থা ঘিরে আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প রাশিয়া থেকে ডিজেল সরবরাহ বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়ার কথা জানিয়েছেন। অন্যদিকে, ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি রাশিয়ার ওপর চাপ কমানোর বিষয়ে আপত্তি জানিয়েছেন। এই পরিস্থিতিতে জ্বালানির দাম বৃদ্ধির জন্য কোন বিষয় কতটা দায়ী, তা নিয়ে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বিতর্ক আরও তীব্র হয়েছে।
রয়টার্সের ৯ অক্টোবরের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ট্রাম্প রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সঙ্গে আলোচনার পর যুক্তরাষ্ট্র ও আন্তর্জাতিক বাজারে রাশিয়ার ডিজেল সরবরাহের একটি পরিকল্পনার কথা ঘোষণা করেন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, রাশিয়া প্রথমে তিন লাখ মেট্রিক টনের বেশি ডিজেল সরবরাহ করতে পারে। পরবর্তী সময়ে আরও জ্বালানি সরবরাহের পরিকল্পনার কথাও জানানো হয়। তবে ঘোষিত সরবরাহের পরিমাণ, বাস্তবে কত দ্রুত জ্বালানি পৌঁছাবে এবং বাজারে তার প্রভাব কতটা হবে—এসব বিষয় আলাদাভাবে বিবেচনা করা জরুরি।
ট্রাম্পের এই উদ্যোগের পেছনে যুক্তরাষ্ট্রে জ্বালানির উচ্চমূল্য কমানোর লক্ষ্য রয়েছে। ডিজেল পরিবহন, কৃষিকাজ, পণ্য সরবরাহ এবং বিভিন্ন শিল্পে গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি হিসেবে ব্যবহৃত হয়। এর দাম বেড়ে গেলে ট্রাক পরিবহন থেকে শুরু করে কৃষিপণ্য বাজারজাত করা পর্যন্ত বিভিন্ন খাতে ব্যয় বাড়তে পারে। ফলে জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয়ের ওপরও প্রভাব ফেলতে পারে।
তবে রাশিয়া থেকে অতিরিক্ত ডিজেল আমদানির ঘোষণা মানেই যে দ্রুত দাম কমে যাবে, এমন নিশ্চয়তা নেই। জ্বালানি সরবরাহের জন্য পর্যাপ্ত উৎপাদনক্ষমতা, সচল শোধনাগার, পরিবহনব্যবস্থা, জাহাজের প্রাপ্যতা এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের অনুমতি প্রয়োজন। রাশিয়ার কিছু শোধনাগার ইউক্রেনের হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে। এসব কারণে ঘোষিত সরবরাহ বাস্তবায়নে সীমাবদ্ধতা তৈরি হতে পারে।
এদিকে, হরমুজ প্রণালির পরিস্থিতি আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। পারস্য উপসাগর থেকে বিশ্ববাজারে তেল পরিবহনের অন্যতম প্রধান পথ এই প্রণালি। এখানে জাহাজ চলাচল বাধাগ্রস্ত হলে তেল ও জ্বালানি পরিবহনে বিলম্ব, বীমা ব্যয় বৃদ্ধি এবং সরবরাহ নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হতে পারে। ব্যবসায়ীরা ভবিষ্যতে সরবরাহ কমে যাওয়ার আশঙ্কা করলেও আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বেড়ে যেতে পারে।
রয়টার্সের ৫ অক্টোবরের প্রতিবেদনে বলা হয়, ইরানকে ঘিরে যুদ্ধ এবং হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচলের বাধা আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে চাপ সৃষ্টি করেছে। একই সঙ্গে রাশিয়ার শোধনাগারে ইউক্রেনের হামলাও বিশেষ করে ডিজেলের সরবরাহে প্রভাব ফেলতে পারে। অর্থাৎ, জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির পেছনে একটি মাত্র কারণ নয়, একাধিক আন্তর্জাতিক ঘটনা কাজ করছে।
ট্রাম্পের অবস্থান হলো, রাশিয়ার জ্বালানি স্থাপনায় ইউক্রেনের হামলা বন্ধ হলে ডিজেলের সরবরাহ পরিস্থিতির উন্নতি হতে পারে। তিনি ইউক্রেনকে রাশিয়ার ডিজেল উৎপাদনকারী স্থাপনায় হামলা বন্ধ করার আহ্বান জানিয়েছেন। তবে ইউক্রেনের দৃষ্টিভঙ্গি ভিন্ন। কিয়েভের যুক্তি, রাশিয়ার জ্বালানি অবকাঠামো দেশটির যুদ্ধ পরিচালনা ও সামরিক অর্থনীতির সঙ্গে যুক্ত। ফলে রাশিয়ার এসব স্থাপনার ওপর চাপ কমানো হলে মস্কোর যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার সক্ষমতা বাড়তে পারে।
৯ অক্টোবর প্রকাশিত রয়টার্সের আরেক প্রতিবেদনে জেলেনস্কি রাশিয়াকে ডিজেল বিক্রির সুযোগ দেওয়ার সিদ্ধান্তের সমালোচনা করেন। তাঁর বক্তব্যের সারকথা ছিল, রাশিয়াকে অতিরিক্ত জ্বালানি আয় করার সুযোগ দেওয়া যুদ্ধ বন্ধের পরিবর্তে যুদ্ধ দীর্ঘায়িত করতে পারে। তিনি রাশিয়ার সঙ্গে পারস্পরিক পদক্ষেপের ভিত্তিতে উত্তেজনা কমানোর ওপর গুরুত্ব দেন।
এই মতবিরোধের মধ্যেই ডিজেলের দাম নিয়ে জেলেনস্কির নামে প্রচারিত একটি বক্তব্য সামাজিক মাধ্যমে আলোচনায় এসেছে। সেখানে বলা হয়েছে, রাশিয়ার ডিজেল উৎপাদন বা জ্বালানি স্থাপনায় ইউক্রেনের হামলাকে দাম বৃদ্ধির একমাত্র কারণ হিসেবে দেখা ঠিক নয়; হরমুজ প্রণালির পরিস্থিতিও গুরুত্বপূর্ণ। বক্তব্যটির মূল ধারণার সঙ্গে জ্বালানি বাজারের বহুমুখী সংকটের বিষয়টি সামঞ্জস্যপূর্ণ হলেও, প্রচারিত ইংরেজি বাক্যটির হুবহু উৎস নির্ভরযোগ্যভাবে নিশ্চিত করা যায়নি। তাই সেটিকে জেলেনস্কির যাচাই করা সরাসরি উদ্ধৃতি হিসেবে উপস্থাপন করা হচ্ছে না।
বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম এবং ডিজেলের দাম এক বিষয় নয়। অপরিশোধিত তেল শোধন করে ডিজেল তৈরি করতে হয়। শোধনাগারের উৎপাদনক্ষমতা কমে গেলে, জ্বালানি পরিবহনে বাধা সৃষ্টি হলে কিংবা নির্দিষ্ট অঞ্চলে ডিজেলের চাহিদা বেড়ে গেলে অপরিশোধিত তেলের দাম স্থিতিশীল থাকলেও ডিজেলের দাম বাড়তে পারে। আবার যুদ্ধের কারণে পরিবহন ও বীমা ব্যয় বেড়ে গেলে আমদানিকারকদের মোট ব্যয়ও বৃদ্ধি পায়।
এ কারণে রাশিয়ার জ্বালানি স্থাপনায় হামলা বন্ধ করা কিংবা রাশিয়া থেকে অতিরিক্ত ডিজেল আমদানি—কোনোটিকেই এককভাবে সব সমস্যার সমাধান হিসেবে বিবেচনা করা যায় না। হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচলের নিরাপত্তা, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের অবসান, শোধনাগারগুলোর উৎপাদন পরিস্থিতি এবং আন্তর্জাতিক বাজারে সরবরাহ স্বাভাবিক হওয়া—সবকিছুই গুরুত্বপূর্ণ।
জ্বালানির উচ্চমূল্য যুক্তরাষ্ট্রের ভোক্তা, পরিবহন ব্যবসায়ী ও কৃষকদের জন্যও উদ্বেগের বিষয়। ডিজেলের ব্যয় বেড়ে গেলে পণ্য পরিবহনের খরচ বাড়তে পারে, যার প্রভাব শেষ পর্যন্ত বিভিন্ন পণ্যের খুচরা মূল্যেও পড়তে পারে। তাই জ্বালানির দাম কমানোর উদ্যোগ শুধু অর্থনৈতিক বিষয় নয়, রাজনৈতিকভাবেও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
রাশিয়ার ডিজেল সরবরাহ বাড়ানোর বিষয়ে ট্রাম্পের উদ্যোগ এবং হরমুজ প্রণালির সংকট আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারের দুটি গুরুত্বপূর্ণ দিককে সামনে এনেছে। রাশিয়ার শোধনাগারে হামলা সরবরাহে অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করতে পারে, আবার মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত ও সামুদ্রিক পরিবহন ব্যাহত হওয়াও জ্বালানির মূল্য বাড়িয়ে দিতে পারে। ভবিষ্যতে ডিজেলের দাম কতটা কমবে, তা নির্ভর করবে ঘোষিত সরবরাহ বাস্তবে কার্যকর হওয়া, আন্তর্জাতিক বাণিজ্যপথের নিরাপত্তা এবং যুদ্ধ পরিস্থিতির পরিবর্তনের ওপর।





