ট্রাম্পের প্রচারধর্মী টেলিভিশন বিজ্ঞাপনে সরকারি অর্থ ব্যয় বন্ধের নির্দেশ দিলেন ফেডারেল বিচারক
সরকারি অর্থে ট্রাম্পকে তুলে ধরা টেলিভিশন বিজ্ঞাপন বন্ধের নির্দেশ দিয়েছেন মার্কিন বিচারক। ব্যয়ের বৈধতা নিয়ে চলছে আইনি লড়াই।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে সামনে রেখে প্রচার করা টেলিভিশন বিজ্ঞাপনে সরকারি অর্থ ব্যয় বন্ধের নির্দেশ দিয়েছেন দেশটির একটি ফেডারেল আদালত। নিউইয়র্কের ফেডারেল বিচারক জেনিফার রোচন রোববার, ১১ অক্টোবর, বিজ্ঞাপনগুলোর অবশিষ্ট প্রচার বন্ধ রাখতে সাময়িক নিষেধাজ্ঞা জারি করেন। সরকারি অর্থের ব্যবহার নিয়ে দায়ের করা মামলার পরিপ্রেক্ষিতে এই নির্দেশ আসে। বিষয়টি এখন যুক্তরাষ্ট্রে সরকারি ব্যয়, রাজনৈতিক প্রচার এবং নির্বাচনের আগে প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে নতুন বিতর্ক তৈরি করেছে।
বিজ্ঞাপনগুলো সেপ্টেম্বরের শেষ দিকে বিভিন্ন টেলিভিশন মাধ্যমে প্রচার শুরু হয়। এতে ট্রাম্পের বক্তব্য, তাঁর প্রশাসনের বিভিন্ন নীতি এবং যুক্তরাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ নিয়ে রাজনৈতিক বার্তা তুলে ধরা হয়। একটি বিজ্ঞাপনে তাঁকে সাম্যবাদের বিরোধিতা করতে দেখা যায়। অন্য বিজ্ঞাপনগুলোতে যুক্তরাষ্ট্রের শক্তি, প্রশাসনের কর্মকাণ্ড এবং দেশের ভবিষ্যৎ সম্পর্কে তাঁর বক্তব্য তুলে ধরা হয়। বিজ্ঞাপনের শেষে জানানো হয়, এগুলোর অর্থায়ন করেছে মার্কিন সরকার।
বিতর্কের কেন্দ্রে রয়েছে বিজ্ঞাপন তৈরির উদ্দেশ্য এবং এর ব্যয়ের উৎস। যুক্তরাষ্ট্রের স্বরাষ্ট্র নিরাপত্তা বিভাগ বিজ্ঞাপন প্রচারের জন্য প্রায় দুই কোটি ডলারের অর্থ বরাদ্দ করেছিল। সংবাদমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, বিজ্ঞাপন সম্প্রচারে ইতিমধ্যে এক কোটি বিশ লাখ ডলারের বেশি ব্যয় হয়েছিল বলে হিসাব পাওয়া যায়। তবে বরাদ্দকৃত অর্থের পুরোটা খরচ হয়েছে—এমন দাবি করা ঠিক হবে না। বরাদ্দ ও প্রকৃত ব্যয় আলাদা বিষয়।
সরকারি অর্থে প্রচারিত বিজ্ঞাপনগুলো জনসাধারণকে কোনো নির্দিষ্ট সরকারি কর্মসূচি সম্পর্কে তথ্য দেওয়ার জন্য তৈরি হয়েছিল, নাকি রাজনৈতিকভাবে ট্রাম্পের ভাবমূর্তি তুলে ধরার উদ্দেশ্যে প্রচার করা হয়েছিল—মামলার মূল প্রশ্ন সেটিই। অভিযোগকারীদের দাবি, বিজ্ঞাপনগুলোর ভাষা ও উপস্থাপনা সাধারণ জনসচেতনতামূলক প্রচারের চেয়ে রাজনৈতিক প্রচারণার কাছাকাছি। বিশেষ করে নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে এ ধরনের বিজ্ঞাপন প্রচারের সময় নিয়ে তাঁরা আপত্তি তুলেছেন।
সরকারি অর্থের ব্যবহার নিয়ে আপত্তি জানিয়ে অলাভজনক নজরদারি সংস্থা কমন কজ এবং তাদের সহযোগীরা আদালতের দ্বারস্থ হয়। তাঁদের অভিযোগ, কংগ্রেসের অনুমোদিত অর্থ নির্ধারিত উদ্দেশ্যের বাইরে ব্যবহার করে রাজনৈতিক প্রচারের মতো বিজ্ঞাপন চালানো হয়েছে। তাঁদের মতে, জনগণের করের অর্থ ব্যবহার করে কোনো রাজনৈতিক নেতার বার্তা প্রচার করা হলে সরকারি সম্পদের নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন উঠতে পারে। মামলায় বিজ্ঞাপনগুলোর অবশিষ্ট সম্প্রচার বন্ধ করার আবেদন জানানো হয়।
বিচারক রোচন অভিযোগকারীদের আবেদনের ভিত্তিতে দুই সপ্তাহের জন্য সাময়িক নিষেধাজ্ঞা দেন। এই সময়ে সংশ্লিষ্ট বিজ্ঞাপনগুলোর প্রচার, নতুন চুক্তি করা কিংবা প্রচারের ব্যবস্থা বাড়ানোর ওপর নিষেধাজ্ঞা প্রযোজ্য হবে। তবে এটি মামলার চূড়ান্ত রায় নয়। আদালতে পরবর্তী শুনানি ও আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে সরকারি অর্থ ব্যবহারের বৈধতা নিয়ে আরও সিদ্ধান্ত আসতে পারে। তাই প্রশাসনের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগকে চূড়ান্তভাবে প্রমাণিত অপরাধ হিসেবে উপস্থাপন করা যাবে না।
ট্রাম্প প্রশাসন বিজ্ঞাপনগুলোকে জনসেবামূলক প্রচার হিসেবে ব্যাখ্যা করেছে। হোয়াইট হাউসের বক্তব্য, আগের প্রশাসনগুলোও নিজেদের নীতি ও সরকারি কর্মকাণ্ড সম্পর্কে জনগণকে জানাতে সরকারি অর্থে বিজ্ঞাপন দিয়েছে। প্রশাসনের দৃষ্টিতে, প্রেসিডেন্টের নীতির প্রচার করা মানেই কোনো প্রার্থীর নির্বাচনী প্রচার করা নয়। এই যুক্তির ভিত্তিতেই বিজ্ঞাপনগুলোর পক্ষে অবস্থান নেওয়া হয়েছে। তবে অভিযোগকারীরা বলছেন, এসব বিজ্ঞাপনের উপস্থাপনা ও রাজনৈতিক বার্তা সাধারণ সরকারি তথ্য প্রচারের সীমা অতিক্রম করেছে।
বিজ্ঞাপন নিয়ে সমালোচনা বাড়ার পর ট্রাম্প জানিয়েছিলেন, ভবিষ্যতে এ ধরনের প্রচারের অর্থ তাঁর রাজনৈতিক তহবিল থেকে দেওয়া হবে। হোয়াইট হাউসও জানিয়েছে, পরবর্তী বিজ্ঞাপনগুলোর অর্থায়নে তাঁর সমর্থকগোষ্ঠীর তহবিল ব্যবহার করা হতে পারে। তবে ইতিমধ্যে সরকারি অর্থ থেকে যে টাকা ব্যয় হয়েছে, তা সরকারকে ফেরত দেওয়ার কোনো পরিকল্পনা নেই বলে সংশ্লিষ্ট প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। ফলে ভবিষ্যৎ অর্থায়নের পরিবর্তন আগের ব্যয়ের বৈধতা নিয়ে চলমান বিরোধের সমাধান করছে না।
এই বিরোধের রাজনৈতিক গুরুত্ব আরও বেড়েছে, কারণ যুক্তরাষ্ট্রে ৩ নভেম্বর মধ্যবর্তী নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা। এ নির্বাচনে প্রতিনিধি পরিষদ ও সিনেটের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বিতা রয়েছে। অভিযোগকারীদের আশঙ্কা, সরকারি অর্থে প্রচারিত রাজনৈতিক বার্তা নির্বাচনের আগে ক্ষমতাসীন দলের পক্ষে প্রভাব তৈরি করতে পারে। তবে বিজ্ঞাপনগুলোর কারণে নির্বাচনের ফলাফলে কী প্রভাব পড়বে, তা এখনো নিশ্চিতভাবে বলা যায় না।
সরকারি অর্থের ব্যবহার নিয়ে এ ধরনের মামলা যুক্তরাষ্ট্রে প্রশাসনিক ক্ষমতার সীমা এবং জনসাধারণের অর্থের জবাবদিহির প্রশ্নকে সামনে আনে। সরকারের পক্ষে জনসচেতনতামূলক বিজ্ঞাপন দেওয়া বৈধ হতে পারে, কিন্তু সেই বিজ্ঞাপনের বিষয়বস্তু, উদ্দেশ্য, অর্থের উৎস এবং প্রযোজ্য আইন গুরুত্বপূর্ণ। আদালতকে এসব বিষয় পর্যালোচনা করে সিদ্ধান্ত নিতে হবে যে সংশ্লিষ্ট বিজ্ঞাপনগুলো অনুমোদিত সরকারি প্রচারের আওতায় পড়ে কি না।
বর্তমানে আদালতের নির্দেশের ফলে সরকারি অর্থে বিজ্ঞাপনগুলোর অবশিষ্ট সম্প্রচার বন্ধ রাখার বাধ্যবাধকতা তৈরি হয়েছে। পরবর্তী শুনানিতে মামলার বিভিন্ন দিক আরও স্পষ্ট হতে পারে। হোয়াইট হাউস ও সংশ্লিষ্ট সরকারি সংস্থার অবস্থান, অভিযোগকারীদের যুক্তি এবং আদালতের পরবর্তী সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করবে বিরোধটির পরিণতি। আপাতত নিশ্চিত তথ্য হলো, সরকারি অর্থে ট্রাম্পকে তুলে ধরা বিজ্ঞাপন নিয়ে আইনি চ্যালেঞ্জের পর একজন ফেডারেল বিচারক সাময়িক নিষেধাজ্ঞা দিয়েছেন।





