যুক্তরাষ্ট্রের কাজের ভিসায় আজ থেকে নতুন আবেদনপত্র বাধ্যতামূলক, পুরোনো ফরমে আবেদন বাতিল
যুক্তরাষ্ট্রে কাজের ভিসার আবেদনে ৯ নভেম্বর থেকে নতুন ফরম ব্যবহার বাধ্যতামূলক হয়েছে। পুরোনো ফরমে আবেদন পাঠালে তা গ্রহণ করবে না অভিবাসন কর্তৃপক্ষ।
যুক্তরাষ্ট্রে অস্থায়ীভাবে কাজ করার অনুমতিসংক্রান্ত আবেদনে নতুন নিয়ম কার্যকর হয়েছে। ৯ নভেম্বর ২০২৬ থেকে দেশটির অভিবাসন কর্তৃপক্ষ পুরোনো সংস্করণের আবেদনপত্র আর গ্রহণ করবে না। এখন থেকে কাজের অনুমতিসংক্রান্ত আবেদন জমা দিতে হলে নির্ধারিত নতুন সংস্করণের আবেদনপত্র ব্যবহার করতে হবে। পুরোনো সংস্করণের আবেদনপত্র পাঠানো হলে তা প্রত্যাখ্যান করা হবে।
যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকত্ব ও অভিবাসন সেবা বিভাগ জানিয়েছে, অস্থায়ী কর্মীদের জন্য ব্যবহৃত আই-১২৯ আবেদনপত্রের নতুন সংস্করণ গত ৯ সেপ্টেম্বর প্রকাশ করা হয়েছিল। তবে নতুন সংস্করণ প্রকাশের পরও আবেদনকারীদের পুরোনো সংস্করণ ব্যবহারের সুযোগ দেওয়া হয়েছিল। সেই সুযোগ শেষ হয়েছে ৯ নভেম্বর।
কর্তৃপক্ষের নির্দেশনা অনুযায়ী, ২০২৬ সালের ৯ ফেব্রুয়ারি নয়, বরং ২৭ ফেব্রুয়ারি প্রকাশিত পুরোনো সংস্করণটি ৯ নভেম্বরের আগে পর্যন্ত গ্রহণযোগ্য ছিল। কিন্তু ৯ নভেম্বর থেকে ওই সংস্করণে ডাকযোগে পাঠানো কিংবা অনলাইনে জমা দেওয়া আবেদন প্রত্যাখ্যান করা হবে। নতুন সংস্করণটির তারিখ ৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬। তাই আবেদন জমা দেওয়ার আগে সঠিক সংস্করণ ব্যবহার করা অত্যন্ত জরুরি।
এই পরিবর্তনের প্রভাব পড়বে যুক্তরাষ্ট্রে বিভিন্ন ধরনের অস্থায়ী কর্মী নিয়োগের আবেদনে। এর মধ্যে রয়েছে এইচ-১বি, এইচ-২এ, এইচ-২বি, এইচ-৩, এল-১, ও-১, ও-২, পি, কিউ এবং আর শ্রেণির কাজের অনুমতিসংক্রান্ত আবেদন।
এ ছাড়া নির্দিষ্ট কিছু শ্রেণির কর্মীর অবস্থান পরিবর্তন অথবা যুক্তরাষ্ট্রে থাকার সময় বাড়ানোর আবেদনেও এই ফরম ব্যবহার করা হয়। ফলে শুধু নতুন কর্মী নিয়োগ নয়, আগে থেকেই যুক্তরাষ্ট্রে কর্মরত অনেক বিদেশি কর্মীর আবেদন প্রক্রিয়াতেও এই পরিবর্তন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
এইচ-১বি ভিসা মূলত বিশেষ দক্ষতা ও উচ্চশিক্ষাভিত্তিক পেশায় বিদেশি কর্মীদের নিয়োগের সুযোগ দেয়। প্রযুক্তি, প্রকৌশল, চিকিৎসা, গবেষণা এবং বিভিন্ন পেশাগত ক্ষেত্রে এই ভিসার ব্যবহার রয়েছে। অন্যদিকে, এইচ-২বি ভিসার মাধ্যমে কৃষির বাইরের মৌসুমি কাজের জন্য বিদেশি কর্মী নিয়োগ করা হয়।
এল-১ ভিসা মূলত একই প্রতিষ্ঠানের বিদেশি শাখা থেকে যুক্তরাষ্ট্রের শাখায় ব্যবস্থাপক, নির্বাহী কর্মকর্তা অথবা বিশেষ জ্ঞানসম্পন্ন কর্মী স্থানান্তরের জন্য ব্যবহৃত হয়। ও-১ ভিসা বিশেষ দক্ষতা বা অসাধারণ সাফল্য অর্জনকারী ব্যক্তিদের জন্য প্রযোজ্য।
নতুন ফরমের পাশাপাশি বড় প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য অতিরিক্ত অভিবাসন ফি নিয়েও গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন এসেছে। তবে এই ফি সম্পর্কে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া কিছু তথ্যের ভুল ব্যাখ্যা হতে পারে।
নিয়ম অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রে যেসব প্রতিষ্ঠানের কমপক্ষে ৫০ জন কর্মী রয়েছে এবং তাদের মোট কর্মীর ৫০ শতাংশের বেশি এইচ-১বি অথবা এল-১ শ্রেণির কর্মী, সেসব প্রতিষ্ঠানকে নির্দিষ্ট আবেদনের ক্ষেত্রে অতিরিক্ত ফি দিতে হবে।
এই ফি দুই ধরনের। এইচ-১বি আবেদনের ক্ষেত্রে অতিরিক্ত ৪ হাজার মার্কিন ডলার এবং এল-১ আবেদনের ক্ষেত্রে অতিরিক্ত ৪ হাজার ৫০০ মার্কিন ডলার দিতে হবে।
অর্থাৎ কোনো প্রতিষ্ঠানে ৫০ জন কর্মী থাকলেই অতিরিক্ত ফি দিতে হবে, বিষয়টি এমন নয়। প্রতিষ্ঠানের যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক কর্মীর সংখ্যা কমপক্ষে ৫০ হতে হবে এবং তাদের অর্ধেকের বেশি কর্মীকে নির্দিষ্ট এইচ-১বি অথবা এল-১ শ্রেণির অভিবাসন অবস্থানে থাকতে হবে।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এই ফি শুধু নতুন কর্মী নিয়োগের আবেদনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। ২০২৬ সালের ৯ সেপ্টেম্বর থেকে কার্যকর হওয়া নতুন চূড়ান্ত বিধি অনুযায়ী, শর্ত পূরণকারী প্রতিষ্ঠানের এইচ-১বি ও এল-১ কর্মীদের অবস্থানের মেয়াদ বাড়ানোর আবেদনেও অতিরিক্ত ফি প্রযোজ্য হবে।
আগে এই ফি মূলত নতুন কর্মীর জন্য প্রাথমিক আবেদন এবং একই শ্রেণিতে নিয়োগকর্তা পরিবর্তনের কিছু আবেদনের ক্ষেত্রে নেওয়া হতো। নতুন বিধির ফলে একই প্রতিষ্ঠানে কর্মরত কর্মীর অবস্থানের মেয়াদ বাড়ানোর ক্ষেত্রেও ফি দিতে হবে।
তবে সব ধরনের সংশোধিত আবেদনে এই ফি দিতে হবে না। কোনো প্রতিষ্ঠান যদি কর্মীর বর্তমান অনুমোদিত অবস্থানের মেয়াদ না বাড়িয়ে শুধু সংশোধিত আবেদন জমা দেয়, তাহলে সেই আবেদন অতিরিক্ত ফি থেকে অব্যাহতি পেতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রের হোমল্যান্ড সিকিউরিটি বিভাগ এই পরিবর্তনের মাধ্যমে নির্দিষ্ট বড় প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছ থেকে বায়োমেট্রিক প্রবেশ ও প্রস্থান ব্যবস্থার জন্য নির্ধারিত অর্থ সংগ্রহের নিয়ম কার্যকর করেছে। এই ব্যবস্থার উদ্দেশ্য সীমান্তে প্রবেশ ও বের হওয়ার তথ্য সংরক্ষণ এবং নিরাপত্তাব্যবস্থা জোরদার করা।
২০২৬ সালের ১০ আগস্ট এই বিষয়ে চূড়ান্ত বিধি প্রকাশ করা হয়। এরপর ৯ সেপ্টেম্বর থেকে তা কার্যকর হয়। বিধি অনুযায়ী, এই অতিরিক্ত ফি ২০২৭ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত প্রযোজ্য থাকার কথা, যদি কংগ্রেস এর মেয়াদ বাড়ানোর সিদ্ধান্ত না নেয়।
এখানে বিদেশি কর্মীদের জন্য একটি বিষয় বিশেষভাবে জানা জরুরি। অতিরিক্ত ৪ হাজার বা ৪ হাজার ৫০০ ডলারের ফি প্রত্যেক এইচ-১বি কিংবা এল-১ আবেদনকারীর ব্যক্তিগতভাবে দেওয়ার কথা নয়। এটি নির্দিষ্ট শর্ত পূরণকারী নিয়োগকর্তা প্রতিষ্ঠানের ওপর আরোপিত ফি। ফলে কোনো কর্মীকে এই অর্থ ব্যক্তিগতভাবে দিতে বলা হলে প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে ফিটির কারণ ও প্রযোজ্যতা সম্পর্কে পরিষ্কার ব্যাখ্যা নেওয়া উচিত।
অন্যদিকে, এইচ-২বি কিংবা ও-১ ভিসার আবেদনকারীদের জন্য এই অতিরিক্ত ৪ হাজার বা ৪ হাজার ৫০০ ডলারের ফি প্রযোজ্য নয়। কারণ নতুন অতিরিক্ত ফিটি নির্দিষ্ট শর্ত পূরণকারী প্রতিষ্ঠানের এইচ-১বি ও এল-১ আবেদনের জন্য নির্ধারিত। তবে এসব শ্রেণির আবেদনকারীদেরও নতুন আই-১২৯ ফরম ব্যবহারের নিয়ম মানতে হবে।
নতুন ফরমের পাশাপাশি আবেদন পাঠানোর ঠিকানাতেও পরিবর্তন এসেছে। ২০২৬ সালের ৭ অক্টোবর থেকে আই-১২৯ ফরমের ডাকযোগে পাঠানোর নির্দিষ্ট ঠিকানা পরিবর্তন করা হয়েছে। কর্তৃপক্ষ পুরোনো ঠিকানায় পাঠানো আবেদনের জন্য ৯ নভেম্বর পর্যন্ত বিশেষ সময় দিয়েছিল। যেসব আবেদন ৯ নভেম্বর বা তার আগে ডাকমোহরযুক্ত হয়ে পুরোনো ঠিকানায় পাঠানো হয়েছে, সেগুলোর ক্ষেত্রে এই বিশেষ সুযোগ প্রযোজ্য হতে পারে। তবে এরপর থেকে আবেদনকারীদের নিজ নিজ আবেদনের ধরন অনুযায়ী নতুন নির্ধারিত ঠিকানা ব্যবহার করতে হবে।
বাংলাদেশসহ বিভিন্ন দেশ থেকে যুক্তরাষ্ট্রে কাজ করতে আগ্রহী কর্মীদের জন্য এই পরিবর্তনগুলো গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে যারা যুক্তরাষ্ট্রের কোনো প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে কাজের অনুমতি পাওয়ার প্রক্রিয়ায় রয়েছেন, তাদের নিয়োগকর্তা ও অভিবাসন আইনজীবীর সঙ্গে যোগাযোগ করে আবেদনপত্রের নতুন সংস্করণ নিশ্চিত করা উচিত।
যারা ইতিমধ্যে আবেদন জমা দিয়েছেন, তাদেরও আবেদনের তারিখ, জমা দেওয়ার পদ্ধতি এবং ব্যবহৃত ফরমের সংস্করণ যাচাই করা দরকার। কারণ ৯ নভেম্বরের আগে জমা দেওয়া পুরোনো সংস্করণের আবেদন এবং ৯ নভেম্বর বা তার পরে জমা দেওয়া আবেদনের ক্ষেত্রে নিয়ম এক নয়।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, নতুন ফরমের নিয়ম মানা এবং অতিরিক্ত ফি সম্পর্কে সঠিক তথ্য জানা। ভুল ফরম ব্যবহার করলে আবেদন প্রত্যাখ্যানের ঝুঁকি রয়েছে। আবার প্রযোজ্য নয় এমন ফি দেওয়ার দাবি করা হলেও আবেদনকারী বা নিয়োগকর্তা অপ্রয়োজনীয় আর্থিক সমস্যায় পড়তে পারেন।
তাই যুক্তরাষ্ট্রে কাজের ভিসার আবেদন করার আগে সরকারি অভিবাসন বিভাগের ওয়েবসাইট থেকে সর্বশেষ ফরম, ফি এবং আবেদন পাঠানোর ঠিকানা যাচাই করা উচিত। প্রয়োজনে অভিজ্ঞ অভিবাসন আইনজীবীর পরামর্শ নেওয়াও গুরুত্বপূর্ণ।






মন্তব্য ০
লগইন করুন অথবা বিনা মূল্যে অ্যাকাউন্ট খুলুন আলোচনায় যোগ দিতে। নাম গোপন রেখেও মন্তব্য করতে পারবেন।
এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি করুন।