হোয়াইট হাউসের কর্মকর্তা স্টিফেন মিলার। ছবিটি সাম্প্রতিক সময়ের।
৯,৭৬৬ বার পড়া হয়েছে ৬ মিনিটে পড়ুন
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসনে বড় ধরনের পরিবর্তন এসেছে। হোয়াইট হাউসের নতুন প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পেতে যাচ্ছেন স্টিফেন মিলার। ২০২৬ সালের ৬ নভেম্বর শুক্রবার ট্রাম্প তাঁর নতুন সিদ্ধান্তের কথা ঘোষণা করেন। এর মধ্য দিয়ে দীর্ঘদিনের ঘনিষ্ঠ সহযোগী সুসি ওয়াইলসের অধ্যায় শেষ হতে যাচ্ছে। নতুন দায়িত্বে আসছেন এমন একজন ব্যক্তি, যিনি ট্রাম্পের রাজনৈতিক পরিকল্পনা, অভিবাসন নীতি এবং প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে দীর্ঘদিন ধরে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন।
মার্কিন সংবাদমাধ্যম অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস ও দ্য গার্ডিয়ানের প্রতিবেদন অনুযায়ী, আগামী ৯ নভেম্বর সোমবার থেকে স্টিফেন মিলার নতুন দায়িত্ব গ্রহণ করবেন। এতদিন তিনি হোয়াইট হাউসের উপপ্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। পাশাপাশি জাতীয় নিরাপত্তা ও অভিবাসনসংক্রান্ত নীতিনির্ধারণেও তাঁর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল। এই পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে ট্রাম্প প্রশাসনের শীর্ষ পর্যায়ে নতুন নেতৃত্বের সূচনা হতে যাচ্ছে। সুসি ওয়াইলসের স্থলাভিষিক্ত হচ্ছেন মিলার। সুসি ওয়াইলস ছিলেন যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে হোয়াইট হাউসের প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করা প্রথম নারী। তিনি ট্রাম্পের ২০২৪ সালের নির্বাচনী প্রচারণায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিলেন। দ্বিতীয় মেয়াদে ট্রাম্প ক্ষমতায় ফেরার পর তাঁকে প্রশাসনের প্রধান হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়।
ট্রাম্পের সঙ্গে দীর্ঘদিন কাজ করার অভিজ্ঞতা রয়েছে সুসি ওয়াইলসের। নির্বাচনী প্রচারণা পরিচালনা থেকে শুরু করে প্রশাসনের অভ্যন্তরীণ কার্যক্রম সমন্বয়—বিভিন্ন ক্ষেত্রে তাঁর ভূমিকা ছিল গুরুত্বপূর্ণ। তবে সাম্প্রতিক মধ্যবর্তী নির্বাচনে রিপাবলিকানদের বড় ধরনের পরাজয়ের পর প্রশাসনে পরিবর্তনের আলোচনা জোরালো হয়। এর কয়েক দিনের মধ্যেই ট্রাম্প নতুন প্রধান হিসেবে মিলারের নাম ঘোষণা করেন।
সুসি ওয়াইলস হোয়াইট হাউসের দায়িত্ব ছেড়ে ট্রাম্পের রাজনৈতিক সংগঠনের সঙ্গে কাজ করবেন বলে সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে। ট্রাম্প তাঁর কাজের প্রশংসা করেছেন এবং প্রশাসনে তাঁর অবদানের জন্য ধন্যবাদ জানিয়েছেন। নতুন নিয়োগের পর স্টিফেন মিলারকে নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনা আরও বেড়েছে। কারণ তিনি শুধু একজন প্রশাসনিক কর্মকর্তা নন, ট্রাম্পের রাজনৈতিক দর্শন ও অভিবাসন নীতির অন্যতম প্রধান পরিকল্পনাকারী হিসেবেও পরিচিত। মিলারের সঙ্গে ট্রাম্পের সম্পর্ক শুরু হয় ২০১৬ সালের নির্বাচনী প্রচারণার সময়। সেই সময় থেকেই তিনি ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ রাজনৈতিক সহযোগী হিসেবে কাজ করে আসছেন। প্রথম মেয়াদে তিনি প্রেসিডেন্টের জ্যেষ্ঠ নীতিবিষয়ক উপদেষ্টা ছিলেন। দ্বিতীয় মেয়াদে তাঁর ক্ষমতা ও দায়িত্ব আরও বিস্তৃত হয়েছে। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের অভিবাসনব্যবস্থা কঠোর করার ক্ষেত্রে মিলারের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সীমান্ত নিরাপত্তা জোরদার, অবৈধ অভিবাসীদের বহিষ্কার এবং অভিবাসন আইন কঠোরভাবে বাস্তবায়নের পক্ষে তিনি দীর্ঘদিন ধরে কাজ করছেন। ট্রাম্প প্রশাসনের ব্যাপক অভিবাসনবিরোধী কর্মসূচির অন্যতম প্রধান স্থপতি হিসেবে তাঁকে বিবেচনা করা হয়।
যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসরত অভিবাসীদের জন্য এই নিয়োগ বিশেষ গুরুত্ব বহন করছে। কারণ নতুন প্রধান হিসেবে মিলার দায়িত্ব গ্রহণ করলে অভিবাসনসংক্রান্ত নীতিতে তাঁর প্রভাব আরও বাড়তে পারে। বিশেষ করে সীমান্ত নিরাপত্তা, আশ্রয়প্রার্থীদের আবেদন, অবৈধ অভিবাসীদের বিরুদ্ধে অভিযান এবং অভিবাসন আইন বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে প্রশাসনের অবস্থান আরও কঠোর হতে পারে বলে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের ধারণা।
তবে নতুন পদে নিয়োগ পাওয়ার অর্থ এই নয় যে, সব অভিবাসন আইন সঙ্গে সঙ্গে পরিবর্তিত হয়ে যাবে। যুক্তরাষ্ট্রের অভিবাসনব্যবস্থা পরিচালিত হয় বিদ্যমান আইন, আদালতের সিদ্ধান্ত, কংগ্রেসের অনুমোদন এবং সংশ্লিষ্ট সরকারি সংস্থার মাধ্যমে। হোয়াইট হাউসের প্রধান হিসেবে মিলার প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারবেন, কিন্তু তাঁর একক সিদ্ধান্তে সব আইন পরিবর্তন করা সম্ভব নয়।
এদিকে সাবেক হোয়াইট হাউস প্রধান মার্ক মিডোজের নামে প্রচারিত একটি বক্তব্য নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া পোস্টে বলা হয়েছে, মিডোজের মতে, ক্যামেরার সামনে স্টিফেন মিলারকে যেভাবে দেখা যায়, বাস্তবে তাঁর ব্যক্তিত্বের আরেকটি দিক রয়েছে।
প্রচারিত বক্তব্য অনুযায়ী, মিডোজ বলেছেন, ব্যক্তিগত ও প্রশাসনিক কাজের ক্ষেত্রে মিলার চিন্তাশীল, গোছানো এবং কাজ সম্পন্ন করার বিষয়ে অত্যন্ত মনোযোগী। তাঁর ভাষ্য হিসেবে আরও বলা হয়েছে, মিলারের এই দিকটি সাধারণ মানুষ আগে দেখতে পাননি। এখানে একটি বিষয় পরিষ্কার করা জরুরি। মার্ক মিডোজ নিজেও ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদে হোয়াইট হাউসের প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছিলেন। ২০২০ সালের মার্চে তিনি এই পদে নিয়োগ পান। ফলে ট্রাম্প প্রশাসনের অভ্যন্তরীণ কার্যক্রম সম্পর্কে তাঁর ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা রয়েছে।
তবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া বক্তব্যের সম্পূর্ণ ভিডিও ও প্রেক্ষাপট নিশ্চিত না হওয়ায় মিডোজের কথাগুলোকে চূড়ান্তভাবে যাচাইকৃত উদ্ধৃতি বলা যাচ্ছে না। তাঁর নামে প্রচারিত বক্তব্য এবং ট্রাম্পের নতুন নিয়োগের ঘোষণাকে দুটি পৃথক বিষয় হিসেবে দেখা উচিত।
মিলারের ব্যক্তিত্ব নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক অঙ্গনে দীর্ঘদিন ধরেই বিতর্ক রয়েছে। ট্রাম্পের সমর্থকদের কাছে তিনি একজন দক্ষ, পরিশ্রমী ও নীতিনির্ধারণে দৃঢ় অবস্থানের মানুষ। তাঁদের মতে, তিনি প্রেসিডেন্টের পরিকল্পনাগুলো বাস্তবায়নের জন্য দ্রুত কাজ করতে পারেন। অন্যদিকে সমালোচকদের কাছে তিনি কঠোর অভিবাসন নীতির অন্যতম প্রধান মুখ এবং তাঁর রাজনৈতিক অবস্থান নিয়ে ব্যাপক উদ্বেগ রয়েছে।
২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে প্রকাশিত মার্কিন গণমাধ্যম পিবিএসের একটি প্রতিবেদনে বলা হয়, দ্বিতীয় মেয়াদে মিলারের প্রশাসনিক প্রভাব প্রথম মেয়াদের তুলনায় অনেক বেড়েছে। অভিবাসন নীতির পাশাপাশি পররাষ্ট্রনীতি ও জাতীয় নিরাপত্তাসংক্রান্ত বিষয়েও তাঁর ভূমিকা বিস্তৃত হয়েছে।
মিলারের নতুন দায়িত্বের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো প্রশাসনের বিভিন্ন বিভাগের মধ্যে সমন্বয়। হোয়াইট হাউসের প্রধান হিসেবে তাঁকে প্রেসিডেন্টের সিদ্ধান্ত সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের কাছে পৌঁছে দেওয়া, বিভিন্ন বিভাগের কাজের অগ্রগতি পর্যবেক্ষণ এবং প্রশাসনের দৈনন্দিন কার্যক্রম পরিচালনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে হবে। এই পদটি যুক্তরাষ্ট্রের প্রশাসনে অত্যন্ত প্রভাবশালী। প্রেসিডেন্টের সময়সূচি, গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক, নীতিগত সিদ্ধান্তের প্রস্তুতি এবং বিভিন্ন সরকারি বিভাগের সঙ্গে যোগাযোগের ক্ষেত্রে প্রধানের ভূমিকা থাকে। ফলে এই পদে কে দায়িত্ব পালন করছেন, তা প্রশাসনের সামগ্রিক কার্যক্রমে বড় প্রভাব ফেলতে পারে।
ট্রাম্পের জন্যও এই নিয়োগ রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ। মধ্যবর্তী নির্বাচনে দলের দুর্বল ফলাফলের পর তিনি প্রশাসনের কার্যক্রম আরও গতিশীল করতে চাইছেন বলে এই পরিবর্তনকে দেখা হচ্ছে। তবে নতুন নেতৃত্বের মাধ্যমে প্রশাসন কতটা সফল হবে, তা নির্ভর করবে আগামী দিনের সিদ্ধান্ত ও বাস্তবায়নের ওপর। যুক্তরাষ্ট্রের বাংলাদেশি ও অন্যান্য অভিবাসী সম্প্রদায়ের জন্যও বিষয়টি পর্যবেক্ষণ করা জরুরি। বিশেষ করে যাঁরা শিক্ষার্থী ভিসা, কর্মসংস্থানভিত্তিক ভিসা, পারিবারিক অভিবাসন কিংবা স্থায়ী বসবাসের অনুমতির জন্য অপেক্ষা করছেন, তাঁদের প্রশাসনের নতুন নীতিগত অবস্থান সম্পর্কে সচেতন থাকতে হবে। তবে নতুন নিয়োগের কারণে কারও বিদ্যমান ভিসা, স্থায়ী বসবাসের অনুমতি কিংবা নাগরিকত্বের আবেদন স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল হয়ে যাবে—এমন কোনো ঘোষণা পাওয়া যায়নি। তাই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অতিরঞ্জিত তথ্যের পরিবর্তে সরকারি ঘোষণা ও নির্ভরযোগ্য সংবাদমাধ্যমের তথ্য অনুসরণ করা উচিত। সব মিলিয়ে স্টিফেন মিলারের নিয়োগ ট্রাম্প প্রশাসনের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন। তাঁর দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা, প্রেসিডেন্টের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক এবং কঠোর অভিবাসন নীতিতে ভূমিকার কারণে নতুন দায়িত্বে তাঁর প্রতিটি সিদ্ধান্তের দিকে নজর থাকবে যুক্তরাষ্ট্রসহ আন্তর্জাতিক মহলের।
মার্ক মিডোজের নামে প্রচারিত প্রশংসাসূচক বক্তব্য নতুন প্রধানকে নিয়ে সমর্থকদের আগ্রহ বাড়িয়েছে। তবে প্রকৃত পরীক্ষা শুরু হবে ৯ নভেম্বর দায়িত্ব গ্রহণের পর। প্রশাসন পরিচালনা, বিভিন্ন বিভাগের মধ্যে সমন্বয় এবং প্রেসিডেন্টের পরিকল্পনা বাস্তবায়নে মিলার কতটা সফল হন, সেটিই এখন দেখার বিষয়।
মন্তব্য ০
লগইন করুন অথবা বিনা মূল্যে অ্যাকাউন্ট খুলুন আলোচনায় যোগ দিতে। নাম গোপন রেখেও মন্তব্য করতে পারবেন।
এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি করুন।