হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক করতে যুক্তরাষ্ট্র-ইরানকে আলোচনার আহ্বান চীন ও ওমানের
মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনা কমাতে নতুন উদ্যোগ নিয়েছে চীন ও ওমান। হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক করা এবং যুক্তরাষ্ট্র-ইরানের মধ্যে আলোচনা শুরুর আহ্বান জানিয়েছে দুই দেশ।
মধ্যপ্রাচ্যে চলমান উত্তেজনা কমাতে নতুন কূটনৈতিক উদ্যোগ নিয়েছে চীন ও ওমান। হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক করা এবং যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে আবার আলোচনা শুরুর আহ্বান জানিয়েছে দেশ দুটি। একই সঙ্গে মধ্যপ্রাচ্য ও উপসাগরীয় অঞ্চল যেন বিশ্বের বড় শক্তিগুলোর প্রতিযোগিতা ও সংঘাতের জায়গায় পরিণত না হয়, সে বিষয়েও সতর্ক করেছেন চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং। সোমবার (২ নভেম্বর) চীনের রাজধানী বেইজিংয়ে ওমানের সুলতান হাইথাম বিন তারিকের সঙ্গে বৈঠকে এসব কথা বলেন শি জিনপিং। ওমানের সুলতানের দুই দিনের রাষ্ট্রীয় সফর উপলক্ষে এই বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। ১৯৭৮ সালে দুই দেশের কূটনৈতিক সম্পর্ক প্রতিষ্ঠার পর এই প্রথম কোনো ওমানি সুলতান চীন সফর করলেন। বৈঠকে শি জিনপিং বলেন, মধ্যপ্রাচ্য ও উপসাগরীয় অঞ্চল যেন বড় শক্তিগুলোর প্রতিযোগিতা এবং রাজনৈতিক বিরোধের ক্ষেত্র হয়ে না ওঠে। এ অঞ্চলে শান্তি ও স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে সব পক্ষের সম্মিলিত উদ্যোগ প্রয়োজন। তিনি আরও বলেন, আরব দেশগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ ও সহযোগিতা বাড়াতে চীন প্রস্তুত। বিশেষ করে উপসাগরীয় সহযোগিতা পরিষদের সদস্য দেশগুলোর সঙ্গে কাজ করে এ অঞ্চলে স্থায়ী শান্তি ও নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠায় ভূমিকা রাখতে চায় বেইজিং।
বৈঠকের পর চীন ও ওমান একটি যৌথ বিবৃতি প্রকাশ করে। এতে মোট ২০টি বিষয়ে দুই দেশের অবস্থান তুলে ধরা হয়। এর মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোর একটি হলো হরমুজ প্রণালি দিয়ে স্বাভাবিক ও নিরাপদে জাহাজ চলাচল আবার চালু করা। বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ তেল পরিবহন পথ হরমুজ প্রণালি। মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশ থেকে এই পথ দিয়ে বিপুল পরিমাণ জ্বালানি তেল ও অন্যান্য পণ্য বিশ্বের বিভিন্ন দেশে যায়। ফলে এই পথে জাহাজ চলাচল বাধাগ্রস্ত হলে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম, পরিবহন খরচ এবং পণ্যের সরবরাহে প্রভাব পড়তে পারে। বিশেষ করে যেসব দেশ মধ্যপ্রাচ্যের তেলের ওপর নির্ভরশীল, তাদের জন্য পরিস্থিতি আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
যৌথ বিবৃতিতে চীন ও ওমান যুক্তরাষ্ট্র এবং ইরানকে শান্তিপূর্ণ সমাধানের পথে এগিয়ে আসার আহ্বান জানিয়েছে। দুই দেশ সংঘাত বন্ধ, যুদ্ধের ঝুঁকি কমানো এবং আলোচনার মাধ্যমে বিরোধ মেটানোর ওপর গুরুত্ব দিয়েছে। পাশাপাশি আগের সমঝোতায় ফিরে গিয়ে আবার আলোচনা ও আলোচনার মাধ্যমে একটি পূর্ণাঙ্গ চুক্তিতে পৌঁছানোর আহ্বান জানানো হয়েছে। এদিকে মধ্যপ্রাচ্যে কূটনৈতিক তৎপরতা বাড়ানোর অংশ হিসেবে চীনের বিশেষ দূত ঝাই জুন চলতি নভেম্বর মাসে ইরান, ওমান ও সৌদি আরব সফর করবেন বলে জানিয়েছে দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। তাঁর এই সফরের উদ্দেশ্য হলো সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ বাড়ানো এবং আঞ্চলিক উত্তেজনা কমাতে আলোচনার পথ খুঁজে বের করা।
অন্যদিকে ওমানের সুলতান হাইথাম বিন তারিক বলেছেন, আঞ্চলিক বিরোধের সমাধান হওয়া উচিত শান্তিপূর্ণ উপায়ে। এ ক্ষেত্রে রাষ্ট্রগুলোর সার্বভৌমত্ব, নিরাপত্তা এবং আন্তর্জাতিক আইনকে সম্মান করা প্রয়োজন। তিনি মধ্যপ্রাচ্যে চীনের ভূমিকার প্রশংসা করেন এবং অঞ্চলটিতে দীর্ঘস্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠায় বেইজিংয়ের আরও সক্রিয় ভূমিকা প্রত্যাশা করেন। বৈঠকে শুধু মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা নয়, দুই দেশের অর্থনৈতিক সম্পর্ক নিয়েও আলোচনা হয়েছে। চীন ও ওমান জ্বালানি, তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাস খাতে সহযোগিতা বাড়ানোর বিষয়ে একমত হয়েছে। পাশাপাশি সৌরবিদ্যুৎ, বায়ুবিদ্যুৎ, বিদ্যুৎ সরবরাহব্যবস্থা এবং জ্বালানি সংরক্ষণ প্রযুক্তিতে একসঙ্গে কাজ করার পরিকল্পনা রয়েছে।
এ ছাড়া কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ডিজিটাল প্রযুক্তি, বিনিয়োগ, বাণিজ্য এবং অর্থনৈতিক সহযোগিতা বাড়ানোর বিষয়েও দুই দেশের মধ্যে বিভিন্ন চুক্তি ও সমঝোতা হয়েছে। স্থানীয় মুদ্রায় লেনদেন এবং ডিজিটাল অর্থ পরিশোধের ব্যবস্থায় সহযোগিতা বাড়ানোর বিষয়টিও এসব উদ্যোগের মধ্যে রয়েছে। চীন বর্তমানে ওমানের সবচেয়ে বড় বাণিজ্যিক অংশীদার। দুই দেশের মধ্যে জ্বালানি ও বাণিজ্যিক সম্পর্ক দীর্ঘদিনের। তাই মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা পরিস্থিতি এবং হরমুজ প্রণালির স্বাভাবিক চলাচল দুই দেশের অর্থনৈতিক স্বার্থের সঙ্গেও জড়িত।
এই বৈঠক গুরুত্বপূর্ণ হওয়ার আরেকটি কারণ হলো, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে চলমান সংঘাতের মধ্যে চীন মধ্যপ্রাচ্যে নিজের কূটনৈতিক ভূমিকা বাড়ানোর চেষ্টা করছে। তবে এই উদ্যোগের মাধ্যমে সংঘাতের অবসান হবে কি না, তা এখনো নিশ্চিত নয়। চীন ও ওমানের এই বৈঠকে মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা, হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল এবং যুক্তরাষ্ট্র-ইরান আলোচনার বিষয়গুলো বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে। এসব উদ্যোগ বাস্তবে কতটা কার্যকর হয়, এখন সেদিকেই নজর আন্তর্জাতিক মহলের।






মন্তব্য ০
লগইন করুন অথবা বিনা মূল্যে অ্যাকাউন্ট খুলুন আলোচনায় যোগ দিতে। নাম গোপন রেখেও মন্তব্য করতে পারবেন।
এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি করুন।