জাপানের অর্থমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠকে অবকাঠামো, বাণিজ্য ও বিকল্প অর্থায়নে সহযোগিতা বাড়ানোর বিষয়ে আলোচনা করেছেন বাংলাদেশের অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী।
বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন, অবকাঠামো নির্মাণ এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্য সম্প্রসারণে জাপানের সঙ্গে সহযোগিতা আরও বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এ লক্ষ্যে জাপানের অর্থমন্ত্রী সাতসুকি কাতায়ামার সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক বৈঠক করেছেন বাংলাদেশের অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। শুক্রবার (৩০ অক্টোবর) জাপানের রাজধানী টোকিওতে দেশটির অর্থমন্ত্রীর কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত এই বৈঠকে দুই দেশের দীর্ঘদিনের অর্থনৈতিক সম্পর্ক আরও শক্তিশালী করার পাশাপাশি প্রচলিত বিদেশি বিনিয়োগের বাইরে বিকল্প অর্থায়নের মাধ্যমে সহযোগিতা বাড়ানোর বিষয়ে গুরুত্ব দেওয়া হয়।
বাংলাদেশের অর্থ মন্ত্রণালয়ের সংবাদ বিজ্ঞপ্তির বরাত দিয়ে বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থা জানিয়েছে, বৈঠকে জাপানের অর্থ মন্ত্রণালয়ের উপমন্ত্রী আতসুসি মিমুরাও উপস্থিত ছিলেন। দুই দেশের প্রতিনিধিরা সৌহার্দ্যপূর্ণ পরিবেশে বাংলাদেশের অবকাঠামোগত উন্নয়ন, বাণিজ্য সম্প্রসারণ এবং অর্থনৈতিক অংশীদারত্বের নতুন ক্ষেত্র নিয়ে আলোচনা করেন। বৈঠকে দুই দেশের প্রতিনিধিরা বাংলাদেশ ও জাপানের দীর্ঘদিনের বন্ধুত্বপূর্ণ এবং দৃঢ় অর্থনৈতিক সম্পর্কের কথা স্মরণ করেন। স্বাধীনতার পর থেকেই বাংলাদেশের উন্নয়ন কার্যক্রমে জাপান গুরুত্বপূর্ণ সহযোগীর ভূমিকা পালন করে আসছে। সময়ের সঙ্গে দুই দেশের সম্পর্ক শুধু উন্নয়ন সহায়তার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি; বাণিজ্য, বিনিয়োগ, শিল্পায়ন, যোগাযোগ, শিক্ষা, প্রযুক্তি এবং বিভিন্ন সামাজিক উন্নয়নমূলক খাতেও সহযোগিতা বিস্তৃত হয়েছে। আলোচনায় বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অগ্রযাত্রাকে আরও গতিশীল করতে বিদ্যমান অংশীদারত্বকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাওয়ার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরা হয়। বিশেষ করে দেশের বড় অবকাঠামো প্রকল্প বাস্তবায়ন, ব্যবসা-বাণিজ্যের সুযোগ বাড়ানো এবং উন্নয়ন কার্যক্রমে অর্থের জোগান নিশ্চিত করার বিষয়গুলো গুরুত্ব পায়। বৈঠকের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ আলোচ্য বিষয় ছিল বিকল্প অর্থায়ন। সাধারণত বিদেশি বিনিয়োগের মাধ্যমে কোনো দেশে বিদেশি প্রতিষ্ঠান সরাসরি ব্যবসা, কারখানা কিংবা উৎপাদন খাতে অর্থ বিনিয়োগ করে। কিন্তু বড় উন্নয়ন প্রকল্পের অর্থায়নের জন্য শুধু এ ধরনের বিনিয়োগের ওপর নির্ভর না করে আরও বিভিন্ন আর্থিক ব্যবস্থা কাজে লাগানোর সুযোগ রয়েছে। বাংলাদেশ ও জাপান সেই বিকল্প পথগুলোতে সহযোগিতা বাড়ানোর বিষয়ে আলোচনা করেছে। বিকল্প অর্থায়নের মধ্যে উন্নয়ন সহযোগীদের ঋণ, অবকাঠামো প্রকল্পে যৌথ বিনিয়োগ, সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের অংশীদারত্ব, দীর্ঘমেয়াদি প্রকল্পভিত্তিক অর্থায়ন এবং বিভিন্ন আন্তর্জাতিক আর্থিক প্রতিষ্ঠানের সহায়তা থাকতে পারে। তবে এবারের বৈঠকে এসব ব্যবস্থার কোনটি নির্দিষ্টভাবে গ্রহণ করা হবে, সে বিষয়ে বিস্তারিত ঘোষণা দেওয়া হয়নি। বাংলাদেশের জন্য বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ হওয়ার কারণ হলো, দেশের অবকাঠামোগত উন্নয়ন, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের সম্প্রসারণ, যোগাযোগব্যবস্থার আধুনিকায়ন এবং শিল্পায়নের জন্য দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়ন প্রয়োজন। এসব প্রকল্পে অর্থের পাশাপাশি উন্নত প্রযুক্তি, দক্ষ জনবল এবং আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতারও প্রয়োজন হয়। জাপানের সঙ্গে সহযোগিতা বাড়লে এসব ক্ষেত্রে নতুন সুযোগ তৈরি হতে পারে। দুই দেশের আলোচনায় বাণিজ্য সম্প্রসারণও বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে। জাপান বিশ্বের অন্যতম উন্নত শিল্পোন্নত অর্থনীতি। দেশটিতে গাড়ি, যন্ত্রপাতি, ইলেকট্রনিকস, প্রযুক্তি এবং বিভিন্ন শিল্পপণ্যের বড় বাজার রয়েছে। অন্যদিকে বাংলাদেশ তৈরি পোশাক, চামড়াজাত পণ্য, ওষুধ, কৃষিপণ্য এবং বিভিন্ন রপ্তানিযোগ্য পণ্যের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক বাজারে নিজেদের অবস্থান শক্তিশালী করার চেষ্টা করছে। জাপানের বাজারে বাংলাদেশের পণ্যের প্রবেশ বাড়ানো গেলে রপ্তানি আয় বৃদ্ধির পাশাপাশি নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগও তৈরি হতে পারে। বিশেষ করে তৈরি পোশাকের বাইরে অন্যান্য রপ্তানি খাতকে শক্তিশালী করা বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। এ ক্ষেত্রে জাপানের ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে যৌথ উদ্যোগ, প্রযুক্তি বিনিময় এবং উৎপাদন খাতে সহযোগিতা কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে। বৈঠকে উভয় পক্ষ বিদ্যমান অর্থনৈতিক সম্পর্ককে আরও গতিশীল করার পাশাপাশি নতুন নতুন খাতে একসঙ্গে কাজ করার বিষয়ে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়ার ব্যাপারে একমত হয়েছে। তবে আলোচনার ভিত্তিতে নতুন কোনো প্রকল্পের নাম, অর্থায়নের পরিমাণ কিংবা বাস্তবায়নের সময়সূচি প্রকাশ করা হয়নি। ফলে এই বৈঠককে ভবিষ্যৎ সহযোগিতার পথ তৈরির একটি গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক উদ্যোগ হিসেবে দেখা হচ্ছে। বৈঠকে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর বিনিয়োগ ও পুঁজিবাজারবিষয়ক বিশেষ সহকারী তানভীর গনি এবং এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে কর্মসংস্থানবিষয়ক বিশেষ সহকারী শাকিরুল ইসলাম খান উপস্থিত ছিলেন। এ ছাড়া দুই দেশের অর্থনৈতিক ও সরকারি পর্যায়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারাও অংশ নেন।
বাংলাদেশ ও জাপানের সম্পর্কের সাম্প্রতিক অগ্রগতির সঙ্গে এই বৈঠকের একটি গুরুত্বপূর্ণ যোগসূত্র রয়েছে। এর মাত্র তিন দিন আগে, ২৭ অক্টোবর জাপানের প্রধানমন্ত্রী তাকাইচি সানায়ে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে টোকিওতে শীর্ষ বৈঠক করেন। জাপানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের প্রকাশিত সরকারি বিবরণ অনুযায়ী, ওই বৈঠকে দুই দেশের কৌশলগত অংশীদারত্ব আরও শক্তিশালী করার বিষয়ে একমত হন দুই নেতা। সেই শীর্ষ বৈঠকে বঙ্গোপসাগরীয় শিল্প প্রবৃদ্ধি বলয়কে নতুনভাবে সাজিয়ে ‘অভিন্ন সমৃদ্ধির জন্য বঙ্গোপসাগরীয় শিল্প প্রবৃদ্ধি বলয়’ নামে কৌশলগত সহযোগিতার উদ্যোগ নেওয়ার বিষয়ে সম্মতি জানানো হয়। এর মূল লক্ষ্য যোগাযোগব্যবস্থা শক্তিশালী করা, দুর্যোগ ও ভূরাজনৈতিক ঝুঁকি মোকাবিলা, সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্বের মাধ্যমে অর্থনৈতিক সুযোগ তৈরি এবং আঞ্চলিক শান্তি ও স্থিতিশীলতা বজায় রাখা। ওই শীর্ষ বৈঠকের আরেকটি উল্লেখযোগ্য বিষয় ছিল জাপানি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর বাংলাদেশে বিনিয়োগের পরিকল্পনা। জাপানের প্রধানমন্ত্রী জানান, আগামী পাঁচ বছরে বাংলাদেশে জাপানি প্রতিষ্ঠানগুলোর সম্ভাব্য বেসরকারি বিনিয়োগের পরিমাণ এক লাখ কোটি ইয়েন পর্যন্ত হতে পারে। এতে প্রায় দুই লাখ কর্মসংস্থান সৃষ্টির প্রত্যাশাও তুলে ধরা হয়।
জাপানের সরকারি বিবরণে আরও বলা হয়েছে, বাংলাদেশে জাপানি ব্যবসায়ীদের বিনিয়োগের পরিবেশ উন্নত করতে দুই দেশের সরকার একসঙ্গে কাজ করবে। এ লক্ষ্যে একটি ব্যবসায়ী প্রতিনিধিদল বাংলাদেশে পাঠানোর আগ্রহও প্রকাশ করেন জাপানের প্রধানমন্ত্রী। উল্লেখ্য, এই বিনিয়োগের পরিমাণ একটি ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা ও প্রত্যাশিত হিসাব; পুরো অর্থ ইতিমধ্যে বিনিয়োগ হয়েছে, এমন নয়। দুই দেশের প্রধানমন্ত্রীর বৈঠকে বাংলাদেশ-জাপান অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব চুক্তি দ্রুত কার্যকর করার বিষয়েও একমত হন তাঁরা। এই চুক্তি কার্যকর হলে দুই দেশের মধ্যে পণ্য ও সেবার বাণিজ্য, বিনিয়োগ এবং ব্যবসায়িক সহযোগিতা বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হতে পারে। কৃষি, বনজ ও মৎস্যপণ্য, পরিবেশ, জলবায়ু পরিবর্তন এবং বিমান চলাচলের মতো ক্ষেত্রেও সহযোগিতা বাড়ানোর বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। এ ছাড়া বাংলাদেশের সামুদ্রিক নিরাপত্তা সক্ষমতা বাড়াতে জাপান একটি টহল জাহাজ দেওয়ার সিদ্ধান্তের কথাও শীর্ষ বৈঠকে জানায়। অর্থনৈতিক সহযোগিতার পাশাপাশি নিরাপত্তা, যোগাযোগ এবং আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার ক্ষেত্রেও দুই দেশের সম্পর্ক যে বিস্তৃত হচ্ছে, এসব সিদ্ধান্ত তারই ইঙ্গিত দেয়। বাংলাদেশের উন্নয়ন সহযোগীদের মধ্যে জাপানের অবস্থান দীর্ঘদিন ধরেই গুরুত্বপূর্ণ। পদ্মা সেতু রেল সংযোগ, ঢাকার গণপরিবহনব্যবস্থা, মাতারবাড়ী বিদ্যুৎ ও গভীর সমুদ্রবন্দর প্রকল্পসহ বিভিন্ন বড় উন্নয়ন উদ্যোগে জাপানের অর্থায়ন ও সহযোগিতা রয়েছে। এসব প্রকল্প বাংলাদেশের যোগাযোগব্যবস্থা, শিল্পায়ন এবং অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত। তবে প্রতিটি প্রকল্পের অর্থায়ন ও বাস্তবায়নের ধরন আলাদা। বিশেষ করে ঢাকার গণপরিবহনব্যবস্থার উন্নয়নে জাপানের সহযোগিতা রাজধানীর যানজট কমানো এবং যাত্রী পরিবহনের সক্ষমতা বাড়ানোর ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। অন্যদিকে মাতারবাড়ী প্রকল্পকে ঘিরে বিদ্যুৎ উৎপাদন, সমুদ্রবন্দর, শিল্পকারখানা এবং আঞ্চলিক বাণিজ্য সম্প্রসারণের সম্ভাবনা রয়েছে। এসব উদ্যোগ পুরোপুরি কার্যকর হলে দেশের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব পড়তে পারে। বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য জাপানের সঙ্গে সম্পর্ক আরও শক্তিশালী হওয়ার আরেকটি কারণ হলো বিদেশি বিনিয়োগের উৎস বাড়ানো। কোনো একটি দেশ বা কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীল না থেকে বিভিন্ন দেশের বিনিয়োগ আকৃষ্ট করতে পারলে অর্থনীতির ঝুঁকি কমানো সম্ভব। জাপানের মতো প্রযুক্তিগতভাবে উন্নত দেশের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি অংশীদারত্ব বাংলাদেশের উৎপাদনশীলতা ও শিল্পের মান উন্নয়নে সহায়ক হতে পারে।
তবে বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতি বাস্তবে রূপ দিতে হলে বাংলাদেশের ব্যবসায়িক পরিবেশ উন্নত করা জরুরি। জমি ও অবকাঠামো সহজলভ্য করা, বিদ্যুৎ ও জ্বালানির নির্ভরযোগ্য সরবরাহ নিশ্চিত করা, আমলাতান্ত্রিক জটিলতা কমানো, নীতির ধারাবাহিকতা বজায় রাখা এবং বিনিয়োগকারীদের আইনি নিরাপত্তা দেওয়া গুরুত্বপূর্ণ। পাশাপাশি প্রকল্প অনুমোদন ও বাস্তবায়নের প্রক্রিয়া স্বচ্ছ এবং সময়োপযোগী করতে হবে। অর্থায়নের ক্ষেত্রেও সতর্কতা প্রয়োজন। উন্নয়ন প্রকল্পের জন্য বিদেশি ঋণ বা অন্যান্য আর্থিক সহায়তা গ্রহণের আগে সুদের হার, পরিশোধের সময়সীমা, বৈদেশিক মুদ্রার ঝুঁকি এবং প্রকল্প থেকে প্রত্যাশিত আয় বিবেচনা করা জরুরি। শুধু অর্থ পাওয়া নয়, সেই অর্থ কীভাবে দেশের উৎপাদন ও কর্মসংস্থান বাড়াবে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ।
মন্তব্য ০
লগইন করুন অথবা বিনা মূল্যে অ্যাকাউন্ট খুলুন আলোচনায় যোগ দিতে। নাম গোপন রেখেও মন্তব্য করতে পারবেন।
এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি করুন।