জার্মানির দীর্ঘমেয়াদি অংশীদারত্বের অঙ্গীকার, বাংলাদেশের সঙ্গে সহযোগিতা বাড়ানোর বার্তা
জলবায়ু, জ্বালানি, অর্থনীতি ও টেকসই উন্নয়নে বাংলাদেশের সঙ্গে সহযোগিতা আরও জোরদার করতে চায় জার্মানি।
বাংলাদেশের সঙ্গে নির্ভরযোগ্য ও দীর্ঘমেয়াদি অংশীদারত্ব বজায় রাখার অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেছে জার্মানি। দেশটির অর্থনৈতিক সহযোগিতা ও উন্নয়নবিষয়ক উপমন্ত্রী ড. বারবেল কোফলার বলেছেন, বৈশ্বিক নানা চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা এবং টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করতে বাংলাদেশের সঙ্গে সহযোগিতা আরও জোরদার করতে চায় তাঁর দেশ। জলবায়ু পরিবর্তন, জ্বালানি নিরাপত্তা, অর্থনৈতিক চাপ এবং তরুণদের জন্য কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করার বিষয়গুলোতে তিনি বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছেন।
ঢাকায় ফ্রাঙ্কো-জার্মান দূতাবাসে জার্মান পুনরেকত্রীকরণ দিবস উপলক্ষে আয়োজিত এক সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে এসব কথা বলেন বারবেল কোফলার। অনুষ্ঠানে বাংলাদেশের পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তনমন্ত্রী আবদুল আউয়াল মিন্টু প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন। এতে বাংলাদেশ ও জার্মানির সরকারি কর্মকর্তা, কূটনীতিক, নাগরিক সমাজের প্রতিনিধি এবং বিভিন্ন পেশার বিশিষ্ট ব্যক্তিরা অংশ নেন।
বারবেল কোফলার বলেন, “আমরা দীর্ঘমেয়াদে বাংলাদেশের পাশে থাকতে এসেছি।” তাঁর বক্তব্যে দুই দেশের দীর্ঘদিনের সম্পর্ক ধরে রাখার পাশাপাশি ভবিষ্যতের অভিন্ন চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় একসঙ্গে কাজ করার গুরুত্ব উঠে আসে। তিনি জানান, জার্মানি বাংলাদেশের সরকার, বেসরকারি খাত ও নাগরিক সমাজের সঙ্গে উন্নয়ন সহযোগিতার বিভিন্ন ক্ষেত্রে কাজ করে আসছে। প্রতিকূল আন্তর্জাতিক পরিস্থিতির মধ্যেও দুই দেশের অংশীদারত্বে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে বলেও তিনি মন্তব্য করেন।
বাংলাদেশ ও জার্মানির সহযোগিতার গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রগুলোর মধ্যে রয়েছে পরিবেশ সুরক্ষা, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলা এবং জ্বালানি খাতের উন্নয়ন। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বাংলাদেশ বন্যা, ঘূর্ণিঝড়, উপকূলীয় ঝুঁকি ও অন্যান্য প্রাকৃতিক দুর্যোগের মুখোমুখি হচ্ছে। এসব ঝুঁকি কমাতে জলবায়ুর সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়ার সক্ষমতা বাড়ানো, প্রয়োজনীয় অবকাঠামো তৈরি এবং পরিবেশবান্ধব উন্নয়ন উদ্যোগ গুরুত্বপূর্ণ। জার্মান উপমন্ত্রী জলবায়ু অভিযোজন ও জলবায়ুজনিত ঝুঁকি মোকাবিলায় দুই দেশের যৌথ প্রচেষ্টার কথা তুলে ধরেন।
জ্বালানি নিরাপত্তার বিষয়টিও তাঁর বক্তব্যে বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে। বিশ্বজুড়ে সংঘাত ও ভূরাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে জ্বালানি সরবরাহ, পণ্যের দাম এবং খাদ্যনিরাপত্তার ওপর চাপ তৈরি হচ্ছে। এর প্রভাব বাংলাদেশসহ বিভিন্ন দেশের পরিবার ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের ওপর পড়ছে। কোফলার স্বীকার করেন, খাদ্য ও জ্বালানির ক্রমবর্ধমান দাম বাংলাদেশের মানুষের জন্য উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। জার্মানিও একই ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হচ্ছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
তিনি বলেন, এসব সমস্যার কথা শুধু তুলে ধরাই যথেষ্ট নয়; বরং কীভাবে সম্মিলিত উদ্যোগের মাধ্যমে এগুলো মোকাবিলা করা যায়, সে বিষয়ে আলোচনা ও বাস্তব পদক্ষেপ প্রয়োজন। তাঁর মতে, বাংলাদেশের সঙ্গে জার্মানি এবং ইউরোপীয় অংশীদারদের ঘনিষ্ঠ সহযোগিতা বৈশ্বিক সংকট মোকাবিলায় সহায়ক হতে পারে।
বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়েও গুরুত্বপূর্ণ বক্তব্য দেন জার্মান উপমন্ত্রী। স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে বাংলাদেশের উত্তরণের প্রস্তুতির জন্য তিনি অভিনন্দন জানান। তবে এই উত্তরণকে টেকসই করতে অর্থনৈতিক, আর্থিক, সামাজিক ও পরিবেশগত সংস্কার অব্যাহত রাখার প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দেন। আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে প্রতিযোগিতা ধরে রাখা, বিনিয়োগ আকর্ষণ এবং অর্থনীতির ভিত্তি শক্তিশালী করার ক্ষেত্রে এসব সংস্কার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্ভাব্য মুক্তবাণিজ্য চুক্তি নিয়েও তাঁর বক্তব্যে গুরুত্ব পেয়েছে। এ ধরনের চুক্তি নিয়ে আলোচনা এগিয়ে নিতে হলে অর্থনৈতিক প্রস্তুতি, নীতিগত সংস্কার এবং সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর সঙ্গে ধারাবাহিক যোগাযোগ প্রয়োজন হবে। তবে জার্মান উপমন্ত্রীর বক্তব্যে নতুন কোনো মুক্তবাণিজ্য চুক্তি স্বাক্ষর, নির্দিষ্ট বিনিয়োগের অঙ্ক কিংবা নতুন আর্থিক সহায়তা প্যাকেজ ঘোষণার তথ্য পাওয়া যায়নি। ফলে তাঁর বক্তব্যকে দুই দেশের সহযোগিতা অব্যাহত রাখা ও ভবিষ্যৎ সম্পর্ক জোরদারের অঙ্গীকার হিসেবে দেখা হচ্ছে।
কর্মসংস্থান ও তরুণদের ভবিষ্যৎ নিয়েও গুরুত্ব দিয়েছেন কোফলার। তাঁর মতে, জলবায়ু পরিবর্তন, ডিজিটাল প্রযুক্তির দ্রুত বিকাশ এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার প্রসার বিশ্বজুড়ে নতুন সম্ভাবনার পাশাপাশি চ্যালেঞ্জও তৈরি করছে। এই পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মেলাতে দক্ষতা উন্নয়ন, মানসম্মত কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং তরুণদের জন্য উন্নত ভবিষ্যতের সুযোগ তৈরি করা জরুরি।
বাংলাদেশে তৃতীয়বারের মতো সফরে এসে বারবেল কোফলার নাগরিক সমাজ, শ্রমিক সংগঠন, উদ্যোক্তা, সরকারি কর্মকর্তা, মন্ত্রী ও রাজনৈতিক প্রতিনিধিদের সঙ্গে আলোচনা করেছেন। এসব মতবিনিময়ের মাধ্যমে বাংলাদেশের বাস্তব পরিস্থিতি এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে মানুষের প্রত্যাশা সম্পর্কে জানার সুযোগ পেয়েছেন বলে তিনি উল্লেখ করেন।
১৯৯০ সালে পূর্ব ও পশ্চিম জার্মানির পুনরেকত্রীকরণ স্মরণে পালিত জার্মান ঐক্য দিবসের তাৎপর্য তুলে ধরে কোফলার বলেন, শান্তি, সংহতি এবং বিভাজন অতিক্রমের মূল্যবোধ আন্তর্জাতিক সহযোগিতার জন্য গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশের সঙ্গে জার্মানির দীর্ঘমেয়াদি সম্পর্কেও এসব মূল্যবোধ ভূমিকা রাখতে পারে।
জার্মানির এই বক্তব্য বাংলাদেশের সঙ্গে বিদ্যমান উন্নয়ন সহযোগিতা ধরে রাখা এবং ভবিষ্যতে জলবায়ু, জ্বালানি, অর্থনীতি ও কর্মসংস্থানের মতো গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে একসঙ্গে কাজ করার আগ্রহের ইঙ্গিত দেয়। তবে এই অঙ্গীকার বাস্তবে কতটা নতুন প্রকল্প, বিনিয়োগ বা সহায়তায় রূপ নেয়, তা নির্ভর করবে পরবর্তী আলোচনা ও বাস্তবায়নের ওপর।






মন্তব্য ০
লগইন করুন অথবা বিনা মূল্যে অ্যাকাউন্ট খুলুন আলোচনায় যোগ দিতে। নাম গোপন রেখেও মন্তব্য করতে পারবেন।
এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি করুন।