ইসরায়েলের নির্বাচনে নেই স্পষ্ট বিজয়ী, সরকার গঠন নিয়ে বাড়ছে রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা
েতানিয়াহু ও আইজেনকটের শিবির সংখ্যাগরিষ্ঠতা থেকে দূরে, আরব দলগুলোর সমর্থন ও জোট আলোচনা নির্ধারণ করতে পারে ইসরায়েলের পরবর্তী সরকারের ভবিষ্যৎ।
ইসরায়েলে ২৭ অক্টোবর অনুষ্ঠিত সাধারণ নির্বাচনের প্রাথমিক ফলাফল দেশটির রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে। প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর নেতৃত্বাধীন শাসক জোট এবং সাবেক সেনাপ্রধান গাদি আইজেনকটের নেতৃত্বাধীন বিরোধী শিবির কোনো পক্ষই এককভাবে সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিশ্চিত করতে পারেনি বলে ভোট-পরবর্তী জরিপে ইঙ্গিত পাওয়া গেছে। ফলে পরবর্তী সরকার কে গঠন করবেন, কোন দল কার সঙ্গে জোট বাঁধবে এবং শেষ পর্যন্ত নতুন নির্বাচন প্রয়োজন হবে কি না, তা নিয়ে শুরু হয়েছে আলোচনা। তবে প্রাথমিক জরিপের আসনসংখ্যা চূড়ান্ত সরকারি ফল নয়। তাই এই মুহূর্তে কোনো পক্ষকে বিজয়ী ঘোষণা করা সমীচীন হবে না।
বার্তা সংস্থা এপি এবং সংবাদমাধ্যম আল জাজিরার ২৭ অক্টোবর প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইসরায়েলের ১২০ সদস্যের সংসদে নেতানিয়াহুর নেতৃত্বাধীন জোট প্রায় ৫০টি আসন পেতে পারে বলে প্রাথমিক জরিপে ধারণা করা হয়েছে। অন্যদিকে আইজেনকটের নেতৃত্বাধীন বিরোধী শিবিরের সম্ভাব্য আসনসংখ্যা ৫২ থেকে ৫৩টির মধ্যে দেখানো হয়েছে। আরব নেতৃত্বাধীন দলগুলোর জন্য প্রাথমিকভাবে প্রায় ১৮টি আসনের পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে। বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের জরিপে সংখ্যার কিছু পার্থক্য থাকলেও মূল চিত্র একই কোনো পক্ষের হাতেই সরকার গঠনের জন্য নিশ্চিত সংখ্যাগরিষ্ঠতা নেই।
ইসরায়েলের সংসদে সরকার গঠনের জন্য সাধারণত অন্তত ৬১ জন সংসদ সদস্যের সমর্থন প্রয়োজন। দেশটির নির্বাচনী ব্যবস্থায় ভোটাররা সরাসরি প্রধানমন্ত্রী নির্বাচন করেন না; তাঁরা রাজনৈতিক দলকে ভোট দেন। প্রাপ্ত ভোটের অনুপাতে দলগুলো সংসদে আসন পায়। এরপর বিভিন্ন দল নিজেদের মধ্যে সমঝোতা করে সরকার গঠনের চেষ্টা করে। এ কারণে কোনো দল সবচেয়ে বেশি আসন পেলেও তার পক্ষে সরকার গঠন নিশ্চিত হয় না। সংসদে সংখ্যাগরিষ্ঠ সমর্থন জোগাড় করতে পারাটাই শেষ পর্যন্ত সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
এবারের নির্বাচনে নেতানিয়াহুর রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে। দীর্ঘদিন ধরে ইসরায়েলের রাজনীতিতে প্রভাবশালী এই নেতা নিরাপত্তা ও যুদ্ধকালীন নেতৃত্বকে সামনে রেখে সমর্থন ধরে রাখার চেষ্টা করেছেন। কিন্তু ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের নেতৃত্বাধীন হামলার আগে নিরাপত্তাব্যবস্থা কেন ব্যর্থ হয়েছিল, জিম্মিদের ফিরিয়ে আনার প্রচেষ্টা কতটা কার্যকর হয়েছে এবং সরকারের বিভিন্ন সিদ্ধান্তের জবাবদিহি কীভাবে নিশ্চিত করা হবে এসব প্রশ্ন তাঁর বিরোধীদের প্রচারের গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে উঠেছে।
বিরোধী নেতা গাদি আইজেনকট সাবেক সেনাপ্রধান হিসেবে নিরাপত্তা ও সামরিক বিষয়ে অভিজ্ঞতার পরিচয় তুলে ধরেছেন। তাঁর শিবির সরকার পরিবর্তনের পক্ষে জনসমর্থন পাওয়ার চেষ্টা করেছে। বিরোধীদের বক্তব্য, নিরাপত্তাব্যবস্থার ব্যর্থতা নিয়ে স্বাধীন তদন্ত এবং সরকারের কর্মকাণ্ডের জবাবদিহি নিশ্চিত করা জরুরি। অন্যদিকে নেতানিয়াহুর সমর্থকেরা যুদ্ধের সময় তাঁর নেতৃত্ব, নিরাপত্তা রক্ষার অভিজ্ঞতা এবং আন্তর্জাতিক সম্পর্ক পরিচালনার সক্ষমতাকে গুরুত্ব দিচ্ছেন। ফলে নির্বাচনটি শুধু দলীয় প্রতিদ্বন্দ্বিতা নয়, বরং দেশটির ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব ও নীতিনির্ধারণের দিকনির্দেশনা নিয়েও জনমতের পরীক্ষা হয়ে উঠেছে।
সরকার গঠনের আলোচনায় আরব নেতৃত্বাধীন দলগুলো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিতে পারে। প্রাথমিক জরিপ অনুযায়ী, তাদের আসনসংখ্যা এমন অবস্থানে থাকতে পারে, যা দুই প্রধান শিবিরের যেকোনো একটির জন্য সরকার গঠনের সমীকরণ বদলে দিতে সক্ষম। তবে সংখ্যাগত গুরুত্ব থাকলেই যে তারা সরাসরি কোনো জোটে যোগ দেবে, তা নিশ্চিত নয়। নেতানিয়াহু ও আইজেনকট উভয় পক্ষই এসব দলের সঙ্গে আনুষ্ঠানিক জোট গঠনের বিষয়ে আপত্তি জানিয়েছেন বলে সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। তবু সংসদে আস্থা ভোটের সময় বাইরে থেকে সমর্থন, ভোটদানে বিরত থাকা কিংবা নির্দিষ্ট নীতিগত বিষয়ে সমঝোতার মতো বিকল্প আলোচনায় আসতে পারে।
চূড়ান্ত ফল প্রকাশের পর ইসরায়েলের রাষ্ট্রপতি আইজাক হারজগ বিভিন্ন দলের নেতাদের সঙ্গে আলোচনা করবেন। এরপর যাঁর সরকার গঠনের সম্ভাবনা সবচেয়ে বেশি বলে মনে হবে, তাঁকে সরকার গঠনের দায়িত্ব দেওয়া হতে পারে। সংশ্লিষ্ট প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মনোনীত প্রার্থী প্রথমে ২৮ দিন সময় পাবেন। প্রয়োজন হলে রাষ্ট্রপতি আরও ১৪ দিন সময় বাড়াতে পারেন। অর্থাৎ সরকার গঠনের জন্য সর্বোচ্চ ৪২ দিন পর্যন্ত সময় পাওয়ার সুযোগ রয়েছে।
এই সময়ে দলগুলোর মধ্যে মন্ত্রিত্ব বণ্টন, বাজেট, নিরাপত্তানীতি, সামরিক বাহিনীতে বাধ্যতামূলক সেবা এবং অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে দর-কষাকষি হতে পারে। ছোট দলগুলোর সমর্থনও তখন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে। কোনো প্রার্থী নির্ধারিত সময়ে সরকার গঠনে ব্যর্থ হলে অন্য সংসদ সদস্যকে সুযোগ দেওয়া হতে পারে। সব প্রচেষ্টা ব্যর্থ হলে সংসদ ভেঙে নতুন নির্বাচনের পথ তৈরি হতে পারে। তত দিন নেতানিয়াহুর বর্তমান সরকার অন্তর্বর্তী প্রশাসন হিসেবে দায়িত্ব পালন করতে পারে।
ইসরায়েলের রাজনীতিতে এমন অচলাবস্থা নতুন নয়। ২০১৯ থেকে ২০২২ সালের মধ্যে দেশটিতে একাধিকবার নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছিল, কারণ রাজনৈতিক দলগুলো স্থিতিশীল সংখ্যাগরিষ্ঠতা গঠন করতে পারছিল না। এবারের ফলও দীর্ঘ আলোচনার দিকে গড়ালে সেই অভিজ্ঞতা আবার সামনে আসতে পারে। তবে নতুন নির্বাচন হলে রাজনৈতিক সংকটের সমাধান হবে, এমন নিশ্চয়তা নেই।
এবারের ভোটে গাজা যুদ্ধ, আঞ্চলিক নিরাপত্তা, জিম্মি সংকট, সামরিক দায়িত্ব বণ্টন এবং সরকারের জবাবদিহির প্রশ্ন আলোচনায় থাকলেও নির্বাচনের পরবর্তী পর্যায়ে দলগুলোর পারস্পরিক সমঝোতাই তাৎক্ষণিকভাবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। নতুন সরকার গঠনের পদ্ধতি ও জোটের শর্ত দেশটির অভ্যন্তরীণ নীতি এবং প্রতিবেশীদের সঙ্গে সম্পর্কেও প্রভাব ফেলতে পারে।
ইসরায়েলের নির্বাচনের প্রাথমিক চিত্র নেতানিয়াহুর শিবিরের জন্য বড় চ্যালেঞ্জের ইঙ্গিত দিলেও বিরোধী পক্ষের সরকার গঠনও নিশ্চিত নয়। চূড়ান্ত ভোট গণনা, রাষ্ট্রপতির পরামর্শ গ্রহণ এবং দলগুলোর মধ্যে সমঝোতার পরই স্পষ্ট হবে কে সরকার গঠনের সুযোগ পাচ্ছেন। আপাতত নিশ্চিত সিদ্ধান্তের বদলে নজর রাখতে হবে সরকারি ফলাফল ও পরবর্তী জোট আলোচনার দিকে।






মন্তব্য ০
লগইন করুন অথবা বিনা মূল্যে অ্যাকাউন্ট খুলুন আলোচনায় যোগ দিতে। নাম গোপন রেখেও মন্তব্য করতে পারবেন।
এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি করুন।