নতুন বেতনকাঠামোর খরচ মেটাতে আরও পাঁচ হাজার কোটি টাকা ঋণ নিচ্ছে সরকার
সরকারি কর্মচারীদের নতুন বেতন ও বকেয়া পরিশোধে আরও পাঁচ হাজার কোটি টাকা ঋণ সংগ্রহের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার, বাড়ছে অর্থায়নের চাপ।
সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নতুন বেতনকাঠামো অনুযায়ী বেতন ও বকেয়া পরিশোধের ব্যয় মেটাতে ব্যাংক খাত থেকে আরও পাঁচ হাজার কোটি টাকা ঋণ সংগ্রহের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। এ লক্ষ্যে বাংলাদেশ ব্যাংক ১৪ দিন মেয়াদি বিশেষ ট্রেজারি বিলের নিলাম আহ্বান করেছে। নতুন এই অর্থ সংগ্রহের উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে চলতি অক্টোবর মাসে ট্রেজারি বিল ও বন্ডের মাধ্যমে সরকারের মোট ঋণ গ্রহণের পরিমাণ দাঁড়াতে পারে ৬০ হাজার ৩০০ কোটি টাকায়। বাড়তি বেতন ব্যয়ের পাশাপাশি প্রত্যাশা অনুযায়ী রাজস্ব আদায় না হওয়ায় সরকারের অর্থায়নের প্রয়োজন বাড়ছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রকাশিত নিলামসূচি অনুযায়ী, পাঁচ হাজার কোটি টাকার বিশেষ ট্রেজারি বিলের নিলাম নির্ধারণ করা হয়েছে। স্বল্পমেয়াদি এই বিলের মেয়াদ ১৪ দিন। সাধারণত সরকার ব্যাংক খাত থেকে অর্থ সংগ্রহের জন্য ৯১, ১৮২ ও ৩৬৪ দিন মেয়াদি ট্রেজারি বিল ব্যবহার করে। তবে স্বল্প সময়ের জন্য অতিরিক্ত অর্থের প্রয়োজন হলে বিশেষ ব্যবস্থায় ১৪ দিন মেয়াদি বিল ইস্যু করা হয়। নতুন বেতনকাঠামোর ব্যয় মেটাতে এই বিশেষ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, অক্টোবর মাসের ২৭ তারিখ পর্যন্ত ট্রেজারি বিল ও বন্ডের মাধ্যমে ব্যাংক খাত থেকে ৫৫ হাজার ৩০০ কোটি টাকা সংগ্রহ করেছে সরকার। নতুন নিলাম থেকে আরও পাঁচ হাজার কোটি টাকা পাওয়া গেলে চলতি মাসে মোট ঋণ সংগ্রহের পরিমাণ বেড়ে ৬০ হাজার ৩০০ কোটি টাকায় পৌঁছাবে। দায়িত্ব গ্রহণের পর এক মাসে সরকারের ঋণ সংগ্রহের ক্ষেত্রে এটি বড় অঙ্কের একটি পরিমাণ। তবে বিল ও বন্ডের মাধ্যমে সংগৃহীত পুরো অর্থকে সরকারের নিট নতুন ঋণ হিসেবে বিবেচনা করা যাবে না। কারণ, এই অর্থের একটি অংশ পুরোনো ঋণ পরিশোধ ও মেয়াদপূর্তির দায় মেটাতে ব্যয় হয়।
নতুন বেতনকাঠামো অনুযায়ী আগামী রোববার সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের অক্টোবর মাসের বেতনের সঙ্গে আগের তিন মাসের বেতন বৃদ্ধির বকেয়া পরিশোধের পরিকল্পনা রয়েছে। এ জন্য স্বল্প সময়ের মধ্যে সরকারের অতিরিক্ত অর্থের প্রয়োজন হচ্ছে। সরকারি কর্মচারীদের বেতন ও ভাতা নিয়মিত পরিশোধ করা সরকারের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। তবে একসঙ্গে বেতন বৃদ্ধি ও বকেয়া পরিশোধের কারণে অর্থের চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় চলতি মাসে ব্যাংক থেকে ঋণ সংগ্রহের পরিমাণ বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথম তিন মাসে ব্যাংক খাত থেকে সরকারের নিট ঋণ গ্রহণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ২৪ হাজার ২৪৫ কোটি টাকা। এর মধ্যে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো থেকে নেওয়া হয়েছে ২৩ হাজার ২২৭ কোটি টাকা। অর্থাৎ সরকারি ব্যয় মেটাতে ব্যাংক খাতের ওপর সরকারের নির্ভরতা অব্যাহত রয়েছে। একই সময়ে রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা পূরণে ঘাটতি দেখা দেওয়ায় অর্থনীতির ওপর বাড়তি চাপ তৈরি হয়েছে।
রাজস্ব আদায়ের দুর্বলতাও সরকারের ঋণ চাহিদা বৃদ্ধির অন্যতম কারণ। চলতি অর্থবছরের প্রথম দুই মাসে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের রাজস্ব আদায়ে ঘাটতি হয়েছে ২৫ হাজার ৪৯১ কোটি টাকা বলে প্রকাশিত প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে। প্রত্যাশিত রাজস্ব আয় না হলে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন, উন্নয়ন প্রকল্প, সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি এবং অন্যান্য নিয়মিত ব্যয়ের অর্থ জোগাড় করা কঠিন হয়ে পড়ে। ফলে ঘাটতি পূরণে সরকারকে ব্যাংকসহ বিভিন্ন উৎস থেকে ঋণ নিতে হয়।
সরকারের ঋণ সংগ্রহ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ট্রেজারি বিলের সুদহারেও ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা দেখা গেছে। প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ৯১ দিন মেয়াদি ট্রেজারি বিলের সুদহার ৫ অক্টোবর ৮ দশমিক ১৩ শতাংশ ছিল। ২৬ অক্টোবর তা বেড়ে ৮ দশমিক ৫৫ শতাংশে পৌঁছায়। সুদহার বাড়লে সরকারের ঋণ পরিশোধের ব্যয়ও বাড়তে পারে। দীর্ঘ সময় ধরে ঋণনির্ভরতা অব্যাহত থাকলে ভবিষ্যতের বাজেটে সুদ পরিশোধের জন্য আরও বেশি অর্থ বরাদ্দ রাখার প্রয়োজন হতে পারে।
চলতি অর্থবছরের বাজেটে ব্যাংক খাত থেকে এক লাখ ১২ হাজার কোটি টাকা ঋণ নেওয়ার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। গত অর্থবছরে এই খাত থেকে সরকারের ঋণ গ্রহণের পরিমাণ ছিল এক লাখ ৩৪ হাজার ৫৭১ কোটি টাকা। এ পরিস্থিতিতে সরকারের জন্য রাজস্ব আয় বাড়ানো, অপ্রয়োজনীয় ব্যয় নিয়ন্ত্রণ এবং বিকল্প অর্থায়নের উৎস তৈরি করা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন, ভাতা ও পেনশন বাবদ চলতি অর্থবছরের বাজেটে এক লাখ ৩১ হাজার ২৮৪ কোটি টাকা বরাদ্দ রয়েছে। নতুন বেতনকাঠামো ধাপে ধাপে সম্পূর্ণ কার্যকর হলে সরকারের বার্ষিক ব্যয় প্রায় এক লাখ পাঁচ হাজার কোটি টাকা বাড়তে পারে বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে প্রাক্কলন করা হয়েছে। ফলে বেতন বৃদ্ধির সুফল কর্মচারীরা পেলেও সেই ব্যয় দীর্ঘমেয়াদে কীভাবে বহন করা হবে, তা সরকারের জন্য বড় অর্থনৈতিক প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে।
সরকারের ঋণনির্ভরতা কমাতে চলতি অর্থবছরে ৩২ হাজার কোটি টাকার শরিয়াহভিত্তিক সুকুক ইস্যুর লক্ষ্যও রয়েছে। এ ধরনের বিকল্প অর্থায়ন কার্যকরভাবে ব্যবহার করা গেলে ব্যাংকঋণের ওপর নির্ভরতা কিছুটা কমানোর সুযোগ তৈরি হতে পারে। পাশাপাশি রাজস্ব আদায় বাড়ানো এবং সরকারি ব্যয়ের দক্ষতা নিশ্চিত করা জরুরি।
নতুন বেতনকাঠামো অনুযায়ী সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন ও বকেয়া পরিশোধের প্রস্তুতি সরকারের অর্থায়নের চাহিদা বাড়িয়েছে। পাঁচ হাজার কোটি টাকার বিশেষ ট্রেজারি বিলের নিলাম সেই চাহিদা মেটানোর একটি স্বল্পমেয়াদি উদ্যোগ। তবে এই ঋণ সংগ্রহের প্রকৃত ফল এবং সরকারের সামগ্রিক আর্থিক অবস্থার ওপর এর প্রভাব নির্ভর করবে নিলামের ফলাফল, রাজস্ব আদায় ও ভবিষ্যৎ ব্যয় ব্যবস্থাপনার ওপর।






মন্তব্য ০
লগইন করুন অথবা বিনা মূল্যে অ্যাকাউন্ট খুলুন আলোচনায় যোগ দিতে। নাম গোপন রেখেও মন্তব্য করতে পারবেন।
এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি করুন।