অংশ: যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচন ২০২৬
যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে স্বচ্ছতা নিশ্চিতে হাজারো পর্যবেক্ষক, নিরাপত্তায় বিশেষ প্রস্তুতি
যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে ভোটের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে হাজারো স্বেচ্ছাসেবক প্রস্তুত, বিচার বিভাগও নজরদারি বাড়াচ্ছে, কেন্দ্রের নিরাপত্তা নিয়ে বাড়ছে রাজনৈতিক বিতর্ক।
যুক্তরাষ্ট্রে আগামী ৩ নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচন সামনে রেখে ভোটকেন্দ্র পর্যবেক্ষণ, ভোটারদের অধিকার সুরক্ষা এবং সম্ভাব্য নির্বাচনী অনিয়ম শনাক্ত করতে ব্যাপক প্রস্তুতি চলছে। বিভিন্ন রাজনৈতিক সংগঠন, নাগরিক অধিকারকর্মী ও পর্যবেক্ষক গোষ্ঠী হাজারো স্বেচ্ছাসেবককে প্রশিক্ষণ দিয়েছে। একই সঙ্গে দেশটির বিচার বিভাগ প্রায় এক হাজার কর্মীকে নির্বাচনী আইন পালনের বিষয়টি পর্যবেক্ষণে নিয়োজিত করার পরিকল্পনা করেছে। তবে এই উদ্যোগের পরিধি, পর্যবেক্ষকদের ভূমিকা এবং ভোটকেন্দ্রে কেন্দ্রীয় সরকারের কর্মকর্তাদের উপস্থিতি নিয়ে রাজনৈতিক বিতর্ক তৈরি হয়েছে।
অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসের ২৬ অক্টোবর ২০২৬ প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, ডেমোক্র্যাটিক দল ও ভোটাধিকার নিয়ে কাজ করা বিভিন্ন সংগঠন এবারের নির্বাচনে ব্যাপক পর্যবেক্ষক উপস্থিতির প্রস্তুতি নিয়েছে। তাদের বক্তব্য, ভোটারদের ভয় দেখানো, ভোটপ্রক্রিয়ায় বাধা সৃষ্টি কিংবা নির্বাচনী নিয়ম লঙ্ঘনের ঘটনা ঘটলে তা দ্রুত শনাক্ত করে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে জানানো প্রয়োজন। অন্যদিকে, অতিরিক্ত পর্যবেক্ষক উপস্থিতির কারণে কোনো কোনো কেন্দ্রে বিভ্রান্তি বা উত্তেজনা তৈরি হতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন কিছু নির্বাচনী কর্মকর্তা।
প্রতিবেদনটিতে বলা হয়েছে, বিভিন্ন অঙ্গরাজ্যের ডেমোক্র্যাটিক দলগুলো প্রায় ১০ হাজার স্বেচ্ছাসেবককে ভোটকেন্দ্র পর্যবেক্ষণের জন্য প্রশিক্ষণ দিয়েছে। নাগরিক অধিকার নিয়ে কাজ করা কমন কজ নামের সংগঠন প্রশিক্ষণ দিয়েছে আরও প্রায় ১৬ হাজার স্বেচ্ছাসেবককে। এ ছাড়া প্রায় ৩০০ সংগঠনের সমন্বয়ে গঠিত একটি বৃহত্তর নির্বাচনী সুরক্ষা জোট কয়েক দশ হাজার স্বেচ্ছাসেবককে প্রস্তুত করেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এসব স্বেচ্ছাসেবকের কাজ হবে ভোটপ্রক্রিয়া পর্যবেক্ষণ করা, সন্দেহজনক পরিস্থিতি নথিবদ্ধ করা এবং প্রয়োজন হলে নির্বাচনী কর্মকর্তাদের কাছে অভিযোগ জানানো।
তবে এসব সংখ্যা যুক্তরাষ্ট্রজুড়ে একই সময়ে ভোটকেন্দ্রে উপস্থিত থাকবেন এমন পর্যবেক্ষকের নিশ্চিত সংখ্যা নয়। এগুলো বিভিন্ন সংগঠনের প্রশিক্ষণ ও প্রস্তুতির হিসাব। নির্বাচনের দিন কতজন স্বেচ্ছাসেবক বাস্তবে দায়িত্ব পালন করবেন, তা অঙ্গরাজ্য, স্থানীয় আয়োজন এবং সংশ্লিষ্ট সংগঠনের সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করবে।
এবারের নির্বাচনে যুক্তরাষ্ট্রের বিচার বিভাগের নজরদারি পরিকল্পনাও বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে। অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসের প্রতিবেদন অনুযায়ী, বিভাগটি প্রায় এক হাজার কর্মীকে ভোটকেন্দ্র পর্যবেক্ষণের কাজে নিয়োজিত করার পরিকল্পনা করেছে। তাদের দায়িত্ব হবে নির্বাচনে প্রযোজ্য কেন্দ্রীয় আইন মানা হচ্ছে কি না, তা পর্যবেক্ষণ করা। ভোটাধিকার লঙ্ঘন, বৈষম্য কিংবা ভোটারদের ভয় দেখানোর অভিযোগের মতো বিষয়ও এই নজরদারির আওতায় আসতে পারে।
বিচার বিভাগের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, তাদের পর্যবেক্ষকেরা আইন মেনে দায়িত্ব পালন করবেন এবং ভোটদানে হস্তক্ষেপ করবেন না। তবে নাগরিক অধিকারকর্মী ও ডেমোক্র্যাটিক দলের কয়েকজন নেতা আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন, কেন্দ্রীয় সরকারের কর্মীদের উপস্থিতি কিছু ভোটারের মধ্যে ভীতি তৈরি করতে পারে। বিশেষ করে অভিবাসন প্রয়োগকারী কর্মকর্তাদের উপস্থিতি নিয়ে রাজনৈতিক বক্তব্য ও পাল্টা বক্তব্যের কারণে কিছু এলাকায় উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, বিচার বিভাগের নাগরিক অধিকারবিষয়ক কর্মকর্তারা ভোটকেন্দ্রে অভিবাসন প্রয়োগকারী কর্মকর্তা বা সেনা মোতায়েনের কোনো পরিকল্পনা নেই বলে জানিয়েছেন। তবে রাজনৈতিক বিতর্কের কারণে স্থানীয় নির্বাচনী প্রশাসকেরা সম্ভাব্য জটিলতা মোকাবিলায় আগাম প্রস্তুতি নিচ্ছেন। কোথাও কোনো পর্যবেক্ষক দায়িত্বের সীমা অতিক্রম করলে কীভাবে পরিস্থিতি সামাল দেওয়া হবে, সে বিষয়েও স্থানীয় কর্তৃপক্ষ আইনজীবী ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থার সঙ্গে যোগাযোগ রাখছে।
রিপাবলিকান দলও নির্বাচনী পর্যবেক্ষণের প্রস্তুতি নিচ্ছে। অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসের প্রতিবেদন অনুযায়ী, রিপাবলিকান ন্যাশনাল কমিটি ২২টি অঙ্গরাজ্যে নির্বাচনী সততা নিয়ে কাজ করা দায়িত্বশীল প্রতিনিধি নিয়োগের উদ্যোগ নিয়েছে। পাশাপাশি প্রায় ২২ হাজার ভোটকেন্দ্রকর্মী তাদের কার্যক্রমের সঙ্গে যুক্ত রয়েছেন বলে দলটির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে। এসব কর্মী ও পর্যবেক্ষকের উদ্দেশ্য হলো নির্বাচনী নিয়ম অনুসরণ করা হচ্ছে কি না, তা নজরে রাখা এবং সম্ভাব্য অনিয়মের তথ্য সংগ্রহ করা।
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য রয়েছে। ভোটকেন্দ্রের নিয়মিত কর্মী, রাজনৈতিক দলের অনুমোদিত পর্যবেক্ষক এবং কেন্দ্রীয় সরকারের আইন প্রয়োগ বা নাগরিক অধিকারবিষয়ক কর্মী একই দায়িত্ব পালন করেন না। তাঁদের ক্ষমতা ও কাজের সীমা সংশ্লিষ্ট আইন, অঙ্গরাজ্যের বিধি এবং স্থানীয় নির্বাচনী কর্তৃপক্ষের নিয়মের ওপর নির্ভর করে। কোনো পর্যবেক্ষকের উপস্থিতি তাঁকে ভোটারকে বাধা দেওয়া, ব্যালট স্পর্শ করা কিংবা ভোটের গোপনীয়তা নষ্ট করার অধিকার দেয় না।
যুক্তরাষ্ট্রে নির্বাচন পরিচালনার বড় অংশ অঙ্গরাজ্য ও স্থানীয় প্রশাসনের দায়িত্বে থাকে। ফলে ভোটকেন্দ্রে কে প্রবেশ করতে পারবেন, পর্যবেক্ষকেরা কোথায় দাঁড়াবেন এবং অভিযোগ কীভাবে জানানো হবে, এসব বিষয়ে স্থানীয় নিয়ম গুরুত্বপূর্ণ। কেন্দ্রীয় সরকারের পর্যবেক্ষকেরাও আইনগত সীমাবদ্ধতার বাইরে কাজ করতে পারেন না। কোনো পক্ষ নিয়ম লঙ্ঘনের অভিযোগ তুললে তা যাচাই করে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন।
এবারের নির্বাচনে ভুল তথ্য ছড়ানোর আশঙ্কাও গুরুত্ব পাচ্ছে। অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসের প্রতিবেদন বলছে, ডেমোক্র্যাটিক দলের উদ্যোগে একটি বিশেষ প্রযুক্তিগত দল অনলাইনে নির্বাচনী বিভ্রান্তিকর তথ্য এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সাহায্যে তৈরি ভুয়া ছবি বা ভিডিও পর্যবেক্ষণ করবে। নির্বাচনের আগে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভুল তথ্য ছড়িয়ে পড়লে ভোটারদের মধ্যে বিভ্রান্তি সৃষ্টি হতে পারে। তাই নির্বাচনী কর্মকর্তারা ভোটের সময়, কেন্দ্রের অবস্থান এবং ভোটদানের নিয়ম সম্পর্কে সরকারি তথ্য অনুসরণের ওপর গুরুত্ব দিচ্ছেন।
পর্যবেক্ষক সংগঠনগুলোর জন্যও ভারসাম্য বজায় রাখা জরুরি। অনিয়ম শনাক্ত করা যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি ভোটারদের স্বাভাবিকভাবে ভোট দেওয়ার পরিবেশ নিশ্চিত করাও প্রয়োজন। পর্যবেক্ষকেরা যেন ভোটারদের চলাচলে বাধা না দেন, অযথা প্রশ্ন করে ভয় না দেখান এবং যাচাই না করা অভিযোগকে নিশ্চিত ঘটনা হিসেবে প্রচার না করেন এ ধরনের সতর্কতা নির্বাচনী পরিবেশ শান্ত রাখতে সহায়ক হতে পারে।
আগামী ৩ নভেম্বরের ভোটে প্রতিনিধি পরিষদের সব আসন, সিনেটের একাংশ এবং বিভিন্ন অঙ্গরাজ্যের গুরুত্বপূর্ণ পদে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা। ফলে নির্বাচনী প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা ও গ্রহণযোগ্যতা রাজনৈতিকভাবে বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে। ভোটের আগে পর্যবেক্ষক বাড়ানোর উদ্যোগকে সমর্থকেরা ভোটাধিকার সুরক্ষার ব্যবস্থা হিসেবে দেখছেন। সমালোচকেরা বলছেন, পর্যবেক্ষণ যেন রাজনৈতিক চাপ বা ভোটারদের ভয় দেখানোর উপায়ে পরিণত না হয়, তা নিশ্চিত করা দরকার।
যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে পর্যবেক্ষক প্রস্তুতি ও নিরাপত্তা পরিকল্পনা জোরদার হয়েছে। তবে কোনো নির্দিষ্ট কেন্দ্রে অনিয়ম ঘটেছে বা ভোটারদের অধিকার লঙ্ঘিত হয়েছে এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে হলে নির্ভরযোগ্য প্রমাণ ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের তথ্য প্রয়োজন। নির্বাচনের গ্রহণযোগ্যতা নির্ভর করবে আইন মেনে ভোটগ্রহণ, ভোটারদের অবাধ অংশগ্রহণ এবং অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত নিশ্চিত করার ওপর।

ক্যালিফোর্নিয়ায় ২০ হাজার ভোট নিয়ে ট্রাম্প প্রশাসনের জরুরি আবেদনে বিচারকের প্রশ্ন, বাড়ছে আইনি বিতর্ক

যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটদের এগিয়ে থাকার আভাস, কংগ্রেসে ক্ষমতা হারানোর শঙ্কায় রিপাবলিকানরা

টেক্সাসের জনসভায় ট্রাম্পের ডাকে মঞ্চে রুবিও, মার্কিন প্রেসিডেন্টের প্রশংসায় পঞ্চমুখ






মন্তব্য ০
লগইন করুন অথবা বিনা মূল্যে অ্যাকাউন্ট খুলুন আলোচনায় যোগ দিতে। নাম গোপন রেখেও মন্তব্য করতে পারবেন।
এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি করুন।