মিয়ানমারে সহিংসতায় রোহিঙ্গা সংকট গভীর, জাতিসংঘে বাংলাদেশের জরুরি সহায়তা ও নিরাপদ প্রত্যাবাসনের জোরালো আহ্বান
মিয়ানমারের রাখাইনে সহিংসতা, বাস্তুচ্যুতি ও মানবাধিকার লঙ্ঘন নিয়ে জাতিসংঘে উদ্বেগ জানিয়েছে বাংলাদেশ, চেয়েছে ধারাবাহিক সহায়তা, আন্তর্জাতিক দায়িত্ব ভাগাভাগি ও নিরাপদ প্রত্যাবাসন।
মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে সহিংসতা, মানবাধিকার লঙ্ঘন এবং নতুন করে বাস্তুচ্যুতির ঝুঁকি নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে বাংলাদেশ। দীর্ঘদিন ধরে চলমান রোহিঙ্গা সংকটের স্থায়ী সমাধানে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের আরও কার্যকর ভূমিকা, পর্যাপ্ত মানবিক সহায়তা এবং নিরাপদ প্রত্যাবাসনের পরিবেশ তৈরির আহ্বান জানিয়েছে ঢাকা। ২৭ অক্টোবর জাতিসংঘে দেওয়া বাংলাদেশের বক্তব্যে উঠে এসেছে শরণার্থীশিবিরে ক্রমবর্ধমান চাপ, সহায়তার অর্থসংকট এবং মিয়ানমারে চলমান সংঘাতের মানবিক প্রভাব।
জাতিসংঘে বাংলাদেশের উপস্থাপিত বক্তব্যটি দেন দেশটির উপস্থায়ী প্রতিনিধি শানচিতা হক। মিয়ানমারে রোহিঙ্গা মুসলিম ও অন্যান্য সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনায় তিনি বলেন, রাখাইন রাজ্যের পরিস্থিতির অবনতি অব্যাহত রয়েছে। সেখানে সহিংসতা বৃদ্ধি, আকাশপথে হামলা, নির্বিচার আটক, জোরপূর্বক নিয়োগ, যৌন সহিংসতা এবং মানবিক সহায়তা পৌঁছানোর ক্ষেত্রে বাধার মতো গুরুতর সমস্যা দেখা যাচ্ছে। এসব পরিস্থিতি নতুন করে মানুষকে বাস্তুচ্যুত করছে এবং বাংলাদেশসহ প্রতিবেশী দেশগুলোর ওপর চাপ বাড়াচ্ছে।
বাংলাদেশের বক্তব্যে মিয়ানমারের সামরিক বাহিনী ও আরাকান আর্মির কর্মকাণ্ডের কারণে সৃষ্ট মানবাধিকার পরিস্থিতির কথাও উল্লেখ করা হয়েছে। সংঘাতের কারণে সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা, চলাচলের স্বাধীনতা এবং প্রয়োজনীয় সহায়তা পাওয়ার সুযোগ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। ফলে রোহিঙ্গাদের নিজ দেশে নিরাপদে ফিরে যাওয়ার সম্ভাবনা আরও কঠিন হয়ে পড়ছে। বাংলাদেশের মতে, সংকটের মূল কারণ মিয়ানমারেই রয়ে গেছে। তাই শুধু শরণার্থীশিবিরে সহায়তা বাড়ালেই এ সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়; মিয়ানমারের ভেতরেও প্রয়োজন কার্যকর পদক্ষেপ।
বাংলাদেশের সরকারি বক্তব্য অনুযায়ী, প্রায় এক দশক ধরে দেশটি মিয়ানমার থেকে পালিয়ে আসা ১২ লাখের বেশি রোহিঙ্গাকে আশ্রয় দিয়ে আসছে। জাতিসংঘের শরণার্থীবিষয়ক সংস্থার ২০২৬ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত হালনাগাদ পরিসংখ্যানেও বাংলাদেশে মোট রোহিঙ্গার সংখ্যা ১২ লাখ ৬ হাজার ৫২৮ জন বলে উল্লেখ করা হয়েছে। তাঁদের অধিকাংশ কক্সবাজারের ঘনবসতিপূর্ণ শরণার্থীশিবিরে বসবাস করছেন। অন্য একটি অংশ নোয়াখালীর ভাসানচরে অবস্থান করছেন। ফলে রোহিঙ্গাদের সংখ্যা সম্পর্কে বাংলাদেশের বক্তব্যের সঙ্গে জাতিসংঘের প্রকাশিত পরিসংখ্যানের সামঞ্জস্য রয়েছে।
দীর্ঘস্থায়ী বাস্তুচ্যুতির কারণে শরণার্থীদের জীবনযাত্রা ক্রমেই অনিশ্চিত হয়ে উঠছে। খাদ্য, চিকিৎসা, শিক্ষা, নিরাপদ আশ্রয়, বিশুদ্ধ পানি এবং স্বাস্থ্যসম্মত পরিবেশ নিশ্চিত করতে নিয়মিত অর্থের প্রয়োজন। কিন্তু আন্তর্জাতিক মানবিক সহায়তার অর্থায়ন কমে যাওয়ায় এসব মৌলিক পরিষেবা বজায় রাখা কঠিন হয়ে পড়ছে। বিশেষ করে শিশু, নারী, প্রবীণ এবং ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় থাকা মানুষের প্রয়োজন মেটানো নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে।
জাতিসংঘ ও সহযোগী সংস্থাগুলো ২০২৬ সালে রোহিঙ্গা শরণার্থী এবং আশ্রয়দাতা স্থানীয় জনগোষ্ঠীর জরুরি প্রয়োজন মেটাতে ৭১০ কোটি ৫০ লাখ মার্কিন ডলারের পরিবর্তে ৭১ কোটি ৫ লাখ মার্কিন ডলারের সহায়তা চেয়েছে। এই অর্থের মধ্যে খাদ্য, আশ্রয়, পানি ও পয়োনিষ্কাশন, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা এবং জীবিকার জন্য বরাদ্দ অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। জাতিসংঘের প্রকাশিত তথ্য অনুসারে, চাওয়া অর্থের পরিমাণ আগের বছরের তুলনায় ২৬ শতাংশ কম। অর্থাৎ প্রয়োজন কমে যাওয়ার কারণে নয়, বরং সীমিত সম্পদের বাস্তবতায় সহায়তার পরিকল্পনা সংকুচিত করতে হয়েছে।
বাংলাদেশের বক্তব্যেও অর্থায়নের ঘাটতির বিষয়টি বিশেষভাবে গুরুত্ব পেয়েছে। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতি পর্যাপ্ত, ধারাবাহিক ও পূর্বানুমানযোগ্য সহায়তা নিশ্চিত করার আহ্বান জানানো হয়েছে। একই সঙ্গে শরণার্থীদের আশ্রয় দেওয়ার দায়িত্ব শুধু বাংলাদেশের ওপর ছেড়ে না দিয়ে বিভিন্ন দেশের মধ্যে ন্যায্যভাবে ভাগ করে নেওয়ার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরা হয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে বিপুলসংখ্যক শরণার্থীকে আশ্রয় দেওয়ার ফলে বাংলাদেশের অর্থনীতি, পরিবেশ, স্থানীয় সমাজ এবং নিরাপত্তাব্যবস্থার ওপর যে চাপ তৈরি হয়েছে, তা বিবেচনায় নেওয়ারও আহ্বান জানানো হয়েছে।
শরণার্থীশিবিরের নিরাপত্তা জোরদার এবং প্রয়োজনীয় পরিষেবা বজায় রাখার জন্য বাংলাদেশ জাতিসংঘ, মানবিক সহায়তাকারী সংস্থা ও অন্যান্য অংশীদারের সঙ্গে কাজ চালিয়ে যাওয়ার কথা জানিয়েছে। শিবিরের পরিস্থিতি মূল্যায়নের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের প্রচেষ্টা এবং সীমিত সম্পদের মধ্যে দায়িত্ব পালনের বিষয়টিও যথাযথভাবে বিবেচনার দাবি জানানো হয়েছে। একই সঙ্গে নারী ও স্থানীয় জনগোষ্ঠীকে জীবিকাভিত্তিক কার্যক্রম এবং নেতৃত্বের সুযোগের সঙ্গে যুক্ত করার উদ্যোগের কথাও বক্তব্যে তুলে ধরা হয়েছে।
রোহিঙ্গা সংকটের স্থায়ী সমাধানে স্বেচ্ছায়, নিরাপদে, মর্যাদার সঙ্গে এবং টেকসইভাবে প্রত্যাবাসনকে অগ্রাধিকার দিয়েছে বাংলাদেশ। তবে প্রত্যাবাসন কার্যকর করতে হলে মিয়ানমারে এমন পরিবেশ তৈরি করতে হবে, যেখানে রোহিঙ্গারা নির্যাতন, সহিংসতা ও বৈষম্যের আশঙ্কা ছাড়াই নিজেদের বাড়িতে ফিরে যেতে পারবেন। তাঁদের অধিকার, নিরাপত্তা এবং নাগরিক মর্যাদা নিশ্চিত করাও এ প্রক্রিয়ার গুরুত্বপূর্ণ অংশ। জোর করে বা অনিরাপদ পরিস্থিতিতে প্রত্যাবাসন নয়, বরং শরণার্থীদের স্বাধীন সম্মতির ভিত্তিতে প্রত্যাবর্তনের উপযোগী পরিবেশ তৈরির ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
আন্তর্জাতিক বিচারপ্রক্রিয়ায় তথ্যপ্রমাণ সংগ্রহ ও তদন্তের ক্ষেত্রেও বাংলাদেশ সহযোগিতা অব্যাহত রাখার কথা জানিয়েছে। মিয়ানমারে সংঘটিত গুরুতর অপরাধের জবাবদিহি প্রতিষ্ঠায় আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর কাজকে সমর্থন করার বিষয়টি বক্তব্যে উঠে এসেছে। বাংলাদেশের মতে, মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিচার এবং সংকটের মূল কারণ দূর করার উদ্যোগ একে অপরের পরিপূরক।
রোহিঙ্গা সংকট এখন শুধু বাংলাদেশের একক সমস্যা নয়; এটি আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা, মানবাধিকার এবং আন্তর্জাতিক দায়িত্ব ভাগাভাগির একটি বড় পরীক্ষা। মিয়ানমারে সংঘাত অব্যাহত থাকলে নতুন করে বাস্তুচ্যুতি ঘটতে পারে এবং আশ্রয়শিবিরে থাকা মানুষের দুর্ভোগ আরও বাড়তে পারে। তাই জরুরি মানবিক সহায়তার পাশাপাশি রাজনৈতিক উদ্যোগ, আন্তর্জাতিক চাপ এবং কার্যকর কূটনৈতিক তৎপরতা প্রয়োজন। বাংলাদেশের আহ্বান, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় যেন দীর্ঘস্থায়ী এই সংকটকে স্বাভাবিক পরিস্থিতি হিসেবে মেনে না নেয়; বরং রোহিঙ্গাদের নিরাপদ প্রত্যাবর্তন এবং তাঁদের অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য সমন্বিত পদক্ষেপ গ্রহণ করে।






মন্তব্য ০
লগইন করুন অথবা বিনা মূল্যে অ্যাকাউন্ট খুলুন আলোচনায় যোগ দিতে। নাম গোপন রেখেও মন্তব্য করতে পারবেন।
এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি করুন।