ইসরায়েলের নির্বাচনে নেতানিয়াহুর দল এগিয়ে, সরকার গঠনে এখনো অনিশ্চয়তা কাটেনি বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা
ইসরায়েলের নির্বাচনে নেতানিয়াহুর দল প্রাথমিক গণনায় এগিয়ে রয়েছে, তবে সংসদে সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন এবং নতুন সরকার গঠন নিয়ে অনিশ্চয়তা এখনো কাটেনি।
ইসরায়েলে ২০২৬ সালের সাধারণ নির্বাচনের ভোট গণনায় প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর নেতৃত্বাধীন লিকুদ দল প্রাথমিকভাবে এগিয়ে রয়েছে। তবে দলীয় ভোটের হিসাবে এগিয়ে থাকলেও নতুন সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় সংসদীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিশ্চিত হয়েছে কি না, তা এখনো স্পষ্ট নয়। বুধবার, ২৮ অক্টোবরের প্রাথমিক ফলাফল দেশটির রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন আলোচনা তৈরি করেছে। ভোট গণনার অগ্রগতির সঙ্গে বিভিন্ন দলের প্রাপ্ত ভোটের হারও পরিবর্তিত হচ্ছে। ফলে এখনই কোনো দলকে চূড়ান্ত বিজয়ী ঘোষণা করার সুযোগ নেই।
আনসা সংবাদ সংস্থার ২৮ অক্টোবর প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, ইসরায়েলের কেন্দ্রীয় নির্বাচন কমিটির প্রকাশিত প্রাথমিক হিসাবের একটি পর্যায়ে ১২ হাজারের বেশি ভোটকেন্দ্রের মধ্যে ৩ হাজার ২৪টি কেন্দ্রের ভোট গণনা করা হয়েছিল। ওই হিসাবে লিকুদ দল পেয়েছিল ২৮২ হাজার ৭৭২ ভোট, যা গণনাকৃত ভোটের ২৩ দশমিক ৩৬ শতাংশ। গাদি আইজেনকোটের নেতৃত্বাধীন ইয়াশার দল পেয়েছিল ১ লাখ ৯০ হাজার ৫২৪ ভোট বা ১৫ দশমিক ৭৪ শতাংশ। সাবেক প্রধানমন্ত্রী নাফতালি বেনেটের নেতৃত্বাধীন ইয়াচাদ দল পেয়েছিল ১ লাখ ৩ হাজার ২২০ ভোট বা ৮ দশমিক ৫৩ শতাংশ।
তবে এই পরিসংখ্যানকে চূড়ান্ত ফলাফল হিসেবে বিবেচনা করা যাবে না। ভোট গণনার পরবর্তী পর্যায়ে প্রকাশিত অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রায় ৪০ শতাংশ ভোট গণনার সময় লিকুদ দলের প্রাপ্ত ভোটের হার ছিল ২১ দশমিক ৭০ শতাংশ এবং ইয়াশার দলের হার ছিল ১৫ দশমিক ৭২ শতাংশ। অর্থাৎ, বিভিন্ন সময়ে প্রকাশিত হিসাবের মধ্যে পার্থক্য রয়েছে। তাই প্রতিবেদনে কোন সময়ের হিসাব ব্যবহার করা হচ্ছে, তা উল্লেখ করা জরুরি। সর্বশেষ যাচাইকৃত পরিসংখ্যানের জন্য কেন্দ্রীয় নির্বাচন কমিটির হালনাগাদ তথ্যই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
ইসরায়েলের সংসদকে বলা হয় নেসেট। এই সংসদে মোট আসন রয়েছে ১২০টি। সরকার গঠনের জন্য কোনো দল বা জোটকে অন্তত ৬১টি আসনের সমর্থন নিশ্চিত করতে হয়। দেশটির নির্বাচনী ব্যবস্থায় ভোটাররা দলকে ভোট দেন এবং পরে দলগুলো নিজেদের মধ্যে সমঝোতা করে জোট সরকার গঠন করে। ফলে কোনো একটি দল সর্বাধিক ভোট পেলেও সংসদে সংখ্যাগরিষ্ঠ সমর্থন না থাকলে এককভাবে সরকার পরিচালনা করা কঠিন হয়ে পড়ে। বর্তমান নির্বাচনেও মূল প্রশ্ন শুধু কোন দল সবচেয়ে বেশি ভোট পেয়েছে, তা নয়; বরং কোন পক্ষ ৬১টি আসনের সমর্থন জোগাড় করতে পারবে, সেটিই গুরুত্বপূর্ণ।
নেতানিয়াহুর প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী গাদি আইজেনকোট একজন সাবেক সেনাপ্রধান। তাঁর নেতৃত্বাধীন ইয়াশার দল নির্বাচনে সরকার পরিবর্তনের প্রত্যাশা সামনে রেখে প্রচার চালিয়েছে। দলটি নিরাপত্তা জোরদার, রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতি মানুষের আস্থা পুনর্গঠন এবং সামাজিক বিভাজন কমানোর প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। অন্যদিকে নেতানিয়াহু তাঁর দীর্ঘ রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা, নিরাপত্তাবিষয়ক অবস্থান এবং ইরানের বিরুদ্ধে কঠোর নীতিকে নির্বাচনী প্রচারের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে তুলে ধরেছেন। দুই পক্ষের অবস্থান ও সমর্থকদের মধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বিতা ইসরায়েলের রাজনীতিকে আরও প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ করে তুলেছে।
নির্বাচনের ফলাফল নিয়ে অনিশ্চয়তার আরেকটি বড় কারণ হলো বিভিন্ন ছোট দলের অবস্থান। সরকার গঠনের আলোচনায় এসব দলের সমর্থন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। বিশেষ করে আরব নাগরিকদের প্রতিনিধিত্বকারী দলগুলোর প্রাপ্ত আসন এবং তারা কোন পক্ষকে সমর্থন করবে, তা জোট গঠনের হিসাব পাল্টে দিতে পারে। তবে কোনো দল নির্বাচনে ভালো করলেই যে তারা নির্দিষ্ট জোটে যোগ দেবে, এমন সিদ্ধান্ত ধরে নেওয়া ঠিক হবে না। দলগুলোর প্রকাশ্য বক্তব্য, রাজনৈতিক শর্ত এবং আনুষ্ঠানিক সমঝোতার ওপরই শেষ পর্যন্ত জোটের রূপ নির্ভর করবে।
এবারের নির্বাচনকে ইসরায়েলের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা হিসেবে দেখা হচ্ছে। ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের নেতৃত্বে হামলার পর গাজায় যুদ্ধ, আঞ্চলিক সংঘাত, নিরাপত্তা পরিস্থিতি এবং সরকারের সিদ্ধান্ত নিয়ে দেশটির জনগণের মধ্যে তীব্র বিতর্ক তৈরি হয়েছে। লেবানন ও ইরানকে ঘিরে সংঘাতের প্রভাবও নির্বাচনী আলোচনায় স্থান পেয়েছে। নেতানিয়াহুর সমর্থকেরা নিরাপত্তা ও সামরিক সক্ষমতার বিষয়টি গুরুত্ব দিয়েছেন। অন্যদিকে বিরোধী পক্ষ সরকারের নেতৃত্ব, যুদ্ধ পরিচালনা এবং দেশের ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন দৃষ্টিভঙ্গির প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেছে।
ভোটার উপস্থিতিও এবারের নির্বাচনের উল্লেখযোগ্য দিক। আল জাজিরার ২৮ অক্টোবর প্রকাশিত বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ভোটার উপস্থিতি ছিল ৭৭ দশমিক ৭ শতাংশ, যা ১৯৯৯ সালের পর সর্বোচ্চ বলে জানিয়েছে কেন্দ্রীয় নির্বাচন কমিটি। ২০২২ সালের নির্বাচনের তুলনায় উপস্থিতি বেড়েছে ৭ দশমিক ১ শতাংশ। এই উচ্চ উপস্থিতি নির্বাচনের প্রতি মানুষের আগ্রহের ইঙ্গিত দেয়, যদিও শুধু ভোটার উপস্থিতির হার থেকে কোনো দলের প্রতি জনসমর্থনের চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায় না।
নির্বাচনের ফলাফল নিশ্চিত হওয়ার পরও সরকার গঠনের প্রক্রিয়া শেষ হতে সময় লাগতে পারে। দলগুলোর মধ্যে আলোচনা, সম্ভাব্য জোটের শর্ত এবং সংসদীয় সমর্থন নিশ্চিত করার বিষয়গুলো এতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। কেন্দ্রীয় নির্বাচন কমিটির হালনাগাদ তথ্যই চূড়ান্ত ফলাফল যাচাইয়ের প্রধান ভিত্তি। সব ভোট গণনা ও যাচাই শেষ না হওয়া পর্যন্ত দলগুলোর প্রাপ্ত ভোট ও আসনের হিসাব পরিবর্তিত হতে পারে।
প্রাথমিক গণনায় লিকুদ দলের এগিয়ে থাকা নেতানিয়াহুর জন্য গুরুত্বপূর্ণ হলেও এটিকে সরকার গঠনের নিশ্চয়তা বলা যাবে না। ইয়াশার দলসহ বিরোধী পক্ষের অবস্থান, ছোট দলগুলোর সিদ্ধান্ত এবং সংসদে ৬১টি আসনের সমর্থন নিশ্চিত করার সক্ষমতাই শেষ পর্যন্ত রাজনৈতিক পরিস্থিতি নির্ধারণ করবে। তাই ভোটের শতাংশ, সম্ভাব্য আসনসংখ্যা এবং চূড়ান্ত সরকারি ফলাফলকে আলাদা করে দেখা জরুরি। এখন পর্যন্ত প্রকাশিত প্রাথমিক হিসাবের ভিত্তিতে ইসরায়েলের পরবর্তী সরকার গঠনের চিত্র পুরোপুরি স্পষ্ট নয়।






মন্তব্য ০
লগইন করুন অথবা বিনা মূল্যে অ্যাকাউন্ট খুলুন আলোচনায় যোগ দিতে। নাম গোপন রেখেও মন্তব্য করতে পারবেন।
এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি করুন।