দ্রব্যমূল্য ও জ্বালানির চাপে মার্কিন ভোটার, নির্বাচনে কি বদলাবে দলীয় সমীকরণ?
যুক্তরাষ্ট্রে খাদ্যপণ্য ও জ্বালানির ঊর্ধ্বমূল্যে ভোটারদের উদ্বেগ বাড়ছে, তবে আসন্ন মধ্যবর্তী নির্বাচনে দীর্ঘদিনের দলীয় আনুগত্য অনেক ক্ষেত্রেই অটুট রয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য ও জ্বালানির উচ্চমূল্য আসন্ন মধ্যবর্তী নির্বাচনকে ঘিরে ভোটারদের অন্যতম প্রধান উদ্বেগে পরিণত হয়েছে। বাজারে খাদ্যপণ্য কেনা, গাড়িতে জ্বালানি ভরা, আবাসনের ব্যয় মেটানো এবং চিকিৎসার খরচ বহন করতে গিয়ে বহু পরিবার আর্থিক চাপের মুখে পড়ছে। তবে এই অসন্তোষ সব ভোটারের রাজনৈতিক অবস্থান বদলে দিচ্ছে না। ২৭ অক্টোবর প্রকাশিত রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ কয়েকটি নির্বাচনী এলাকায় মূল্যবৃদ্ধি নিয়ে ব্যাপক উদ্বেগ থাকলেও ক্ষমতাসীন রিপাবলিকান দলের অনেক সমর্থক এবারও নিজেদের পছন্দের প্রার্থীদের ভোট দেওয়ার সিদ্ধান্তে অটল রয়েছেন।
আগামী ৩ নভেম্বর যুক্তরাষ্ট্রে কংগ্রেসের মধ্যবর্তী নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা। এই নির্বাচনের মাধ্যমে প্রতিনিধি পরিষদ ও সিনেটের নিয়ন্ত্রণ কোন দলের হাতে থাকবে, তা নির্ধারিত হবে। ফলে অর্থনীতি, মূল্যস্ফীতি, জ্বালানির দাম এবং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় নির্বাচনী প্রচারের গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে উঠেছে। বিশেষ করে যেসব আসনে দুই দলের প্রার্থীদের মধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বিতা তীব্র, সেখানে ভোটারদের অর্থনৈতিক অভিজ্ঞতা নির্বাচনের ফলাফলে প্রভাব ফেলতে পারে। তবে ব্যক্তিগত আর্থিক অসন্তোষ এবং ভোটের সিদ্ধান্তের মধ্যে সরাসরি সম্পর্ক সব সময় দেখা যাচ্ছে না।
রয়টার্সের ২৭ অক্টোবরের প্রতিবেদনে নিউইয়র্ক, পেনসিলভানিয়া ও নিউ জার্সির তিনটি প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ নির্বাচনী এলাকার দুই ডজনেরও বেশি ভোটারের সঙ্গে কথা বলা হয়। তাঁদের অনেকেই নিজেদের শ্রমজীবী অথবা মধ্যবিত্ত পরিবারের সদস্য হিসেবে পরিচয় দিয়েছেন। সাক্ষাৎকারে খাদ্যপণ্য ও জ্বালানির উচ্চমূল্য নিয়ে উদ্বেগের কথা উঠে এসেছে। অনেকে কেনাকাটার তালিকা ছোট করছেন, তুলনামূলক সস্তা পণ্য বেছে নিচ্ছেন এবং আগে নিয়মিত কেনা কিছু পণ্য বাদ দিচ্ছেন। তা সত্ত্বেও দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক বিশ্বাস ও দলীয় আনুগত্যের কারণে তাঁদের একটি অংশ প্রার্থী পরিবর্তনে আগ্রহী নন।
প্রতিবেদনে নিউইয়র্কের পিকস্কিল এলাকার ৭৪ বছর বয়সী জন বিয়ার্সের অভিজ্ঞতা তুলে ধরা হয়েছে। তিনি আগে থেকেই রিপাবলিকানপন্থী ভোটার এবং এবারও নিজের এলাকার রিপাবলিকান প্রার্থীকে সমর্থন করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। অথচ তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। ব্যয় সামলাতে তিনি তুলনামূলক সস্তা কফি কিনছেন এবং কিছু পণ্য কেনা বন্ধ রেখেছেন। অর্থনৈতিক চাপ সত্ত্বেও তাঁর রাজনৈতিক পছন্দ বদলায়নি। একইভাবে পেনসিলভানিয়ার অবসরপ্রাপ্ত যন্ত্রকর্মী ফ্রেড ম্যাকডোনাল্ডও দীর্ঘদিনের দলীয় সমর্থন অব্যাহত রাখার কথা জানিয়েছেন।
এই অভিজ্ঞতাগুলো নির্বাচনী বিশ্লেষকদের সামনে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তুলেছে মানুষের দৈনন্দিন জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়ে গেলে তার প্রভাব ভোটের সিদ্ধান্তে কতটা পড়ে? ভোক্তা আচরণ বিশ্লেষণকারী প্রতিষ্ঠান কেয়ারনি ভোক্তা প্রতিষ্ঠানের প্রধান কেটি থমাসের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, অর্থনীতি সম্পর্কে মানুষের মনোভাব এবং তাঁদের কেনাকাটা বা ভোট দেওয়ার আচরণের মধ্যে সব সময় সামঞ্জস্য থাকে না। ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা বাড়লে অনেকেই পরিচিত অভ্যাস, দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক আনুগত্য এবং ব্যক্তিগত বিশ্বাসের ওপর নির্ভর করেন। তাই মূল্যবৃদ্ধি নিয়ে ক্ষোভ থাকলেও সেটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে ভোট পরিবর্তনে রূপ নেয় না।
তবে অর্থনৈতিক অসন্তোষের রাজনৈতিক প্রভাব একেবারে অনুপস্থিত নয়। প্রতিবেদনে নিউ জার্সির সপ্তম নির্বাচনী এলাকার অবসরপ্রাপ্ত নার্স কার্লা শিলারের উদাহরণ দেওয়া হয়েছে। তিনি আগে রিপাবলিকান প্রার্থীকে সমর্থন করলেও এবার ডেমোক্র্যাট প্রার্থী রেবেকা বেনেটকে ভোট দেওয়ার পরিকল্পনার কথা জানিয়েছেন। নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের ব্যয় সামলাতে তিনি তুলনামূলক কম দামের দোকানে কেনাকাটা করছেন। তাঁর অভিজ্ঞতা দেখায়, পরিবারের মৌলিক চাহিদা পূরণের সক্ষমতা যখন প্রশ্নের মুখে পড়ে, তখন কিছু ভোটার রাজনৈতিক পছন্দ পুনর্বিবেচনা করতে পারেন।
মূল্যবৃদ্ধি নিয়ে উদ্বেগের পেছনে একাধিক অর্থনৈতিক কারণ কাজ করছে। রয়টার্স ও ইপসোসের যৌথ জনমত জরিপে অংশ নেওয়া ৭৮ শতাংশ মার্কিন নাগরিকের ধারণা, মূল্যবৃদ্ধির জন্য প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসনের নীতিরও দায় রয়েছে। জরিপে অংশগ্রহণকারীদের বড় একটি অংশ মনে করেন, তাঁদের আয়ের তুলনায় জীবনযাত্রার ব্যয় দ্রুত বাড়ছে। তবে জরিপে কোনো নীতির জন্য প্রশাসনকে দায়ী করা এবং সেই কারণে ভোট পরিবর্তন করা এক বিষয় নয়।
জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। পেট্রল ও ডিজেলের দাম বাড়লে ব্যক্তিগত গাড়ি ব্যবহারকারী পরিবারগুলোর সরাসরি ব্যয় বৃদ্ধি পায়। একই সঙ্গে পণ্য পরিবহন, কৃষিকাজ এবং সরবরাহব্যবস্থার খরচও বাড়তে পারে, যার প্রভাব শেষ পর্যন্ত দোকানের পণ্যমূল্যে পড়ে। ফলে জ্বালানির ব্যয় কেবল গাড়িচালকদের সমস্যা নয়; এটি খাদ্যপণ্যসহ অন্যান্য নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দামেও চাপ সৃষ্টি করতে পারে। মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত এবং জ্বালানি সরবরাহ নিয়ে অনিশ্চয়তাও বাজারের উদ্বেগ বাড়িয়েছে।
এই অর্থনৈতিক চাপের মধ্যে ডেমোক্র্যাট প্রার্থীরা জীবনযাত্রার ব্যয়কে নির্বাচনী প্রচারের কেন্দ্রে রাখার সুযোগ পাচ্ছেন। কয়েকজন ভোটার জানিয়েছেন, এবার তাঁদের ভোট দেওয়ার আগ্রহ আগের চেয়ে বেশি। তাঁদের প্রত্যাশা, নির্বাচিত প্রতিনিধিরা খাদ্যপণ্য, জ্বালানি, আবাসন ও চিকিৎসার ব্যয় কমানোর দিকে বেশি মনোযোগ দেবেন। তবে তাঁদের অসন্তোষ কতটা ভোটকেন্দ্রে উপস্থিতি বাড়াবে এবং প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ আসনে ফলাফল বদলাবে, তা এখনো নিশ্চিত নয়।
অন্যদিকে, রিপাবলিকান সমর্থকদের একটি অংশ মূল্যবৃদ্ধির জন্য শুধু ক্ষমতাসীন দলের নীতিকে দায়ী করছেন না। কেউ কেউ বৃহত্তর রাজনৈতিক ও ব্যবসায়িক স্বার্থ, বৈশ্বিক পরিস্থিতি কিংবা সামগ্রিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থাকে দায়ী করছেন। এ কারণে নিজেদের আর্থিক অসুবিধা সত্ত্বেও তাঁরা পরিচিত প্রার্থীদের ওপর আস্থা ধরে রাখছেন।
যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচন সামনে রেখে দ্রব্যমূল্য ও জ্বালানি ব্যয় ভোটারদের সিদ্ধান্তে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। কিন্তু নির্বাচনের ফল নির্ভর করবে শুধু মূল্যবৃদ্ধি নিয়ে ক্ষোভের ওপর নয়; প্রার্থীদের প্রতি আস্থা, দলীয় আনুগত্য, ভোটার উপস্থিতি এবং প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ আসনগুলোর পরিস্থিতিও গুরুত্বপূর্ণ হবে। বর্তমানে উপলব্ধ তথ্য থেকে বলা যায়, অর্থনৈতিক অসন্তোষ একটি বড় নির্বাচনী ইস্যু হলেও সেটি একাই ভোটের ফল নির্ধারণ করবে এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর যথেষ্ট ভিত্তি নেই।






মন্তব্য ০
লগইন করুন অথবা বিনা মূল্যে অ্যাকাউন্ট খুলুন আলোচনায় যোগ দিতে। নাম গোপন রেখেও মন্তব্য করতে পারবেন।
এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি করুন।