কানাডার আলবার্টা প্রদেশের ক্যালগারি শহরে ইমাম হিসেবে দায়িত্ব পালন করা শেখ আবদি হারসিকে ঘিরে পুরোনো একটি ফৌজদারি মামলা নতুন করে আলোচনায় এসেছে। প্রায় দুই দশক আগে যুক্তরাষ্ট্রের মিনেসোটা অঙ্গরাজ্যে দুই নারী রোগীর সঙ্গে যৌন অসদাচরণের অভিযোগে তাঁর বিরুদ্ধে ছয়টি অভিযোগ আনা হয়েছিল। ২০১৫ সালে কানাডার সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, ওই মামলায় তাঁর বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি হয়েছিল। তবে অভিযোগগুলোর বিচার যুক্তরাষ্ট্রের আদালতে সম্পন্ন হওয়ার প্রমাণ পাওয়া যায়নি। হারসি অভিযোগ অস্বীকার করেছেন এবং নিজের বক্তব্য আদালতে তুলে ধরার আগ্রহ প্রকাশ করেছিলেন। ঘটনাটির গুরুত্ব শুধু অভিযোগের ধরনে সীমাবদ্ধ নয়। একদিকে রয়েছে হাসপাতালের দুই রোগীর করা অভিযোগ এবং পেশাগত নিয়ন্ত্রক সংস্থার নেওয়া ব্যবস্থা; অন্যদিকে রয়েছেন অভিযুক্ত ব্যক্তি, যিনি নিজেকে নির্দোষ বলে দাবি করেছেন এবং কানাডায় ধর্মীয় ও সামাজিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত রয়েছেন। এ ক্ষেত্রে অভিযোগ, প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত এবং আদালতে প্রমাণিত অপরাধ—এই তিনটি বিষয়কে আলাদা করে দেখা জরুরি।
প্রকাশিত সংবাদ প্রতিবেদন অনুসারে, ২০০৬ সালে যুক্তরাষ্ট্রের মিনেসোটার উডবেরি শহরের উডউইন্ডস হাসপাতালে শ্বাসপ্রশ্বাসের চিকিৎসাসেবাকর্মী হিসেবে কাজ করতেন আবদি হারসি। সে সময় দুই নারী রোগী অভিযোগ করেন, চিকিৎসা দেওয়ার সময় তিনি তাঁদের হাসপাতালের পোশাকের নিচে অনাকাঙ্ক্ষিতভাবে স্পর্শ করেছিলেন। তাঁদের একজনের অভিযোগ ছিল, চিকিৎসার অংশ হিসেবে স্পর্শ করার কথা বলার পাশাপাশি তিনি যৌন সম্পর্কের প্রস্তাবও দিয়েছিলেন। এসব অভিযোগের বিষয়ে তখন পুলিশ তদন্ত করে এবং ওয়াশিংটন কাউন্টিতে তাঁর বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা করা হয়। ২০০৬ সালে দায়ের হওয়া মামলায় মোট ছয়টি অভিযোগের কথা ২০১৫ সালের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। এর মধ্যে দুটি ছিল চতুর্থ মাত্রার যৌন অসদাচরণসংক্রান্ত অভিযোগ, দুটি ছিল পঞ্চম মাত্রার যৌন অসদাচরণসংক্রান্ত অভিযোগ এবং দুটি ছিল অপরাধমূলক নির্যাতনসংক্রান্ত অভিযোগ। এগুলো যুক্তরাষ্ট্রের মিনেসোটা অঙ্গরাজ্যের আইন অনুযায়ী নির্ধারিত অভিযোগের শ্রেণি। বাংলাদেশের প্রচলিত আইনের সঙ্গে সরাসরি মিলিয়ে এগুলোর শাস্তির মাত্রা নির্ধারণ করা ঠিক হবে না। এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, ছয়টি অভিযোগ দায়ের হওয়ার অর্থ এই নয় যে ছয়টি অপরাধেই তিনি দোষী সাব্যস্ত হয়েছেন। সংবাদমাধ্যমের প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, অভিযোগগুলোর বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের আদালতে চূড়ান্ত বিচার হয়নি। ফলে তাঁকে দোষী হিসেবে উপস্থাপন করা আইনগতভাবে সঠিক হবে না। নির্দোষ থাকার আইনি অনুমান বজায় রেখেই মামলার বিবরণ প্রকাশ করা প্রয়োজন। ঘটনার পর হারসি যুক্তরাষ্ট্র ছেড়ে কানাডায় যান। পরবর্তী সময়ে তিনি সেখানে শরণার্থী সুরক্ষা লাভ করেন। কানাডার সম্প্রচারমাধ্যমের ২০১৫ সালের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০০৮ সালে তাঁকে শরণার্থী সুরক্ষা দেওয়া হয়েছিল। পরে যুক্তরাষ্ট্রে তাঁর বিরুদ্ধে থাকা অভিযোগ ও গ্রেপ্তারি পরোয়ানার বিষয় সামনে এলে কানাডার শরণার্থী কর্তৃপক্ষ তাঁর সুরক্ষা প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত নেয়। ২০১৩ সালের ২৪ মে এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল বলে প্রকাশিত প্রতিবেদনে উল্লেখ রয়েছে। তবে তিনি ওই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আইনি চ্যালেঞ্জ করেন এবং কানাডার ফেডারেল আদালতে সফল হন। এর ফলে তাঁর শরণার্থী সুরক্ষা বহাল থাকে।
শরণার্থী সুরক্ষার বিষয়টি বোঝার জন্য একটি পার্থক্য মনে রাখা দরকার। কোনো ব্যক্তি কানাডায় শরণার্থী হিসেবে সুরক্ষা পেয়েছেন, তার অর্থ এই নয় যে অন্য দেশে তাঁর বিরুদ্ধে থাকা ফৌজদারি অভিযোগ বাতিল হয়ে গেছে। একইভাবে, বিদেশে অভিযোগ থাকা মাত্রই কানাডায় তাঁর শরণার্থী মর্যাদা স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল হয় না। এ ধরনের সিদ্ধান্ত নির্ভর করে সংশ্লিষ্ট দেশের আইন, প্রমাণ এবং আদালত বা প্রশাসনিক কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্তের ওপর। হারসি নিজেও অভিযোগের বিষয়ে প্রকাশ্যে বক্তব্য দিয়েছিলেন। ২০১৫ সালের মার্চে কানাডার সংবাদমাধ্যমের সঙ্গে কথা বলার সময় তিনি অভিযোগ অস্বীকার করেন এবং যুক্তরাষ্ট্রে ফিরে নিজের অবস্থান ব্যাখ্যা করতে চান বলে জানান। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, অভিবাসনসংক্রান্ত জটিলতার কারণে তিনি মামলাটির নিষ্পত্তি করতে পারেননি। সে সময় তাঁর আইনজীবীও বলেছিলেন, যুক্তরাষ্ট্রের কর্তৃপক্ষ তাঁকে আদালতে উপস্থিত হওয়ার সুযোগ দিলে তিনি নিজের বক্তব্য তুলে ধরতে প্রস্তুত থাকবেন। এগুলো হারসি ও তাঁর আইনজীবীর বক্তব্য; এগুলোকে আদালতের সিদ্ধান্ত হিসেবে বিবেচনা করা যাবে না।
এই ঘটনার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো তাঁর পেশাগত নিবন্ধন বাতিলের বিষয়টি। মিনেসোটা অঙ্গরাজ্যের পেশাগত নিয়ন্ত্রক সংস্থার প্রকাশিত নথিতে দেখা যায়, আবদি ই হারসির শ্বাসপ্রশ্বাসের চিকিৎসাসেবাকর্মী হিসেবে নিবন্ধন ২০০৯ সালের ১২ মার্চ বাতিল করা হয়েছিল। সংস্থার সিদ্ধান্তের তালিকায় বিষয়টি উল্লেখ রয়েছে। অর্থাৎ তাঁর বিরুদ্ধে কেবল ফৌজদারি অভিযোগই ছিল না, চিকিৎসাসেবার পেশাগত ক্ষেত্রেও নিয়ন্ত্রক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল। তবে পেশাগত নিবন্ধন বাতিল এবং ফৌজদারি আদালতে দোষী সাব্যস্ত হওয়া এক বিষয় নয়। ২০১৫ সালের সংবাদ প্রতিবেদনগুলোতে আরও বলা হয়েছিল, যুক্তরাষ্ট্রে অভিযোগ ওঠার পর তিনি হাসপাতালের চাকরি হারান। একই সময়ে কানাডার আলবার্টা প্রদেশে শ্বাসপ্রশ্বাসের চিকিৎসাসেবার সঙ্গে যুক্ত একটি প্রতিষ্ঠানে অল্প সময় কাজ করেছিলেন বলেও সংবাদমাধ্যমে তথ্য প্রকাশিত হয়। সংশ্লিষ্ট পেশাগত নিয়ন্ত্রক সংস্থা তাঁর নিবন্ধনের বিষয়ে ব্যবস্থা নিয়েছিল বলে ওই প্রতিবেদনগুলোতে উল্লেখ করা হয়েছিল। এসব তথ্য সে সময়কার সংবাদ প্রতিবেদন ও পেশাগত নথির ভিত্তিতে প্রকাশিত; সাম্প্রতিক কোনো নতুন চাকরি বা পেশাগত কর্মকাণ্ড সম্পর্কে এগুলো থেকে সিদ্ধান্ত টানা যায় না। ক্যালগারিতে তাঁর ধর্মীয় দায়িত্বের বিষয়টিও আলোচনায় এসেছে। আবু বকর ইসলামিক সেন্টারের নিজস্ব ওয়েবসাইটে শেখ আবদি হারসিকে ওই প্রতিষ্ঠানের ইমাম হিসেবে পরিচয় করিয়ে দেওয়া হয়েছে। সেখানে তাঁর ধর্মীয় শিক্ষার পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রে শ্বাসপ্রশ্বাসের চিকিৎসাসেবা বিষয়ে পড়াশোনা এবং পরবর্তী শিক্ষাজীবনের কথাও উল্লেখ রয়েছে। ওয়েবসাইটের তথ্য অনুযায়ী, তিনি ইংরেজি, আরবি ও সোমালি ভাষায় ধর্মীয় কার্যক্রম পরিচালনা করেন। এই তথ্য তাঁর বর্তমান প্রকাশ্য পরিচয়ের বিষয়ে প্রাসঙ্গিক হলেও, যুক্তরাষ্ট্রের মামলার বর্তমান আইনি অবস্থা সম্পর্কে এটি কোনো প্রমাণ নয়। এর আগে ক্যালগারির মুসলিম কাউন্সিলের সঙ্গে তাঁর সম্পৃক্ততার বিষয়েও সংবাদ প্রকাশিত হয়েছিল। ২০১৫ সালের প্রতিবেদনে বলা হয়, অভিযোগ ও গ্রেপ্তারি পরোয়ানার বিষয়ে জানার পর ওই কাউন্সিল তাঁকে ইমামের দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দিয়েছিল। তবে পরে তিনি অন্য ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে দায়িত্ব পালন করেন বলে বিভিন্ন প্রকাশিত সূত্রে উল্লেখ রয়েছে। এ ধরনের ঘটনা ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর নিয়োগপ্রক্রিয়ায় প্রার্থীর পেশাগত অতীত, পরিচয় এবং প্রাসঙ্গিক তথ্য যাচাইয়ের গুরুত্ব তুলে ধরে। একই সঙ্গে, অভিযোগের ভিত্তিতে কোনো ব্যক্তিকে সামাজিকভাবে চূড়ান্তভাবে দোষী ঘোষণা না করার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ।
এখন প্রশ্ন হলো, এত বছর পরও মামলাটির কী অবস্থা? এখানে সতর্ক থাকা প্রয়োজন। ২০১৫ সালের মার্চে প্রকাশিত কানাডার সংবাদ প্রতিবেদনগুলোতে যুক্তরাষ্ট্রে তাঁর বিরুদ্ধে সক্রিয় গ্রেপ্তারি পরোয়ানার কথা বলা হয়েছিল। কিন্তু এই অনুসন্ধানে ২০২৬ সালের অক্টোবর পর্যন্ত ওই পরোয়ানার বর্তমান অবস্থা নিশ্চিত করার মতো হালনাগাদ সরকারি নথি পাওয়া যায়নি। তাই পরোয়ানাটি এখনো কার্যকর—এমন দাবি বর্তমান সময়ের নিশ্চিত তথ্য হিসেবে উপস্থাপন করা যাচ্ছে না। একইভাবে, যুক্তরাষ্ট্রের কর্তৃপক্ষ সম্প্রতি তাঁকে গ্রেপ্তার, প্রত্যর্পণ বা আদালতে হাজির করার কোনো নতুন পদক্ষেপ নিয়েছে কি না, সে সম্পর্কেও নির্ভরযোগ্য হালনাগাদ তথ্য পাওয়া যায়নি। মামলাটির বর্তমান অবস্থা নিশ্চিত করতে মিনেসোটার ওয়াশিংটন কাউন্টির আদালতের নথি, সংশ্লিষ্ট আইন প্রয়োগকারী সংস্থার হালনাগাদ তথ্য এবং কানাডার অভিবাসন কর্তৃপক্ষের নথি পরীক্ষা করা প্রয়োজন। শুধু পুরোনো সংবাদ প্রতিবেদন বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পোস্টের ওপর নির্ভর করে বর্তমান গ্রেপ্তারি পরোয়ানা, শরণার্থী মর্যাদা কিংবা বিচারপ্রক্রিয়ার অবস্থা সম্পর্কে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দেওয়া যায় না। ঘটনাটি নিয়ে জনস্বার্থের প্রশ্নও রয়েছে। হাসপাতালের রোগীরা চিকিৎসা নেওয়ার সময় চিকিৎসাসেবাকর্মীদের ওপর আস্থা রাখেন। সেই আস্থার অপব্যবহারের অভিযোগ উঠলে যথাযথ তদন্ত এবং ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা জরুরি। আবার অভিযুক্ত ব্যক্তিরও নিজের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগের জবাব দেওয়ার এবং নিরপেক্ষ বিচার পাওয়ার অধিকার রয়েছে। অভিযোগ দীর্ঘদিন ধরে নিষ্পত্তি না হলে অভিযোগকারী, অভিযুক্ত ব্যক্তি এবং সংশ্লিষ্ট সমাজ—সবার জন্যই অনিশ্চয়তা তৈরি হতে পারে। সব মিলিয়ে, আবদি হারসিকে ঘিরে তিনটি বিষয় নথি ও প্রকাশিত সংবাদ থেকে সমর্থন পাওয়া যায়: ২০০৬ সালে তাঁর বিরুদ্ধে ছয়টি ফৌজদারি অভিযোগ দায়ের হয়েছিল, ২০০৯ সালে মিনেসোটায় তাঁর পেশাগত নিবন্ধন বাতিল করা হয়েছিল এবং ২০১৩ সালে কানাডায় তাঁর শরণার্থী সুরক্ষা প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত তিনি আদালতে চ্যালেঞ্জ করে বহাল রাখতে সক্ষম হয়েছিলেন। ২০১৫ সালের সংবাদমাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রের গ্রেপ্তারি পরোয়ানার কথাও প্রকাশিত হয়েছিল। তবে অভিযোগগুলোর চূড়ান্ত বিচার হয়েছে—এমন প্রমাণ পাওয়া যায়নি। আর ২০২৬ সালের অক্টোবর পর্যন্ত পরোয়ানাটি এখনো কার্যকর কি না, তা এই অনুসন্ধানে স্বাধীনভাবে নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি। তাই ঘটনাটিকে পুরোনো ফৌজদারি অভিযোগ ও চলমান জনস্বার্থের প্রশ্ন হিসেবে দেখা যথাযথ; প্রমাণিত অপরাধ হিসেবে নয়।
মন্তব্য ০
লগইন করুন অথবা বিনা মূল্যে অ্যাকাউন্ট খুলুন আলোচনায় যোগ দিতে। নাম গোপন রেখেও মন্তব্য করতে পারবেন।
এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি করুন।