মালয়েশিয়ায় চাকরি হারানোর শঙ্কায় ৩৬ বাংলাদেশিসহ ১৩০ শ্রমিকের অন্য কোম্পানিতে কাজের দাবি
৮,৫৫৬ বার পড়া হয়েছে ৬ মিনিটে পড়ুন
মালয়েশিয়ার জোহর বাহরুতে অবস্থিত টয়োপ্লাস কারখানায় কর্মরত ৩৬ জন বাংলাদেশিসহ প্রায় ১৩০ জন বিদেশি শ্রমিকের কর্মসংস্থান নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। কারখানায় কাজের পরিমাণ কমে যাওয়ায় তাঁদের দেশে ফেরত পাঠানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে ২৭ অক্টোবর প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে। তবে দেশে ফিরে যাওয়ার পরিবর্তে অন্য প্রতিষ্ঠানে কাজ করার সুযোগ চান ক্ষতিগ্রস্ত শ্রমিকেরা। তাঁদের এই দাবিকে কেন্দ্র করে কারখানায় ধর্মঘট শুরু হয়েছে বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, কাজের পরিমাণ কমে যাওয়ায় কর্তৃপক্ষ বিদেশি শ্রমিকদের কর্মসংস্থান অব্যাহত রাখা নিয়ে নতুন সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এই সিদ্ধান্তের আওতায় প্রায় ১৩০ জন শ্রমিক রয়েছেন, যাঁদের মধ্যে ৩৬ জন বাংলাদেশি। তবে বাকি শ্রমিকেরা কোন কোন দেশের নাগরিক, তাঁদের চাকরি শেষ করার নির্দিষ্ট তারিখ কী এবং কত দিন ধরে তাঁরা ওই কারখানায় কর্মরত রয়েছেন, সে বিষয়ে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বিস্তারিত তথ্য দেওয়া হয়নি।
কর্মসংস্থান হারানোর এই আশঙ্কা বাংলাদেশি শ্রমিকদের জন্য বিশেষ উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিদেশে কাজ করতে আসা অনেক শ্রমিককে নিজের দেশ ছেড়ে হাজার হাজার কিলোমিটার দূরে থাকতে হয়। পরিবারের ভরণপোষণ, সন্তানদের পড়াশোনা, বাড়িঘর নির্মাণ, ঋণ পরিশোধ এবং ভবিষ্যতের সঞ্চয়ের মতো নানা দায়িত্ব তাঁদের আয়ের ওপর নির্ভরশীল। ফলে হঠাৎ চাকরি হারানোর পরিস্থিতি তৈরি হলে শুধু শ্রমিক নিজে নন, তাঁর ওপর নির্ভরশীল পরিবারের সদস্যরাও আর্থিক অনিশ্চয়তার মুখে পড়তে পারেন। শ্রমিকদের মূল দাবি হলো, কাজের পরিমাণ কমে যাওয়ার কারণে তাঁদের যেন সরাসরি দেশে ফেরত পাঠানো না হয়। পরিবর্তে মালয়েশিয়ার অন্য কোনো প্রতিষ্ঠানে কাজ করার সুযোগ করে দেওয়া হোক। তাঁদের এই দাবি বাস্তবায়িত হলে একদিকে যেমন কর্মসংস্থান ধরে রাখার সম্ভাবনা তৈরি হবে, অন্যদিকে তেমনি নতুন করে বিদেশে আসা বা দেশে ফিরে আবার বিদেশে যাওয়ার জন্য অর্থ ব্যয় করার ঝুঁকিও কমতে পারে। তবে অন্য প্রতিষ্ঠানে তাঁদের নিয়োগের ব্যবস্থা করা সম্ভব হবে কি না, তা এখনো নিশ্চিত নয়। প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, শ্রমিকদের সমস্যা সমাধানে বাংলাদেশ হাইকমিশনও উদ্যোগ নিয়েছে। হাইকমিশনের পক্ষ থেকে সংশ্লিষ্ট কোম্পানি কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা করে শ্রমিকদের দেশে ফেরত না পাঠিয়ে অন্য প্রতিষ্ঠানে স্থানান্তরের মাধ্যমে কাজের সুযোগ দেওয়ার অনুরোধ জানানো হয়েছে। কিন্তু ওই অনুরোধের পরও কোম্পানি কর্তৃপক্ষ নিজেদের সিদ্ধান্তে অটল রয়েছে বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে। এ বিষয়ে হাইকমিশনের আনুষ্ঠানিক বক্তব্য, আলোচনার তারিখ কিংবা কোম্পানি কর্তৃপক্ষের লিখিত সিদ্ধান্তের অনুলিপি স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি। এ পরিস্থিতিতে শ্রমিকদের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, তাঁদের বর্তমান কাজের অনুমতি, চাকরির চুক্তি এবং অন্য প্রতিষ্ঠানে স্থানান্তরের সম্ভাবনা সম্পর্কে স্পষ্ট তথ্য পাওয়া। বিদেশে কর্মরত শ্রমিকদের ক্ষেত্রে শুধু নতুন চাকরি পাওয়াই যথেষ্ট নয়; নতুন প্রতিষ্ঠানে বৈধভাবে কাজ করার অনুমতি, বেতন, আবাসন, চিকিৎসা এবং অন্যান্য সুযোগ-সুবিধাও নিশ্চিত হওয়া জরুরি। এসব বিষয় পরিষ্কার না করে চাকরি পরিবর্তনের উদ্যোগ নিলে ভবিষ্যতে নতুন জটিলতা দেখা দিতে পারে। মালয়েশিয়ায় বিদেশি শ্রমিকদের কাজ করার ক্ষেত্রে অভিবাসনসংক্রান্ত অনুমতি ও নিয়োগকর্তার শর্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। তাই টয়োপ্লাসের শ্রমিকদের অন্য প্রতিষ্ঠানে স্থানান্তরের সম্ভাবনা যাচাই করতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সমন্বয় প্রয়োজন। কোন প্রক্রিয়ায় তাঁদের নিয়োগকর্তা পরিবর্তন করা যাবে, তাঁদের বর্তমান অনুমতির মেয়াদ কত দিন রয়েছে এবং নতুন প্রতিষ্ঠান তাঁদের নিয়োগ দিতে আগ্রহী কি না—এসব প্রশ্নের উত্তর জানা জরুরি। এ বিষয়ে নির্দিষ্ট সরকারি নির্দেশনা বা সংশ্লিষ্ট শ্রমিকদের নথি পাওয়া যায়নি বলে তাঁদের স্থানান্তর নিশ্চিত হয়েছে, এমন দাবি করা যাচ্ছে না।
এই ধরনের পরিস্থিতিতে শ্রমিকদের নিয়োগসংক্রান্ত কাগজপত্র, বেতন পরিশোধের হিসাব, কাজের অনুমতি এবং চাকরির চুক্তি সংরক্ষণ করা গুরুত্বপূর্ণ। কোম্পানির পক্ষ থেকে চাকরি শেষ করার কোনো লিখিত নোটিশ দেওয়া হলে তার অনুলিপি রাখা এবং নোটিশে উল্লেখ করা শর্তগুলো বুঝে নেওয়া উচিত। কোনো সিদ্ধান্তে সম্মতি দেওয়ার আগে শ্রমিকদের নিজেদের অধিকার সম্পর্কে নির্ভরযোগ্য তথ্য সংগ্রহ করা এবং প্রয়োজনে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সহায়তা নেওয়াও জরুরি। একই সঙ্গে ধর্মঘটের পরিস্থিতিতে শ্রমিকদের নিরাপত্তা ও স্বার্থ রক্ষার বিষয়টিও গুরুত্ব পাওয়া দরকার। শ্রমিকদের দাবি ও অভিযোগ যথাযথভাবে শোনা, কোম্পানি কর্তৃপক্ষের অবস্থান পরিষ্কার করা এবং আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের পথ খোঁজা—এসব পদক্ষেপ পরিস্থিতি শান্ত রাখতে সহায়তা করতে পারে। শ্রমিকদের কর্মসংস্থান নিয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে তাঁদের সঙ্গে সরাসরি আলোচনা এবং সম্ভাব্য বিকল্পগুলো স্পষ্টভাবে জানানো হলে অনিশ্চয়তা কমতে পারে। বাংলাদেশের প্রবাসী শ্রমিকদের জন্য মালয়েশিয়া দীর্ঘদিন ধরে কর্মসংস্থানের একটি গুরুত্বপূর্ণ গন্তব্য। দেশটিতে উৎপাদন ও বিভিন্ন শিল্প খাতে বিদেশি শ্রমিকেরা কাজ করেন। তবে কোনো প্রতিষ্ঠানে কাজ কমে যাওয়া, উৎপাদন হ্রাস কিংবা নিয়োগসংক্রান্ত পরিবর্তনের কারণে শ্রমিকদের কর্মসংস্থান ঝুঁকিতে পড়তে পারে। এ ধরনের পরিস্থিতিতে দ্রুত বিকল্প কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা না গেলে শ্রমিকদের আয় বন্ধ হয়ে যাওয়ার পাশাপাশি তাঁদের বিদেশে থাকার ব্যয় বহন করাও কঠিন হয়ে উঠতে পারে। মালয়েশিয়ায় শ্রমিকদের অধিকার ও কর্মসংস্থানের নিরাপত্তা নিয়ে অতীতেও বিভিন্ন সময়ে উদ্বেগ দেখা গেছে। ২০২৫ সালের মে মাসে দেশটির একটি কারখানায় বেতন ও অন্যান্য পাওনা নিয়ে বিরোধের পর বাংলাদেশি শ্রমিকদের ধর্মঘটের খবর প্রকাশিত হয়েছিল। তবে সেই ঘটনা ছিল অন্য একটি কারখানার এবং টয়োপ্লাসের বর্তমান পরিস্থিতির সঙ্গে সেটিকে এক করে দেখার সুযোগ নেই। ঘটনাটি কেবল দেখায় যে বেতন, কাজের নিশ্চয়তা ও নিয়োগের শর্ত নিয়ে বিরোধ হলে শ্রমিকদের সমস্যা সমাধানে কার্যকর আলোচনা গুরুত্বপূর্ণ। টয়োপ্লাসের শ্রমিকদের বর্তমান পরিস্থিতিতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে কয়েকটি বিষয়ের স্পষ্ট ব্যাখ্যা প্রত্যাশিত। প্রথমত, ঠিক কতজন শ্রমিককে চাকরি থেকে বাদ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে এবং তাঁদের চাকরি শেষ করার সময়সীমা কী। দ্বিতীয়ত, বাংলাদেশি শ্রমিকদের অন্য প্রতিষ্ঠানে স্থানান্তরের জন্য কোনো বিকল্প নিয়োগকর্তা পাওয়া গেছে কি না। তৃতীয়ত, চাকরি শেষ হলে শ্রমিকদের বকেয়া বেতন, অন্যান্য পাওনা ও দেশে ফেরার ব্যয় কীভাবে মেটানো হবে। চতুর্থত, যাঁরা মালয়েশিয়ায় থেকে নতুন চাকরি খুঁজতে চান, তাঁদের জন্য আইনসম্মত কোনো ব্যবস্থা করা সম্ভব কি না।
এসব প্রশ্নের উত্তর পাওয়া গেলে শ্রমিকদের ভবিষ্যৎ সম্পর্কে আরও পরিষ্কার ধারণা তৈরি হবে। একই সঙ্গে বাংলাদেশ হাইকমিশনের পক্ষ থেকে আলোচনার অগ্রগতি ও পরবর্তী পদক্ষেপ সম্পর্কে তথ্য প্রকাশ করা হলে শ্রমিকদের পরিবার এবং প্রবাসী বাংলাদেশি সম্প্রদায়ের উদ্বেগও কমতে পারে। তবে এ মুহূর্তে কোনো সমাধান চূড়ান্ত হয়েছে বা শ্রমিকদের অন্য প্রতিষ্ঠানে কাজ নিশ্চিত করা হয়েছে—এমন তথ্য প্রকাশিত প্রতিবেদনে নেই। সব মিলিয়ে, জোহর বাহরুর টয়োপ্লাস কারখানায় ৩৬ বাংলাদেশিসহ প্রায় ১৩০ শ্রমিকের কর্মসংস্থান নিয়ে তৈরি হওয়া অনিশ্চয়তা এখন গুরুত্বপূর্ণ একটি প্রবাসী শ্রমিক সংকট। শ্রমিকেরা দেশে ফিরে যাওয়ার পরিবর্তে অন্য প্রতিষ্ঠানে কাজ করার সুযোগ চাইছেন। বাংলাদেশ হাইকমিশনের উদ্যোগের পরও সমস্যার সমাধান হয়েছে কি না, তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি। এখন সংশ্লিষ্ট কোম্পানি কর্তৃপক্ষ, বাংলাদেশ হাইকমিশন এবং মালয়েশিয়ার সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের আলোচনার মাধ্যমে শ্রমিকদের কর্মসংস্থান রক্ষায় কী পদক্ষেপ নেওয়া হয়, সেটিই দেখার বিষয়।
মন্তব্য ০
লগইন করুন অথবা বিনা মূল্যে অ্যাকাউন্ট খুলুন আলোচনায় যোগ দিতে। নাম গোপন রেখেও মন্তব্য করতে পারবেন।
এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি করুন।