হান্টার বাইডেনের ল্যাপটপ তদন্তে মিথ্যা বলার অভিযোগে আদালতে দুই সাবেক এফবিআই কর্মকর্তা
যুক্তরাষ্ট্রে হান্টার বাইডেনের ল্যাপটপ তদন্ত নিয়ে নতুন আইনি মোড়, কংগ্রেসকে মিথ্যা তথ্য দেওয়ার অভিযোগে আদালতে হাজির হচ্ছেন দুই সাবেক কর্মকর্তা।
যুক্তরাষ্ট্রে হান্টার বাইডেনের ল্যাপটপ ঘিরে দীর্ঘদিনের বিতর্কে নতুন করে আইনি তৎপরতা শুরু হয়েছে। কংগ্রেসের কাছে নিজেদের জানা তথ্য সম্পর্কে মিথ্যা বক্তব্য দেওয়ার অভিযোগে দেশটির কেন্দ্রীয় তদন্ত সংস্থার দুই সাবেক কর্মকর্তা আদালতে হাজির হচ্ছেন। মঙ্গলবার, ২৭ অক্টোবর, ওয়াশিংটনের একটি কেন্দ্রীয় আদালতে তাঁদের মামলার প্রাথমিক শুনানি হওয়ার কথা রয়েছে। মামলাটি যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন বিতর্ক তৈরি করেছে। তবে অভিযুক্ত কর্মকর্তারা তাঁদের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।
যুক্তরাষ্ট্রের সংবাদমাধ্যম অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসের ২৭ অক্টোবরের প্রতিবেদন অনুযায়ী, অভিযুক্ত দুই সাবেক কর্মকর্তা হলেন নিকি ফ্লোরিস ও ব্র্যাডলি বেনাভিদেস। তাঁরা একসময় কেন্দ্রীয় তদন্ত সংস্থার বিদেশি হস্তক্ষেপবিষয়ক বিশেষ তদন্ত দলের নেতৃত্বে ছিলেন। অভিযোগ অনুযায়ী, ২০২৩ সালে কংগ্রেসের জিজ্ঞাসাবাদের সময় হান্টার বাইডেনের ল্যাপটপ এবং এ বিষয়ে সংস্থার অভ্যন্তরীণ আলোচনার সম্পর্কে তাঁরা যা জানতেন, তা নিয়ে ভুল বা মিথ্যা বক্তব্য দিয়েছিলেন বলে তদন্তকারীরা দাবি করছেন।
মামলার মূল বিষয়টি বুঝতে হলে ২০১৯ সালের ঘটনাগুলোর দিকে ফিরে তাকাতে হয়। সে সময় যুক্তরাষ্ট্রের ডেলাওয়্যার অঙ্গরাজ্যের একটি কম্পিউটার মেরামতের দোকানে হান্টার বাইডেনের বলে পরিচিত একটি ল্যাপটপ জমা পড়েছিল বলে জানা যায়। পরবর্তী সময়ে ল্যাপটপটির বিভিন্ন নথি ও ইমেইল প্রকাশ্যে আসে। ২০২০ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের আগে এসব তথ্য নিয়ে ব্যাপক রাজনৈতিক বিতর্ক শুরু হয়। হান্টার বাইডেন তখনকার প্রেসিডেন্ট প্রার্থী জো বাইডেনের ছেলে হওয়ায় বিষয়টি নির্বাচনী রাজনীতির গুরুত্বপূর্ণ আলোচনায় পরিণত হয়েছিল।
ল্যাপটপের তথ্য প্রকাশের পর যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক মহলে প্রশ্ন ওঠে, নথিগুলোর সত্যতা কী এবং বিদেশি প্রভাব বিস্তারের কোনো ঘটনা এর সঙ্গে যুক্ত ছিল কি না। সে সময় বিদেশি হস্তক্ষেপের সম্ভাবনা নিয়ে উদ্বেগ দেখা দিয়েছিল। তবে গোয়েন্দা কর্মকর্তারা রাশিয়ার সংশ্লিষ্টতা নিয়ে কোনো প্রমাণ না থাকার কথা জানিয়েছিলেন। ল্যাপটপের তথ্য, এর সত্যতা যাচাই এবং তদন্ত সংস্থার ভূমিকা নিয়ে পরবর্তী কয়েক বছর ধরে রাজনৈতিক ও আইনি আলোচনা চলতে থাকে।
অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসের প্রতিবেদন অনুযায়ী, অভিযুক্ত দুই কর্মকর্তা ২০২০ সালের আগস্টে রিপাবলিকান সিনেটর চাক গ্রাসলি ও রন জনসনকে এ বিষয়ে অবহিত করেছিলেন। পরবর্তী সময়ে কংগ্রেসের জিজ্ঞাসাবাদে তাঁরা কী তথ্য জানতেন এবং তদন্ত সংস্থার ভেতরে কী আলোচনা হয়েছিল, তা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। এখন অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণের জন্য আদালতে আইনি প্রক্রিয়া এগোচ্ছে। তবে অভিযোগ দায়ের হওয়া মানেই অভিযুক্ত ব্যক্তিরা অপরাধ করেছেন, এমন নয়। আদালতে প্রমাণ ও উভয় পক্ষের বক্তব্য বিবেচনার পরই এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত হবে।
মঙ্গলবারের প্রাথমিক শুনানিতে অভিযুক্তদের আইনজীবীরা মামলাটি কীভাবে দায়ের করা হয়েছে, তা নিয়ে আপত্তি তুলতে পারেন। অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস জানিয়েছে, প্রচলিত বৃহত্তর বিচারিক প্রক্রিয়ায় অভিযোগপত্র দাখিলের পরিবর্তে ফৌজদারি অভিযোগের ভিত্তিতে মামলা শুরু করার বিষয়টি নিয়ে প্রতিরক্ষা পক্ষ প্রশ্ন তুলতে পারে। তাঁদের আইনজীবীরা মামলাটিকে ভিত্তিহীন ও রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে সমালোচনা করেছেন। অন্যদিকে, অভিযোগের পক্ষে সরকারি পক্ষের বক্তব্য ও প্রমাণ আদালতে বিবেচিত হবে।
এই মামলার সঙ্গে যুক্ত তদন্ত দলটি একসময় বিদেশি প্রভাব বিস্তার এবং নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় হস্তক্ষেপের অভিযোগ খতিয়ে দেখত। রিপাবলিকান রাজনীতিকদের একাংশের অভিযোগ ছিল, ওই দলটি বাইডেন পরিবারের বিষয়ে তদন্তকে দুর্বল করার চেষ্টা করেছিল। তবে এসব রাজনৈতিক অভিযোগ এবং বর্তমান ফৌজদারি মামলার অভিযোগ এক বিষয় নয়। আদালতে ঠিক কোন বক্তব্য মিথ্যা ছিল বলে দাবি করা হয়েছে, সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা কী জানতেন এবং তাঁদের বক্তব্যের পেছনে কী পরিস্থিতি ছিল—এসব প্রশ্নের উত্তর প্রমাণের ভিত্তিতে নির্ধারিত হবে।
২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে ওই বিশেষ তদন্ত দলটি বিলুপ্ত করা হয়। কিন্তু ল্যাপটপের তথ্য এবং কেন্দ্রীয় তদন্ত সংস্থার ভূমিকা নিয়ে বিতর্ক থামেনি। নতুন মামলাটি আবারও সামনে এনেছে, রাজনৈতিকভাবে সংবেদনশীল তদন্তের ক্ষেত্রে সরকারি কর্মকর্তাদের দায়িত্ব, কংগ্রেসের কাছে তথ্য দেওয়ার বাধ্যবাধকতা এবং তদন্তের নিরপেক্ষতা কতটা গুরুত্বপূর্ণ।
ঘটনাটির রাজনৈতিক গুরুত্বও রয়েছে। আগামী ৩ নভেম্বর যুক্তরাষ্ট্রে মধ্যবর্তী নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা। এমন সময়ে সাবেক তদন্ত কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে মামলা হওয়ায় বিষয়টি রাজনৈতিক আলোচনায় আরও গুরুত্ব পাচ্ছে। তবে মামলাটি নির্বাচনের আগে সামনে এসেছে বলেই এর পেছনে রাজনৈতিক উদ্দেশ্য রয়েছে, এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর মতো প্রমাণ এখনো প্রতিষ্ঠিত হয়নি। একইভাবে, অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগকে আদালতের রায়ের আগে প্রমাণিত অপরাধ হিসেবেও বিবেচনা করা যাবে না।
এখন মামলার পরবর্তী শুনানি, সরকারি পক্ষের প্রমাণ এবং প্রতিরক্ষা পক্ষের যুক্তির দিকে নজর থাকবে। আদালতের কার্যক্রম থেকে পরিষ্কার হতে পারে, অভিযোগগুলো বিচার পর্যন্ত গড়াবে কি না এবং অভিযুক্ত কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে আনা দাবির আইনি ভিত্তি কতটা শক্তিশালী। যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতি ও বিচারব্যবস্থায় স্বচ্ছতা নিয়ে আগ্রহী মানুষের জন্য মামলাটি তাই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।






মন্তব্য ০
লগইন করুন অথবা বিনা মূল্যে অ্যাকাউন্ট খুলুন আলোচনায় যোগ দিতে। নাম গোপন রেখেও মন্তব্য করতে পারবেন।
এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি করুন।