অংশ: যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচন ২০২৬
যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে ট্রাম্পের ভবিষ্যৎ নির্ধারণে ভোটারদের নজর এখন কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণে
৩ নভেম্বরের নির্বাচনের আগে যুক্তরাষ্ট্রে কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতে মরিয়া রিপাবলিকানরা; মূল্যস্ফীতি ও জ্বালানির দাম নিয়ে ভোটারদের অসন্তোষে বাড়ছে ডেমোক্র্যাটদের প্রত্যাশা।
যুক্তরাষ্ট্রে আগামী ৩ নভেম্বর অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে গুরুত্বপূর্ণ মধ্যবর্তী নির্বাচন। এই নির্বাচনের মধ্য দিয়ে নির্ধারিত হবে দেশটির আইনসভা কংগ্রেসের প্রতিনিধি পরিষদ ও সিনেটের নিয়ন্ত্রণ কোন রাজনৈতিক দলের হাতে থাকবে। একই সঙ্গে ৩৬টি অঙ্গরাজ্যে গভর্নর নির্বাচনসহ বিভিন্ন অঙ্গরাজ্য ও স্থানীয় পর্যায়ের প্রতিদ্বন্দ্বিতাও এবারের ভোটকে বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ করে তুলেছে। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদের বাকি সময়ে তাঁর রাজনৈতিক কর্মসূচি বাস্তবায়নের সুযোগ কতটা থাকবে, তা অনেকাংশে নির্ভর করছে এই নির্বাচনের ফলাফলের ওপর।
২৬ অক্টোবর প্রকাশিত আল জাজিরার বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, এবারের নির্বাচনে প্রতিনিধি পরিষদের ৪৩৫টি আসন এবং সিনেটের ১০০টি আসনের মধ্যে ৩৫টি আসনে ভোট হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের মাঝামাঝি সময়ে অনুষ্ঠিত এই ভোটে ক্ষমতাসীন দলের জনপ্রিয়তা, অর্থনৈতিক পরিস্থিতি এবং সরকারের নীতির প্রতি জনসমর্থন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। তবে প্রেসিডেন্ট নিজে এই নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন না; ভোটাররা মূলত আইনপ্রণেতা ও বিভিন্ন অঙ্গরাজ্যের নির্বাচিত প্রতিনিধিদের বেছে নেবেন।
বর্তমানে উভয় কক্ষেই রিপাবলিকানদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা রয়েছে। আল জাজিরার তথ্য অনুযায়ী, প্রতিনিধি পরিষদের নিয়ন্ত্রণ নিতে ডেমোক্র্যাটদের নিট তিনটি আসন বাড়াতে হবে। অন্যদিকে সিনেটে সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনের জন্য তাদের অন্তত চারটি আসন বাড়াতে হবে। সিনেটে রিপাবলিকানদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারানোর সম্ভাবনা নিয়ে উদ্বেগ বাড়ায় দলটির নেতারা প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ অঙ্গরাজ্যগুলোতে প্রচার জোরদার করেছেন।
২৭ অক্টোবর প্রকাশিত অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসের প্রতিবেদনে সিনেটের সংখ্যাগরিষ্ঠ নেতা জন থুনের প্রচারাভিযানকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। তিনি বিভিন্ন অঙ্গরাজ্যে রিপাবলিকান প্রার্থীদের পক্ষে প্রচার চালাচ্ছেন। আইওয়ায় রিপাবলিকান প্রতিনিধি অ্যাশলি হিনসনের সঙ্গে তাঁর প্রচার কার্যক্রমও নির্বাচনী প্রতিদ্বন্দ্বিতার কেন্দ্রে উঠে এসেছে। হিনসন অবসর নিতে যাওয়া রিপাবলিকান সিনেটর জোনি আর্নস্টের আসনের জন্য ডেমোক্র্যাট প্রার্থী জশ টুরেকের বিরুদ্ধে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। একসময় রিপাবলিকানদের জন্য তুলনামূলক নিরাপদ বলে বিবেচিত আইওয়ার এই লড়াই এখন জাতীয় পর্যায়ে নজর কাড়ছে।
ভোটারদের অর্থনৈতিক উদ্বেগ এবারের নির্বাচনে বড় ভূমিকা রাখছে। নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্য, জ্বালানি, খাদ্যসামগ্রী এবং কৃষি খাতের ব্যয় নিয়ে অসন্তোষ রাজনৈতিক প্রচারের অন্যতম প্রধান বিষয় হয়ে উঠেছে। অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইরানকে ঘিরে যুদ্ধ পরিস্থিতি ও জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি নিয়ে ভোটারদের উদ্বেগ রিপাবলিকান প্রার্থীদের জন্য চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে। ডেমোক্র্যাটরা এসব বিষয়কে সামনে রেখে সাধারণ পরিবারের জীবনযাত্রার ব্যয় কমানোর প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন।
২৩ অক্টোবর প্রকাশিত রয়টার্সের বিশ্লেষণেও জীবনযাত্রার ব্যয়কে ভোটারদের অন্যতম প্রধান উদ্বেগ হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, জরিপে অংশ নেওয়া প্রায় অর্ধেক ভোটার কংগ্রেস নির্বাচনে জীবনযাত্রার ব্যয়কে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় বলে মনে করেছেন। আবাসন, স্বাস্থ্যসেবা, খাদ্য এবং জ্বালানির খরচ নিয়ে অসন্তোষ দলীয় সমর্থনের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে। তবে জরিপে প্রকাশিত মতামতকে চূড়ান্ত নির্বাচনী ফল হিসেবে বিবেচনা করা যায় না।
২৬ অক্টোবর প্রকাশিত রয়টার্স ও ইপসোসের জনমত জরিপে ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রতি সমর্থন ৩২ শতাংশে পৌঁছেছে বলে জানানো হয়। একই জরিপে নিবন্ধিত ভোটারদের মধ্যে প্রতিনিধি পরিষদের সম্ভাব্য ভোটে ডেমোক্র্যাটরা ৪৭ শতাংশ এবং রিপাবলিকানরা ৩৬ শতাংশ সমর্থন পেয়েছেন। অনিশ্চিত ভোটারদের পছন্দ হিসাবের মধ্যে নেওয়ার পর ব্যবধান কিছুটা কমেছে। সম্ভাব্য ভোটারদের মধ্যেও ডেমোক্র্যাটদের এগিয়ে থাকার ইঙ্গিত পাওয়া গেছে। জরিপটি ১ হাজার ৬৭৯ জন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের মধ্যে পরিচালিত হয়েছিল, যাঁদের মধ্যে ১ হাজার ২৮০ জন নিবন্ধিত ভোটার ছিলেন।
তবে প্রতিনিধি পরিষদে ডেমোক্র্যাটদের সম্ভাবনা তুলনামূলক ভালো মনে করা হলেও সিনেটের লড়াই আরও কঠিন। রয়টার্সের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, মেইন, উত্তর ক্যারোলাইনা, আলাস্কা, ওহাইও, আইওয়া ও টেক্সাসের মতো অঙ্গরাজ্যে ফলাফল বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। পাশাপাশি মিশিগান ও নিউ হ্যাম্পশায়ারের মতো প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ আসন ধরে রাখাও ডেমোক্র্যাটদের জন্য জরুরি। কয়েকটি আসনের ফলই সিনেটের সংখ্যাগরিষ্ঠতা নির্ধারণ করতে পারে।
কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ পরিবর্তিত হলে প্রেসিডেন্টের নীতিনির্ধারণী ক্ষমতার ওপরও প্রভাব পড়বে। প্রতিনিধি পরিষদ ডেমোক্র্যাটদের নিয়ন্ত্রণে গেলে সরকারি ব্যয়, প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত এবং বিভিন্ন নীতির বিষয়ে তদন্তের সুযোগ বাড়তে পারে। সিনেটে সংখ্যাগরিষ্ঠতা বদলালে মন্ত্রিসভার সদস্য, রাষ্ট্রদূত ও বিচারপতিদের মনোনয়ন অনুমোদনের ক্ষেত্রেও পরিবর্তন আসতে পারে। তবে উভয় কক্ষে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেলেও ডেমোক্র্যাটরা স্বয়ংক্রিয়ভাবে নিজেদের সব কর্মসূচি বাস্তবায়ন করতে পারবেন না। প্রেসিডেন্টের ভেটো ক্ষমতা এবং সিনেটের কার্যপ্রণালিগত বাধা বহাল থাকবে।
নির্বাচনের ফল প্রকাশের ক্ষেত্রেও সতর্ক থাকা জরুরি। ভোটগ্রহণ শেষে প্রাথমিক ফল পাওয়া গেলেও ডাকযোগে পাঠানো ব্যালট, অস্থায়ী ব্যালট এবং অন্যান্য অসম্পূর্ণ গণনার কারণে কিছু আসনের চূড়ান্ত ফল জানতে কয়েক দিন বা তারও বেশি সময় লাগতে পারে। আল জাজিরার বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, বিভিন্ন অঙ্গরাজ্যে গণনার পদ্ধতি ও সময় আলাদা হওয়ায় প্রাথমিক ফল চূড়ান্ত ফলের সঙ্গে ভিন্ন হতে পারে। তাই গণনার সময় কোনো প্রার্থীর এগিয়ে যাওয়া বা পিছিয়ে পড়াকে এককভাবে অনিয়মের প্রমাণ হিসেবে দেখা ঠিক নয়।
যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল নির্বাচন কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, আগামী ৩ নভেম্বর মঙ্গলবার নির্ধারিত ফেডারেল সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। এই নির্বাচনে ভোটারদের সিদ্ধান্ত শুধু কংগ্রেসের আসনসংখ্যা নির্ধারণ করবে না; বরং ট্রাম্প প্রশাসনের বাকি দুই বছরের আইন প্রণয়ন, সরকারি ব্যয় এবং রাজনৈতিক জবাবদিহির পরিবেশও প্রভাবিত করবে।
নির্বাচনের শেষ সপ্তাহে রিপাবলিকান ও ডেমোক্র্যাট উভয় দলই গুরুত্বপূর্ণ আসনগুলোতে প্রচার জোরদার করছে। মূল্যস্ফীতি, জ্বালানির দাম, জীবনযাত্রার ব্যয় এবং প্রেসিডেন্টের জনপ্রিয়তা ভোটারদের সিদ্ধান্তে প্রভাব ফেলতে পারে। তবে চূড়ান্ত ফল নির্ভর করবে ভোটার উপস্থিতি, অঙ্গরাজ্যভিত্তিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা এবং প্রতিটি আসনের ভোট গণনার ওপর। ৩ নভেম্বরের ভোটের আগে কোনো দলকে নিশ্চিত বিজয়ী বলা যাচ্ছে না।

ভোটারদের গোপন তথ্য চেয়ে ট্রাম্প প্রশাসনের মামলা খারিজ করলেন নিজ দলের নিয়োগ দেওয়া বিচারক

ওয়াশিংটনে অ-নাগরিক ভোটারদের তথ্য প্রকাশে সোমবার সংবাদ সম্মেলন করবে মার্কিন প্রশাসন

মিশিগানে রিপাবলিকানদের জেতাতে ট্রাম্পের প্রচার, ভোটারদের দিলেন বিশেষ বার্তা







মন্তব্য ০
লগইন করুন অথবা বিনা মূল্যে অ্যাকাউন্ট খুলুন আলোচনায় যোগ দিতে। নাম গোপন রেখেও মন্তব্য করতে পারবেন।
এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি করুন।