খেলায় কোটি ডলার বাজি, জুয়া মেটাতে শহরের অর্থ আত্মসাৎ করে দোষ স্বীকার করলেন সাবেক পুলিশপ্রধান
৮,৭৪৭ বার পড়া হয়েছে ৬ মিনিটে পড়ুন
ঘটনাটি সম্পর্কে যুক্তরাষ্ট্রের কানেকটিকাট অঙ্গরাজ্যের সরকারি তদন্তকারী সংস্থার নথি এবং একাধিক স্থানীয় সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন যাচাই করে দেখা গেছে, জ্যাকবসনের বিরুদ্ধে প্রথমে ৮৫ হাজার ৫০০ ডলার আত্মসাতের অভিযোগ আনা হয়েছিল। পরবর্তী তদন্তে আত্মসাতের মোট অর্থ ১ লাখ ৭৮ হাজার ডলার বলে নির্ধারণ করা হয়। এই পার্থক্যটি গুরুত্বপূর্ণ, কারণ প্রাথমিক অভিযোগের অঙ্ক এবং পরবর্তী সময়ে নির্ধারিত মোট অর্থ এক নয়। জ্যাকবসন ২০২২ সালে নিউ হ্যাভেন শহরের পুলিশপ্রধান হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। এর আগে তিনি একই পুলিশ বিভাগে সহকারী পুলিশপ্রধান হিসেবে কাজ করেছেন। তাঁর দায়িত্ব ছিল শহরের আইনশৃঙ্খলা রক্ষা, অপরাধ দমন এবং পুলিশের বিভিন্ন কার্যক্রম পরিচালনা করা। ফলে তাঁর বিরুদ্ধে সরকারি তহবিল ব্যক্তিগত কাজে ব্যবহারের অভিযোগ ওঠার পর বিষয়টি শহরটির প্রশাসন ও পুলিশের জন্য বড় ধরনের সংকটে পরিণত হয়। ঘটনাটি প্রথম প্রকাশ্যে আসে ২০২৬ সালের ৫ জানুয়ারি। শহরের মেয়র জাস্টিন এলিকার জানিয়েছেন, পুলিশের কয়েকজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা গোপন তথ্যদাতাদের অর্থ প্রদানের জন্য ব্যবহৃত তহবিলের হিসাবে অসংগতি দেখতে পান। বিষয়টি নিয়ে তিন সহকারী পুলিশপ্রধান ডেভিড জানেল্লি, বার্ট্রাম এতিয়েন এবং মনমিত ভাগতানার সঙ্গে জ্যাকবসনের আলোচনা হয়। তাঁদের মুখোমুখি প্রশ্নের পর তিনি ব্যক্তিগত প্রয়োজনে অর্থ নেওয়ার কথা স্বীকার করেছিলেন বলে মেয়র জানান।
অভিযোগ প্রকাশ্যে আসার দিনই জ্যাকবসন অবসরের আবেদন জমা দেন। মেয়র তাঁকে প্রশাসনিক ছুটিতে পাঠানোর কথা বিবেচনা করছিলেন বলে শহর কর্তৃপক্ষের বিবরণে উল্লেখ রয়েছে। কিন্তু তার আগেই তাঁর অবসরের আবেদন জমা পড়ে। পরদিন, ৬ জানুয়ারি, অঙ্গরাজ্যের কর্মকর্তারা জানান, অভিযোগ তদন্তে কানেকটিকাট অঙ্গরাজ্য পুলিশ কাজ করবে। সম্ভাব্য স্বার্থের সংঘাত এড়াতে মামলাটির তদারকির দায়িত্ব দেওয়া হয় অন্য একটি বিচারিক জেলার সরকারি কৌঁসুলিকে। তদন্তকারীদের অনুসন্ধানে দুটি সরকারি তহবিলের অর্থ ব্যবহারে অনিয়মের তথ্য উঠে আসে। প্রথমটি হলো মাদকসংক্রান্ত অপরাধ তদন্তে সহায়তাকারী গোপন তথ্যদাতাদের অর্থ প্রদানের তহবিল। অপরটি হলো পুলিশ কার্যক্রমের সঙ্গে যুক্ত একটি যুবকল্যাণমূলক তহবিল। সরকারি তদন্তকারী সংস্থার ২০ ফেব্রুয়ারির ঘোষণায় বলা হয়, প্রথম তহবিল থেকে ২০২৪ সালের ১ জানুয়ারি থেকে ২০২৬ সালের ৫ জানুয়ারি পর্যন্ত ৮১ হাজার ৫০০ ডলার হিসাবের বাইরে ছিল বা অপব্যবহার করা হয়েছিল। দ্বিতীয় তহবিল থেকে ২০২৫ সালের ২৩ ও ২৪ ডিসেম্বরের মধ্যে মোট ৪ হাজার ডলারের দুটি চেক নেওয়ার অভিযোগও উঠে আসে। ব্যাংকের নথি পর্যালোচনায় সংশ্লিষ্ট চেকগুলো জ্যাকবসনের ব্যক্তিগত হিসাবে জমা পড়ার তথ্য পাওয়া যায়।
প্রাথমিক তদন্তে এই দুই তহবিলের সঙ্গে যুক্ত ৮৫ হাজার ৫০০ ডলারের হিসাব সামনে আসে। কিন্তু পরবর্তী সময়ে সরকারি কৌঁসুলিরা আত্মসাতের মোট পরিমাণ ১ লাখ ৭৮ হাজার ডলার নির্ধারণ করেন। সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, অর্থ আত্মসাতের সময়কাল ২০১৯ সাল পর্যন্ত বিস্তৃত। অর্থাৎ অভিযোগটি শুধু তাঁর পুলিশপ্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালনের শেষ সময়ের ঘটনাকে কেন্দ্র করে নয়; বরং এর সঙ্গে আগের সময়ের লেনদেনও যুক্ত হয়েছে। তদন্তের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো জুয়ায় অর্থ ব্যয়ের হিসাব। আদালতে দাখিল করা গ্রেপ্তারি পরোয়ানাসংক্রান্ত নথির বরাত দিয়ে সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে, ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৬ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত প্রায় এক বছরে জ্যাকবসন অনলাইন ক্রীড়াভিত্তিক জুয়ার দুটি মাধ্যমে মোট ৪৪ লাখ ৬০ হাজার ডলার বাজি ধরেছিলেন। ওই সময়ে তাঁর নিট লোকসান ছিল ২ লাখ ১৪ হাজার ৩৬৫ ডলার। এখানে মোট বাজির অর্থ এবং লোকসানের অঙ্ক আলাদা করে বোঝা জরুরি। ৪৪ লাখ ৬০ হাজার ডলার মানে এই নয় যে পুরো অর্থ তিনি হারিয়েছিলেন; বরং জেতা ও হারার হিসাব সমন্বয়ের পর তাঁর নিট লোকসানের পরিমাণ ছিল ২ লাখ ১৪ হাজার ৩৬৫ ডলার।
তদন্তের বিবরণ অনুযায়ী, সহকারী পুলিশপ্রধানদের সঙ্গে আলোচনার সময় জ্যাকবসন অতিরিক্ত জুয়া খেলার কারণে সমস্যায় পড়ার কথা জানিয়েছিলেন। সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত আদালত-সংশ্লিষ্ট নথিতে তাঁর বক্তব্যের বিবরণও এসেছে। তবে ব্যক্তিগত আর্থিক সমস্যার কথা বলা সরকারি অর্থ ব্যবহারের বৈধতা দেয় না। সরকারি তহবিল নির্দিষ্ট উদ্দেশ্যে বরাদ্দ করা হয় এবং এর প্রতিটি লেনদেনের হিসাব ও যথাযথ তদারকি থাকা প্রয়োজন। বিশেষ করে অপরাধ তদন্তে গোপন তথ্যদাতাদের সহায়তার জন্য বরাদ্দ অর্থের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা ও নিরাপত্তা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ২০ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ তারিখে জ্যাকবসন পুলিশের কাছে আত্মসমর্পণ করেন। তাঁর বিরুদ্ধে জনসাধারণের অর্থ আত্মসাতের মাধ্যমে প্রথম শ্রেণির গুরুতর চুরির দুটি অভিযোগ আনা হয়েছিল। তাঁকে ১ লাখ ৫০ হাজার ডলারের মুচলেকায় মুক্তি দেওয়া হয়। ওই সময় অঙ্গরাজ্যের বিচার বিভাগ স্পষ্ট করেছিল, অভিযোগের ভিত্তিতে কাউকে অপরাধী হিসেবে চূড়ান্তভাবে গণ্য করা যায় না; আদালতের প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হয়। তবে মামলার সর্বশেষ অগ্রগতি এসেছে ২৩ অক্টোবর। ওই দিন জ্যাকবসন প্রথম শ্রেণির চুরির একটি অভিযোগে দোষ স্বীকার না করেও বিচার মেনে নেওয়ার আবেদন করেন। যুক্তরাষ্ট্রের আইনি ব্যবস্থায় এই ধরনের আবেদনকে সাধারণত এমন একটি অবস্থান হিসেবে বোঝানো হয়, যেখানে অভিযুক্ত সরাসরি অপরাধ স্বীকার করেন না, কিন্তু বিচার মোকাবিলা না করে আদালতের শাস্তিমূলক সিদ্ধান্ত মেনে নেওয়ার প্রক্রিয়ায় সম্মত হন। তাই একে সরাসরি প্রচলিত অর্থে দোষ স্বীকার বলা পুরোপুরি সঠিক নয়। তাঁর আবেদনের পর মামলার পরবর্তী ধাপ হচ্ছে ক্ষতিপূরণের অঙ্ক নির্ধারণ এবং সাজা ঘোষণা।
শহরের মেয়র জাস্টিন এলিকার এ ঘটনাকে জনসাধারণের আস্থার গুরুতর লঙ্ঘন হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, আইন সবার জন্য সমান এবং পুলিশপ্রধানও আইনের ঊর্ধ্বে নন। তিনি আরও জানিয়েছেন, ঘটনার পর গোপন তথ্যদাতাদের জন্য বরাদ্দ তহবিলের নিরাপত্তা জোরদার করতে নতুন নীতিমালা ও নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা চালু করা হয়েছে। এসব পদক্ষেপের উদ্দেশ্য হলো অর্থের ব্যবহার যথাযথভাবে পর্যবেক্ষণ করা এবং ভবিষ্যতে এ ধরনের অনিয়ম প্রতিরোধ করা। পুলিশ বিভাগের সহকারী প্রধানেরা অনিয়ম শনাক্ত করে বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানোর পর তদন্ত শুরু হয়। অঙ্গরাজ্যের তদন্তকারী সংস্থা আরও জানিয়েছিল, তাদের পর্যালোচনায় বিভাগের অন্য কোনো সদস্য এই অর্থের অপব্যবহারে সহযোগী হিসেবে জড়িত ছিলেন—এমন তথ্য পাওয়া যায়নি। তবে এই বক্তব্য তদন্তের নির্দিষ্ট পর্যায়ের ফলাফল হিসেবে বিবেচনা করা উচিত। মামলায় ক্ষতিপূরণের সঠিক অঙ্ক নির্ধারণের জন্য ২০২৭ সালের জানুয়ারিতে শুনানির কথা জানানো হয়েছে। ২৩ অক্টোবর প্রকাশিত সংবাদে ক্ষতিপূরণ নির্ধারণের শুনানির তারিখ ১৪ জানুয়ারি ২০২৭ উল্লেখ করা হয়েছে; আর সাজা ঘোষণার তারিখ নির্ধারণ করা হয়েছে ২৯ জানুয়ারি ২০২৭। কিছু সংবাদমাধ্যমে ক্ষতিপূরণ শুনানির তারিখে ভিন্নতা রয়েছে, তাই আদালতের সর্বশেষ আনুষ্ঠানিক সময়সূচিই এ ক্ষেত্রে চূড়ান্ত বলে বিবেচিত হবে। জ্যাকবসনের আইনজীবীর বরাত দিয়ে সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে, তাঁর সর্বোচ্চ চার বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড হতে পারে। তবে চূড়ান্ত সাজা আদালতই নির্ধারণ করবেন। এই ঘটনা সরকারি প্রতিষ্ঠানে আর্থিক নিয়ন্ত্রণব্যবস্থার গুরুত্বও তুলে ধরে। গোপন তথ্যদাতাদের অর্থায়ন অপরাধ তদন্তের একটি সংবেদনশীল অংশ। এ অর্থের অপব্যবহার হলে শুধু সরকারি কোষাগারের ক্ষতি হয় না, তদন্তে সহায়তাকারীদের নিরাপত্তা এবং অপরাধ দমনের কার্যক্রমও ঝুঁকিতে পড়তে পারে। একই সঙ্গে প্রশাসনের উচ্চপদে থাকা ব্যক্তিদের আর্থিক কর্মকাণ্ডে কার্যকর নজরদারি না থাকলে জনসাধারণের আস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। সব মিলিয়ে, সাবেক পুলিশপ্রধানের বিরুদ্ধে মামলাটি এখন ক্ষতিপূরণ ও সাজা নির্ধারণের পর্যায়ে এগোচ্ছে। ১ লাখ ৭৮ হাজার ডলারের সরকারি অর্থ আত্মসাতের বিষয়টি এবং এক বছরে ৪৪ লাখ ৬০ হাজার ডলারের জুয়ার হিসাব এ ঘটনাকে আলোচনায় এনেছে। তবে মামলার পরবর্তী আইনি সিদ্ধান্ত, ক্ষতিপূরণের চূড়ান্ত পরিমাণ এবং আদালতের নির্ধারিত সাজাই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
মন্তব্য ০
লগইন করুন অথবা বিনা মূল্যে অ্যাকাউন্ট খুলুন আলোচনায় যোগ দিতে। নাম গোপন রেখেও মন্তব্য করতে পারবেন।
এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি করুন।